ভেনিজুয়েলার জনপ্রিয় প্রেসিডেন্ট হুগো শাভেজ জীবন-মৃত্যুর প্রান্তসীমায়। তিনি পাঞ্জা লড়িয়া চলিয়াছেন মৃত্যুর সাথে। তিনি মারা গিয়াছেন বলিয়া এরইমধ্যে পাশ্চাত্যের কোনো কোনো গণমাধ্যমে খবরও প্রচারিত হইয়াছে। কিন্তু ভেনিজুয়েলা কর্তৃপক্ষের দাবি তিনি বাঁচিয়া আছেন, তবে অবস্থা সংকটাপন্ন। এই বাস্তবতায় দেশটিতে এক অনিশ্চিত পরিস্থিতির উদ্ভব ঘটিয়াছে। অন্যদিকে নেতৃত্বের সংকট উত্তরণের জন্য দেশটির রাজনৈতিক মহল প্রস্তুতিও গ্রহণ করিতে শুরু করিয়াছে।
বস্তুত:দুনিয়ার নানা দেশে সময়-সময়ান্তরে সংকট আসিয়া হানা দেয় নানান প্রেক্ষাপটে। আর যখনই সংকটকাল আসিয়া উপস্থিত হয় তখন বোধগম্য কারণেই জনমনে দেখা দেয় সন্দেহ-সংশয়। নৈরাজ্যকর পরিস্থিতি সৃষ্টি হওয়াও বিচিত্র নয়। রাজনৈতিক বিরোধ ও বৈপরীত্য হইতে সৃষ্ট সংকট সহিংস রূপ পরিগ্রহ করিবারও বহু দৃষ্টান্ত রহিয়াছে অতীত ও বর্তমানের বিশ্ব ইতিহাসে। রাজনৈতিক কারণে সৃষ্ট সংঘাতপূর্ণ পরিস্থিতিতে প্রাণহানি ঘটে, মানুষের জীবন ও সম্পদের নিরাপত্তা অনিশ্চিত হইয়া পড়ে। তৃতীয় বিশ্বের স্বল্পোন্নত দেশসমূহে রাজনৈতিক সংকটের পশ্চাতে অনেক সময় থাকিয়া যায় বহিঃশক্তির প্ররোচনা। রাজনৈতিক ক্ষমতার হাতবদল ঘটিবার পিছনেও এমন অনেক শক্তির সমর্থন-সহযোগিতা থাকে, যাহা ওপেন সিক্রেট। এইরূপ শক্তির সাহায্য-সহযোগিতায় তৃতীয় বিশ্বের যে কোনো দেশে, যখন যাহারা ক্ষমতায় আসেন, তখন তাহারা ভাবিয়া থাকেন যে, সমস্যা-সংকট সামনে যতই আসুক, পিছনের শক্তিই তাহা পার করিয়া দিবে। কিন্তু এই ধারণা সব সময় সঠিক নাও হইতে পারে। কেননা যাহারা সহযোগিতা দিয়া কাহাকেও বা কোনো একটি রাজনৈতিক গোষ্ঠীকে ক্ষমতায় বসায়, নিশ্চিতভাবেই তাহারা সেইটা করিয়া থাকে নিজের প্রয়োজনে, যাহাকে বা যাহাদের সাহায্য করা হয়, তাহাদের প্রয়োজনে নয়। অর্থাত্ স্বল্পোন্নত দেশের যে কোনো রাজনৈতিক গোষ্ঠীকে বাহিরের কোনো শক্তি সহায়তা প্রদানের নামে আসলে ব্যবহার করিয়া থাকে মাত্র। কাজেই প্রয়োজন ফুরাইয়া গেলে ব্যবহার্যের সঙ্গে সম্পর্কের ইতি টানিয়া তাহারা অন্যকোনো গোষ্ঠীকে মিত্র হিসাবে বাছিয়া লইতে কুণ্ঠা বোধ করে না। ইতিহাসে এমন বহু দৃষ্টান্ত রহিয়াছে। আমাদের জাতীয় কবি কাজী নজরুলের ভাষায় ইহাকেই বলা হয়, ‘বড়র পিরিতি বালির বাঁধ’। অর্থাত্ বালির বাঁধের ন্যায় সেই মিত্রতার বন্ধন ধসিয়া পড়ে। এই সত্য যিনি বা যাহারা বুঝিতে পারেন না, তাহারা পরের শক্তিকে নিজের মনে করিয়া অনেক সময় বেপরোয়া হইয়া উঠেন। কিন্তু তাহার পরিণাম কখনই ভাল হয় না।
বাংলাদেশ এই মুহূর্তে এক কঠিন সময়ের মধ্যে আসিয়া পড়িয়াছে। দেশ জুড়িয়া অস্বাভাবিক পরিস্থিতি বিরাজ করিতেছে। ব্যবসা-বাণিজ্য স্থবির হইয়া পড়িয়াছে। দেশের জনগণ দুই ভাগে বিভক্ত হইয়া পড়িয়াছে স্পষ্টতই। রাজপথে রক্ত ঝরিতেছে। বিরাজমান পরিস্থিতিকে যে যাহার মত ব্যাখ্যা করিয়া চলিয়াছেন। আর ঘড়ির কাঁটা দ্রুত অগ্রসর হইতেছে। দিন যাইতেছে। পরিস্থিতি খারাপ হইতে খারাপের দিকে ধাবমান। ইহার শেষ কোথায় কেহই বুঝিয়া উঠিতে পারিতেছেন না। এমতাবস্থায় সময় বসিয়া থাকিবে না। ‘টাইম এন্ড টাইড ওয়েট ফর নান’। এখনই সময়, এই পরিস্থিতির কার্যকারণের সঙ্গে যাহারা সংশ্লিষ্ট তাহাদেরই সমাধানের পন্থা খুঁজিয়া বাহির করিতে হইবে। তাহাদের নির্বিকার থাকিবার সময় ইহা নয়। তাহারা নিজেরা যদি সমাধান সূত্র খুঁজিয়া বাহির না করেন, যদি নির্লিপ্ত থাকেন, তাহা হইলে প্রাকৃতিক নিয়মে যাহা ঘটিবার তাহাই ঘটিবে। তখন কিন্তু এই সংশ্লিষ্ট মহলের আর কিছুই করিবার থাকিবে না। মনে রাখিতে হইবে, জগতে কোনো কিছুই অনিঃশেষ নহে। পরিস্থিতি যাহাই হউক না কেন, তাহার শেষ আছে।
