মিয়ানমার পরিস্থিতি ও মানবাধিকারকর্মীদের উদ্বেগ

আপডেট : ০৩ মার্চ ২০১৩, ২২:০৬
মিয়ানমারে রোহিঙ্গা মুসলমান ও রাখাইন বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বীদের মধ্যে রক্তক্ষয়ী জাতিগত দাঙ্গার রেশ এখনও কাটে নাই। ইহারই মধ্যে দেশটিতে আবার নূতন করিয়া দাঙ্গা শুরুর আশঙ্কা সৃষ্টি হইয়াছে। ব্রিটেনের প্রভাবশালী দৈনিক দ্য গার্ডিয়ানের এক বিশ্লেষণে এরূপ আশঙ্কা ব্যক্ত করা হইয়াছে। অতিসম্প্রতি এক রাত্রে সহিংসতাপ্রবণ পশ্চিমাঞ্চলীয় আরাকান রাজ্যের প্রত্যন্ত একটি গ্রামে নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্যদের হাতে কমপক্ষে ১৩ জন নারী ধর্ষণের শিকার হইয়াছেন। ইহার মধ্যে রহিয়াছে কয়েকজন কিশোরীও। ফলে এই রাজ্যে বিরাজ করিতেছে টান টান উত্তেজনা। দাঙ্গার আশঙ্কায় ইতোমধ্যে অনেকে প্রতিবেশী দেশসমূহে আশ্রয় লাভের চেষ্টা করিতেছে। গত বত্সরের দাঙ্গার পর হইতে এইসব এলাকায় জরুরি অবস্থা জারি রহিয়াছে। তাহার পরও এই ধরনের অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা কিভাবে ঘটিল তাহাই বড় প্রশ্ন। সংগত কারণে বিভিন্ন মানবাধিকার সংগঠন এই পরিস্থিতিতে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করিয়াছে। উল্লেখ্য, গত বত্সর ২৬ বত্সরের এক রাখাইন বৌদ্ধ নারী ধর্ষণের শিকার হন। ইহার জের ধরিয়া ভয়াবহ জাতিগত দাঙ্গার সূত্রপাত হয়। কিন্তু মিয়ানমার সরকার প্রকৃত দোষীদের শাস্তি নিশ্চিত না করিয়া দাঙ্গা মোকাবিলায় ব্যর্থতার পরিচয় দেয়। এইভাবে ২০১২ সালের জুন হইতে এখন পর্যন্ত জাতিগত সহিংসতায় সহস্রাধিক মানুষ নিহত হইয়াছেন, যাহাদের বেশিরভাগই রোহিঙ্গা মুসলমান। সেই ঘটনার পর এ যাবত্ ৯০ হাজারেরও বেশি রোহিঙ্গা বাস্তুচ্যুত হইয়াছে। নির্যাতিত রোহিঙ্গারা সমুদ্র ও স্থলসীমান্ত দিয়া বাংলাদেশে ঢুকিবার চেষ্টা করে। ইহা লইয়া বাংলাদেশ সরকার বিব্রতকর ও এক কঠিন পরিস্থিতির মুখোমুখি হয়। কেননা রোহিঙ্গা শরণার্থী সমস্যায় আমরা বহুদিন ধরিয়া ভুগিয়া আসিতেছি। তাহার পরও বাংলাদেশ বিপদগ্রস্ত রোহিঙ্গাদের যথাসাধ্য উপকারের চেষ্টা করে। এখন আবার এই ধরনের কোন নূতন পরিস্থিতি তৈরি হইলে বাংলাদেশের বিপদ আরও বাড়িবে বৈকি। এমনিতেই বর্তমানে আমাদের দেশে রাজনৈতিক অস্থিরতা বিরাজ করিতেছে। অস্থিরতা আছে উপমহাদেশ জুড়িয়াই। এমতাবস্থায় নূতন করিয়া রোহিঙ্গাদের অনুপ্রবেশ শুরু হইলে আমাদের অবস্থা যে আরও বেগতিক হইবে, তাহাতে কোন সন্দেহ নাই। বাংলাদেশ মিয়ানমারের নিকটতম প্রতিবেশী। কিন্তু মিয়ানমারের সীমান্তরক্ষী বাহিনী নাসাকা সদস্যদের মানবাধিকার লংঘনের অভিযোগ অনেক পুরাতন। ইহা লইয়া ঘরে-বাহিরে সর্বত্র ব্যাপক সমালোচনা রহিয়াছে। মানবাধিকার সংস্থা হিউম্যান রাইটস ওয়াচের গবেষক ম্যাথিউ স্মিথ দাবি করিয়াছেন যে, নাসাকার সদস্যরা বহু বত্সর ধরিয়া রোহিঙ্গা মুসলিম নারীদের ওপর পাশবিক নির্যাতন চালাইলেও ইহার বিচার হওয়ার দৃষ্টান্ত বিরল। মানবাধিকার সংস্থা উইমেন্স লিগ অব বার্মার প্রতিষ্ঠাতা খিন ওমার এরূপ অত্যাচারের পর বেশিরভাগ ক্ষেত্রে বাঁচিয়া যাওয়া নারীদের বাড়িঘর হইতে উচ্ছেদ করার কথা বলিয়াছেন। অর্থাত্ উচ্ছেদই মূল উদ্দেশ্য। এসব ঘটনায় মিয়ানমারের নিরাপত্তা বাহিনী ও স্থানীয় প্রশাসনের ইন্ধন আছে বলিয়াও অনেকে মনে করেন। এক সময় আরাকানের রাজদরবারে মুসলিম বাঙালি কবি আলাওলের কদর ছিল। এসবই এখন ইতিহাস। মুসলিম রোহিঙ্গারা এখন নির্যাতনের কারণে সেখানে প্রান্তিক জনগোষ্ঠীতে পরিণত হইয়াছে। তাহাদেরকে রাজ্য হইতে বিতাড়নের চেষ্টা চলিতেছে। বাংলাদেশ একটি জনবহুল ও স্বল্পায়তনের দেশ। ক্রমবর্ধমান জনসংখ্যার চাপে এমনিতেই নুইয়া পড়িতেছে। এমতাবস্থায় রোহিঙ্গাদের চাপ সামলানো কঠিন। তাই এ ব্যাপারে আমরা বাংলাদেশ ও মিয়ানমার উভয় দেশের সরকারের সতর্কতামূলক পদক্ষেপের আহ্বান জানাই।

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন