[ রা জ নী তি ]

গণজাগরণ নয়, জামায়াতকে বেছে নিল বিএনপি

আপডেট : ০৩ মার্চ ২০১৩, ২২:০৭
বিএনপি পড়েছিল এক মহা মুসিবতে। কোনদিকে যাবে সে, এদিকে না ওদিকে। একদিকে নতুন প্রজন্মের নবজাগরণ, আর অন্যদিকে তার এতোদিনের রাজনৈতিক মিত্র জামায়াত। একূলে গেলে ওকূল হারাতে হয়, ওকূলে গেলে একূল। একূল-ওকূল করে কয়েকদিন কাটিয়ে দিয়ে তাকে শেষ পর্যন্ত বেছে নিতে হয়েছে একটি দিককে। সে বেছে নিয়েছে জামায়াতের পক্ষ। দাঁড়িয়েছে নবপ্রজন্মের জাগরণের বিরুদ্ধে। মাসখানেক আগে, নির্দিষ্ট করে বললে বলতে হয় ৫ ফেব্রুয়ারি, আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল কাদের মোল্লার বিচারের রায় ঘোষণা করে। অভিযোগ প্রমাণিত হওয়া সত্ত্বেও প্রত্যাশিত মৃত্যুদণ্ডের বদলে যাবজ্জীবন কারাদণ্ডের রায় হওয়ায় দেশবাসীর মনে তাতে তীব্র হতাশা ও ক্ষোভের সঞ্চার হয়। কয়েকদিন আগে থেকেই জামায়াতের সন্ত্রাসী তাণ্ডব ও দেশদ্রোহী উস্কানির প্রতি সরকারের নরম আচরণে মানুষের মনে অসন্তোষ ও সরকারের আন্তরিকতা-সক্ষমতা-দক্ষতা নিয়ে অবিশ্বাস ও প্রশ্ন সৃষ্টি হচ্ছিল। কাদের মোল্লাকে দেয়া এরূপ অপ্রত্যাশিত নমনীয় দণ্ড প্রদানের ঘটনাকে মানুষ ‘আঁতাতের রায়’ বলে ভাবতে শুরু করে। জামায়াত ও যুদ্ধাপরাধীদের প্রতি তীব্র ঘৃণা ও ক্রোধের সাথে যুক্ত হয় সরকারের আন্তরিকতা নিয়ে সন্দেহ। এই দুই উপলব্ধি থেকে জন্ম নেয় প্রত্যেকের ব্যক্তিগতভাবে প্রতিরোধে সক্রিয় হওয়ার বোধ। বিকেলে ঢাকার শাহবাগ চত্বরে জমতে থাকা ব্লগার ও কিছু পরেই ছাত্র ইউনিয়নসহ বিভিন্ন ছাত্র সংগঠনের শত শত কর্মীর অবস্থান নেয়ার মধ্য দিয়ে শুরু হয়ে যায় সেই চত্বরে রাতভর অবস্থানের কর্মসূচি। ঘোষণা করা হয় যে, যুদ্ধাপরাধীদের মৃত্যুদণ্ড, জামায়াত-শিবিরের নিষিদ্ধকরণ ও মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় দেশকে ফিরিয়ে আনতে না পারা পর্যন্ত কেউ রাজপথ ছাড়বে না। জন্ম নেয় গণজাগরণ মঞ্চ। অভূতপূর্ব চেহারা ও রূপ সম্বলিত এই আন্দোলনের প্রাণশক্তি হিসেবে আবির্ভূত হয় নবপ্রজন্মের তরুণ সমাজ। শুরু হয় তারুণ্যের এক বিস্ময়কর বিস্ফোরণ। এ জাগরণ ছড়িয়ে পড়ে দেশের সর্বত্র। দিন দিন নিস্তেজ হওয়ার বদলে তা আরো শক্তিশালী হয়ে ওঠে। সব বয়সের, সব পেশার নারী-পুরুষ, বৃদ্ধ, প্রবীণ, তরুণ শামিল হতে থাকে নবজাগরণের এই কাফেলায়। শিক্ষিত মধ্যবিত্ত শ্রেণির তরুণদের অংশগ্রহণে জাগরণের সূত্রপাত ঘটলেও কারখানার শ্রমিকরা দল বেঁধে এসে যোগ দিতে শুরু করে গণজাগরণ মঞ্চের কর্মসূচিতে। কমিউনিস্ট পার্টি ও বাসদ দেশের সহস্রাধিক হাটে ‘হাটসভা’ করে উত্থাপিত দাবিগুলোকে তৃণমূল মানুষের কাছে নিয়ে যায়। গণজাগরণ মঞ্চের আন্দোলন একটি জাতীয় জাগরণে পরিণত হয়। কমিউনিস্ট পার্টিসহ বামপন্থি-প্রগতিশীলরা শুরু থেকেই গণজাগরণ মঞ্চের আন্দোলনের তাত্পর্য ও সম্ভাবনা সম্পর্কে সচেতন ছিল। তারা প্রথম থেকেই গা লাগিয়ে তাকে এগিয়ে নিতে সর্বশক্তি নিয়োজিত করে। আওয়ামী লীগের শীর্ষ নেতৃত্ব দ্রুতই অনুধাবন করতে সক্ষম হয় যে, যুদ্ধাপরাধীদের বিচার করার প্রশ্নে সরকারের আন্তরিকতা ও সক্ষমতা নিয়ে মানুষের মধ্যে যে সন্দেহ ও অবিশ্বাস সৃষ্টি হয়েছে তা মেরামত করা একান্ত প্রয়োজন। সে কারণে তারা দ্রুত গণজাগরণ মঞ্চে যোগ দেয়। এ বাস্তবতাও তারা সাময়িকভাবে মেনে নেয় যে, গণজাগরণ মঞ্চে দলীয় প্রভাব বিস্তারের চেষ্টা তাদের জন্য বুমেরাং হবে। সাধারণ নির্দলীয় তরুণ সমাজসহ বৃহত্তর জনগণ ততোক্ষণে গণজাগরণ মঞ্চের প্রকৃত কর্তৃত্বাধিকারী হয়ে উঠতে সক্ষম হয়েছে। আনুষ্ঠানিক নেতৃত্ব কাঠামো ছাড়াই গণশক্তি (peoples power) কার্যকর হতে শুরু করছে। কোন শ্লোগান দেয়া হবে বা কোনটা দেয়া হবে না—সেটাও জনতা নির্ধারণ করে দিচ্ছে তাদের প্রত্যুত্তরের মাত্রা ও ব্যাপ্তি দিয়ে। গণজাগরণ মঞ্চকে ভিত্তি করে সৃষ্টি হওয়া গণজোয়ার কতোটা শক্তিশালী হয়ে উঠতে পারে সে সম্পর্কে বিএনপির হিসেব প্রথম থেকেই ত্রুটিপূর্ণ ছিল। তার সূচনাটি যেমন তার কাছে ছিল অপ্রত্যাশিত, তেমনি তার গতি-প্রকৃতি ও বিকাশ-বিস্তারের গোটা প্রক্রিয়াকালে বিএনপি নেতৃত্ব সব সময়ই ছিল হতচকিত অবস্থায়। তারা টেরই পায়নি যে কি ঘটে চলেছে দেশে। শাহবাগের জাগরণ মঞ্চকে ঘিরে যে জাতীয় উত্থান, তা কেবল আর অন্য দশটির মতো, অথবা সেসবের মধ্যে খুব বড় ও নাটকীয়, একটি সংগ্রামের কর্মসূচির মতো নতুন আরেকটি ঘটনা ছিল না। বস্তুত এটি দ্রুত হয়ে ওঠে একটি গভীর তাত্পর্যবহ জাতীয় জাগরণের অনন্য ঘটনা। সমাজের ও মানুষের অন্তরের গভীরে সুপ্ত হয়ে থাকা অমোচনীয় গভীর দেশপ্রেমের তীব্র এক বহিঃপ্রকাশ হিসেবে গণজাগরণ মঞ্চ ব?হ্নিশিখার মতো উজ্জ্বল শিখার ন্যায় ছড়িয়ে পড়ে সারাদেশে। ঢাকা ও ঢাকার বাইরে সর্বত্র তা প্রসারিত হয়ে আকর্ষণ করে কাছে টেনে নেয় অগণিত তরুণ-তরুণীসহ লক্ষ লক্ষ মানুষকে। এই জাগরণ লক্ষ-কোটি মানুষের হূদয়ে স্পন্দন জাগিয়ে তোলে, স্পর্শ করে তাদের অন্তরাত্মাকে, স্থায়ী দাগ ফেলে চেতনার গভীরে। বিশেষভাবে নবপ্রজন্মের মাঝে এই জাগরণ দেশপ্রেমের তুফান জাগিয়ে তোলে। বিএনপির যেসব নেতা এতদিন তত্ত্ব দিত যে, নবপ্রজন্মের তরুণরা চার দশকের অতীতের মুক্তিযুদ্ধ, যুদ্ধাপরাধী-রাজাকার, মুক্তিযুদ্ধের পক্ষ-বিপক্ষের শক্তি ইত্যাদি নিয়ে মাথা ঘামায় না অথবা বলতো যে, তারা অতীতকে ভুলে গিয়ে এখন কেবল ভবিষ্যত্ নিয়েই ভাবতে চায়—তাদের সেসব তত্ত্বকে সম্পূর্ণভাবে ভুল প্রমাণিত করে নবপ্রজন্ম গর্জে উঠে রাজাকারের ফাঁসি চাই, জামায়াত-শিবির নিষিদ্ধ কর, মুক্তিযুদ্ধের চেতনা হারিয়ে যেতে দেব না ইত্যাদি শ্লোগানে। এতদসত্ত্বেও বিএনপি তার ভ্রান্ত মূল্যায়নই আঁকড়ে থেকেছে। মনে করেছে শাহবাগের ঘটনা কেবলই ক্ষণিকের আবেগের প্রকাশ। অল্প পরেই তা হারিয়ে যাবে। তাই তারা অপেক্ষা করেছে শাহবাগের সাময়িক আবেগের সমাপ্তি দেখতে। তারপর গণআন্দোলনের গোটা এ্যাজেন্ডা তাদের হাতে আবার ফিরে আসবে ভেবে তারা অপেক্ষা করছে। এদিক-ওদিক নানা কথা বলে তার সময় পার হওয়ার অপেক্ষায় থেকেছে। শাহবাগে ৫ ফেব্রুয়ারি কর্মসূচি শুরু হওয়ার দিন বিএনপির কোন পরিচিত মুখ সেখানে আসেনি। পরদিন শাহবাগ চত্বর গণজাগরণ মঞ্চের রূপ গ্রহণ করার পর তার নির্দলীয় চেহারা আরো স্পষ্ট হয়ে ওঠা সত্ত্বেও বিএনপি তাকে তেমন আমলে নেয়নি। আওয়ামী লীগের নেতাদের বক্তৃতা দিতে না দেয়া, তাদের আগমন বার্তা ঘোষিত হওয়ার সাথে সাথে বিরূপ প্রতিক্রিয়ার প্রকাশ ইত্যাদি এ কথাই স্পষ্ট করে তোলে যে, গণজাগরণ মঞ্চ সরকার নিয়ন্ত্রিত তো নয়ই, তা অন্য কোন দলীয় প্ল্যাটফর্মও নয়। এটি সরকারি মঞ্চ নয়, বরঞ্চ সরকারি ছাপ থেকে মঞ্চটিকে মুক্ত রাখাটাই ছিল সমবেত লাখো জনতার আকাঙ্ক্ষা। জেলাগুলোতেও গণজাগরণ মঞ্চগুলো গড়ে উঠতে শুরু করে একই আদলে। রাজাকারের ফাঁসি চাই, জামায়াত-শিবির নিষিদ্ধ কর ও মুক্তিযুদ্ধের চেতনা হারিয়ে যেতে দেব না—এই তিন শ্লোগানে যাদের আপত্তি নেই, অন্য অনেক ক্ষেত্রে ভিন্ন ভিন্ন অবস্থান থাকা সত্ত্বেও সকলের জন্যই গণজাগরণ মঞ্চ ছিল উন্মুক্ত। তাই বাস্তব সত্য হলো এই যে, এই শ্লোগানগুলোতে আপত্তি না থাকলে গণজাগরণ মঞ্চ বিএনপির জন্যও শুরু থেকে উন্মুক্ত ছিল। কিন্তু বিএনপি গণজাগরণ মঞ্চের পক্ষে অবস্থান না নেয়ার পথ বেছে নেয়। বিএনপির সামনে গণজাগরণ মঞ্চ অথবা জামায়াত—এই দুয়ের মধ্যে যেকোন একটিকে বেছে নেয়ার ‘অপশন’ হাজির হয়েছিল। বিএনপির হিসেব ছিল এই যে, গণজাগরণের পক্ষ বেছে নিলেও তার এতোদিনের জামায়াত সখ্যতার কারণে গণজাগরণ মঞ্চে বিএনপি হয়ে থাকবে বেমানান। অন্যদিকে জামায়াতের পক্ষ নিলে একটি নির্দিষ্ট পরিমাণের (হোক তা মাত্র ৪%) ভোটব্যাংক পাওয়া যাবে। সঙ্গে সঙ্গে পাওয়া যাবে সন্ত্রাসী তাণ্ডব চালাতে প্রশিক্ষিত একদল জঙ্গি ক্যাডার। পাওয়া যাবে সাউদি-পাকিস্তানি-মার্কিনী লবির রাজনৈতিক ও বৈষয়িক সহায়তা। রাজনৈতিক ষড়যন্ত্রের চাল চালার জন্য পাওয়া যাবে ঘনিষ্ঠ মিত্রশক্তি। তাই ভোটের পাটিগণিতের বিচার এবং একই সাথে ক্ষমতার দাবা খেলার বিবেচনায় বিএনপির কাছে গণজাগরণ মঞ্চের চেয়ে জামায়াতের সখ্যতাই বেশি মূল্যবান বলে গণ্য হয়েছে। গণজাগরণ মঞ্চ শুরুর তৃতীয় দিন বিকেলে কিভাবে যেন গুজব ছড়িয়ে পড়েছিল যে, বিএনপির নেতা মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর, সাদেক হোসেন খোকা প্রমুখ শাহবাগে আসছেন। অল্প কিছু মানুষের মাঝে এ খবর ছড়িয়ে পড়ার পর তাতে অনেকে সন্তোষ প্রকাশ করেছিল একথা হিসেব করে যে, এর ফলে জামায়াত ও যুদ্ধাপরাধীরা রাজনৈতিকভাবে কোণঠাসা হয়ে পড়বে। এমনটা হলে অনেক সমস্যা দূর হয়ে যেত। কিন্তু তেমনটা হওয়ার ছিল না। বিএনপি জামায়াতের সঙ্গ না ছাড়ার পথেই থেকে যায়। গণজাগরণ মঞ্চ নিয়ে বিএনপি আবোল-তাবোল, ছন্নছাড়া নানা কথা বলতে থাকে। একবার তারা তরুণ প্রজন্মকে স্বাগত জানিয়ে তাদের বাহবা দেয়। একবার তারা বলে যে, গণজাগরণ মঞ্চ হলো সরকারের প্রতি দেশের তরুণ সমাজের অনাস্থার বহিঃপ্রকাশ। তারা বলে যে, এই মঞ্চ আওয়ামী নেতৃত্বকে বাদ দিয়ে বামপন্থিদের হাতে চলে গেছে। পরদিনই তারা উল্টা এইমর্মে অভিযোগ করে যে, গণজাগরণ মঞ্চ সরকার ও আওয়ামী লীগের নিয়ন্ত্রণে পরিচালিত হচ্ছে। তাদের এই অভিযোগের প্রমাণ হিসেবে তারা তেমন ভারি কোনো যুক্তি দিতে না পেরে, সরকারের ট্রাফিক ডাইভারশনের ব্যবস্থাপনা, ওয়াসা কর্তৃক পানি সরবরাহের আয়োজন, নিরাপত্তার জন্য সিসিটিভি ক্যামেরা স্থাপন, শাহবাগ চত্বরে রাতে অতিরিক্ত আলো স্থাপন ইত্যাদি হালকা কিছু বিষয় দৃষ্টান্ত হিসেবে হাজির করে। বিএনপি যখন নয়া পল্টনে রাস্তা বন্ধ করে সভা করে তখন যে ট্রাফিক ডাইভারশন করা হয়, তাদের মিছিল যাওয়ার জন্য যে পুলিশ এসকর্ট ও আগাম ট্রাফিক নিয়ন্ত্রণ করা হয়, তাদের সম্মেলনের বড় সমাবেশে নিরাপত্তার প্রয়োজনে যে যান্ত্রিক যন্ত্রপাতি স্থাপন করা হয়, এসবের কারণে কি তাহলে একইভাবে বলতে হবে যে, বিএনপির সভা-মিছিল-সম্মেলনগুলো সরকার নিয়ন্ত্রিত অনুষ্ঠান? তাহলে গণজাগরণ মঞ্চ সম্পর্কে বিএনপির সেরূপ অভিযোগের আসল কারণ কি? বুঝতে অসুবিধা হয় না যে, তা নিছকই জামায়াতের পক্ষ নেয়ার জন্য একটি অজুহাত সৃষ্টির উদ্দেশ্য ছাড়া অন্য কিছু নয়। গণজাগরণ মঞ্চ যে একটি সরকার নিয়ন্ত্রিত উদ্যোগ তা প্রমাণের জন্য বিএনপির হাজির করা আরেকটি যুক্তি হলো, এই মঞ্চ থেকে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দাবি, শেয়ার কেলেঙ্কারি-হলমার্ক কেলেঙ্কারি ইত্যাদির বিচারের দাবিতে টুঁ শব্দটি করা হচ্ছে না। শাহবাগের তরুণ প্রজন্মের প্রতি বিএনপির পরামর্শ ছিল এসব দাবিতে সোচ্চার হয়ে প্রমাণ করা যে, তারা সরকার নিয়ন্ত্রিত আন্দোলন করছে না। বিএনপির এই পরামর্শের উপযুক্ত জবাবটা শুনেছিলাম একটি টিভি টক শোতে গণজাগরণ মঞ্চের তারকা হয়ে ওঠা শ্লোগানকন্যা লাকী আক্তারের মুখে। লাকী সহজ উদাহরণ দিয়ে বলেছিল যে, শিক্ষার্থীদের পদার্থবিদ্যা, অংক, ইংরেজি, বাংলা ইত্যাদি নানা বিষয়েই পরীক্ষা দিতে হয়। যখন পদার্থ বিদ্যার পরীক্ষা চলছে তখন উত্তরপত্রে ইংরেজি প্রশ্নের জবাব লেখাটা নেহায়েত আহাম্মকি ছাড়া অন্য কিছু নয়। যেদিন ইংরেজি বা অন্য বিষয়ের পরীক্ষার দিন আসবে সেদিন সে বিষয়ে উত্তর লেখা যাবে। এখন সংগ্রাম চলছে যুদ্ধাপরাধীদের ফাঁসি, জামায়াত-শিবির নিষিদ্ধকরণ ও মুক্তিযুদ্ধের চেতনার পুনঃজাগরণের লক্ষ্যে। এখনই অন্য ইস্যু এনে আন্দোলনের শ্লোগানে তা যুক্ত করার অর্থ হবে আন্দোলনকে ক্ষতিগ্রস্ত করা। পদার্থবিদ্যার পরীক্ষায় ইংরেজি প্রশ্নের উত্তর যুক্ত করলে পদার্থবিদ্যা বা ইংরেজি কোনো পরীক্ষাতেই পাস করার সুযোগ থাকে না। বিদেশ থেকে ফিরে এসে বিএনপি চেয়ারপার্সন সংবাদ সম্মেলন করে জানিয়ে দিলেন যে, দুইপক্ষের মধ্যে কোন পক্ষকে তিনি বেছে নেয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীর ফাঁসির রায়ের পর জামায়াতের ক্যাডাররা যে ৪ জন পুলিশকে পিটিয়ে হত্যা করলো, ৭০ বছরের বৃদ্ধ, কোলের শিশু, রিকশাচালকসহ অসংখ্য মানুষকে সহিংস আক্রমণ চালিয়ে হত্যা করলো, থানা আক্রমণ করলো, রেললাইন উপড়ে ফেললো, হাজার হাজার বোমা-ককটেল ফুটিয়ে ও ঘরবাড়ি, দোকানপাট লুটপাট করলো—সেসব তাণ্ডবের নিন্দা জানিয়ে তিনি একটি কথাও বললেন না। মন্দির, প্যাগোডায় ও সংখ্যালঘুদের ওপর হামলা চালিয়ে জামায়াত যে সাম্প্রদায়িক সহিংসতা ছড়ানোর চেষ্টা করলো, সেই ঘৃণ্য সন্ত্রাসের জন্য জামায়াতকে তিনি অভিযুক্ত করলেন না। জনগণের জান-মাল রক্ষার জন্য পুলিশের গুলিতে জামায়াতের দুর্বৃত্তদের নিহত হওয়ার ঘটনাকে তিনি ‘গণহত্যা’ আখ্যা দিলেন। এর মাধ্যমে তিনি একই সাথে ’৭১-এর গণহত্যার নিষ্ঠুর ভয়াবহতাকে আড়াল করার চেষ্টা করলেন। তিনি জামায়াতের মতো একই সুরে গান গাইলেন ও জামায়াতের পাশে দাঁড়িয়ে ৫ মার্চ হরতাল ডাকলেন। শাহবাগ চত্বরকে কেন্দ্র করে দেশব্যাপী গড়ে ওঠা গণজাগরণ যে তারুণ্যের ও মুক্তিযুদ্ধের এক অভূতপূর্ব উত্থানের ইতিহাস রচনা করে চলেছে সে কথা খালেদা জিয়ার বিবেচনায় স্থান পেল না। ’৭১-এ তত্কালীন মেজর জিয়া জামায়াতের বদলে মুক্তিযুদ্ধের পক্ষ বেছে নিয়েছিলেন। ইতিহাসের গতি বুঝতে তিনি সেদিন ভুল করেননি। কিন্তু বেগম খালেদা জিয়া জামায়াতের পক্ষ বেছে নিয়ে যে বিশাল এক ঐতিহাসিক ভুল শুধু নয়, অপরাধ করলেন, সে উপলব্ধি তার কতো দিনে আসবে বা তা আদৌ আসবে কিনা তা কে বলতে পারে? লেখক:সভাপতি, বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টি E-mail: [email protected]

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন