অর্থনীতি

কু-ঋণ, খেলাপি ঋণ ও সরকারি ঋণে জর্জরিত ব্যাংক

আপডেট : ০৩ মার্চ ২০১৩, ২২:০৮
বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রতিবেদনে জানা গেছে যে, ব্যাংকিং সিস্টেমে কু-ঋণ বা সন্দেহজনক ঋণ এবং খেলাপি ঋণের পরিমাণ বেড়েই চলছে। ২০১২ সালের সেপ্টেম্বর কোয়ার্টারে সন্দেহজনক ঋণ ১৬২৫ কোটি টাকা বেড়েছে। শতকরা হিসাবে জুনে ৮৮ শতাংশ থেকে বেড়ে ১.২৫ শতাংশে কু-ঋণ পৌঁছেছে। সেপ্টেম্বর পর্যন্ত কু-ঋণের পরিমাণ সবচে বেশি ছিল রাষ্ট্রায়ত্ত ৪ ব্যাংক ও বিশেষায়িত ২ ব্যাংকে। সোনালী ব্যাংকের কু-ঋণের পরিমাণ ছিল ১০৭৮ কোটি টাকা যা সবচাইতে বেশি। শতকরা হিসাবে এর পরিমাণ মোট ঋণের ৩.২৭ শতাংশ। অথচ জুন পর্যন্ত কু-ঋণের পরিমাণ ছিল ৪২৩.৩৮ কোটি। হলমার্ক কেলেঙ্কারির পরই সোনালী ব্যাংকের এ দুরবস্থা সৃষ্টি হয়েছে। কু-ঋণের দিক থেকে দ্বিতীয় বৃহত্ স্থানে কৃষি ব্যাংক যার কু-ঋণের পরিমাণ ৭৫৭.৭৮ কোটি যা মোট ঋণের ৫.৩৬ শতাংশ। অগ্রণী ব্যাংক ৪০২.২৬ কোটি বা মোট ঋণের ২.০৭ শতাংশ কু-ঋণ নিয়ে তৃতীয় অবস্থানে এবং জনতা চতুর্থ অবস্থানে। রাজশাহী কৃষি ব্যাংক ২০৬.৫ কোটি বা ৫.৭৯ শতাংশ কু-ঋণ নিয়ে বিশেষায়িত ব্যাংকের মধ্যে প্রথম স্থানে। সে তুলনায় বেসরকারি ব্যাংকসমূহের কু-ঋণের পরিমাণ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ১৬৩৪.৫১ কোটি টাকা থেকে বেড়ে ২২১৬.১৩ কোটি টাকায় দাঁড়িয়েছে যা আশঙ্কাজনক নয়। বিদেশি ব্যাংকগুলোর কু-ঋণের পরিমাণও সহনীয় পর্যায়ে আছে। এদিকে খেলাপি ঋণের অবস্থাও তথৈবচ। ২০১২ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত সব ব্যাংক মিলে ২৩৪২.৩৬ কোটি টাকা খেলাপি ঋণ অবলোপন করেছে এবং ঐ সময় অবলোপনকৃত মোট খেলাপি ঋণ ছিল ২৩,৮৩৫.৮৬ কোটি টাকা যা ২০১১ সালের তুলনায় প্রায় ৩০০০ কোটি টাকা বেশি। বাংলাদেশ ব্যাংকের নীতিমালা মোতাবেক ৫ বছর বা ততোধিক সময় যাবত্ পড়ে থাকা খেলাপি ঋণের বিপরীতে ১০০% প্রভিশন রেখে ঐ ঋণ অবলোপন করা হয়। অবলোপনকৃত ঋণ মুনাফা থেকে সরাসরি বাদ দেয়া হয় এবং একটি পৃথক হিসাবে স্থানান্তর করে আদায়ের চেষ্টা করা হয়। তবে অবলুপ্ত ঋণ আদায় করার সর্বাত্মক প্রচেষ্টা থাকে না বলে অধিকাংশ ক্ষেত্রে এ ঋণ আদায় হয় না। ২০১২ সালের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ব্যাংকিং সিস্টেমে মোট খেলাপি ঋণ ছিল ৩৬,২৮২ কোটি টাকা যা অবলোপনকৃত ঋণের সংগে যোগ করলে মোট পরিমাণ দাঁড়াবে প্রায় ৬০,০০০ কোটি টাকা। ব্যাংক পরিচালনায় অদক্ষতার জন্য এ খেলাপি ও অবলোপনকৃত ঋণের সৃষ্টি। এতে ঋণ গ্রহণকারী ব্যক্তিগতভাবে লাভবান হলেও ব্যাংক নিজে, সরকার ও জনসাধারণ সমষ্টিগতভাবে আর্থিক ক্ষতির সম্মুখীন হয়। এ ঋণের পরিমাণ অতিরিক্ত বেড়ে গেলে ব্যাংকের লাভ অর্জন ক্ষমতা ও নগদ অর্থের ঘাটতি স্থায়ীভাবে বৃদ্ধি পেতে পারে এবং এক সময় ব্যাংক আমানতকারীদের চাহিদা মিটাতে ব্যর্থ হয়ে দেউলিয়াত্ব বরন করতে পারে। তাছাড়া সরকারি ঋণের পরিমাণও দিন দিন বৃদ্ধি পাচ্ছে। সরকারের বর্তমান পুঞ্জীভূত ঋণ ১,০১,২১৫ হাজার কোটি টাকা ছাড়িয়েছে। সরকারি ঋণে ব্যাংকের মুনাফা অর্জিত হয় না। ফলস্বরূপ ব্যাংকের মূলধন ও প্রভিশন ঘাটতি ও বেড়ে গিয়েছে। এ অবস্থা থেকে উত্তরণের একমাত্র উপায় নতুন ঋণ প্রদানে প্রয়োজনীয় দক্ষতা ও সতর্কতা অবলম্বন এবং বিলিকৃত ঋণ ও খেলাপি ঋণ আদায়ে সর্বাত্মক প্রচেষ্টা চালানো। ব্যাংক পরিচালনায় বোর্ড সদস্যদের ভূমিকা যেমন গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নিবিড় পর্যবেক্ষণও তেমনি অর্থবহ। বাংলাদেশ ব্যাংক শুধু নীতিমালা প্রণয়ন করে ছেড়ে দিলেই হবে না, নীতিমালা অনুসরণ করা হচ্ছে কি না তা নিশ্চিত করার জন্য দাখিলকৃত রিটার্নগুলোতে যথেষ্ট তথ্য প্রদান করার প্রভিশন রেখে তা পরীক্ষা করতে হবে। রিটার্নে ভুল তথ্য সরবরাহ করলে জেল-জরিমানা আরোপ করতে হবে। দ্বিতীয়ত রিটার্নের তথ্য যাচাই করার জন্য প্রতিটি ব্যাংকের প্রধান অফিস ও বড় বড় শাখা মাসিক বা ত্রৈমাসিক ভিত্তিতে দক্ষ লোকবল দ্বারা অডিট করতে হবে। অন লাইনে রিটার্ন দাখিল করার ব্যবস্থা করে সময় ও খরচ বাঁচাতে রিটার্ন পরীক্ষা করার সফটওয়ার ব্যবহার করা যেতে পারে। এদিকে বোর্ডের সদস্য নিয়োগেও পেশাদারী অভিজ্ঞ লোক নিয়োগের বিকল্প নেই। অপেশাধারী বা রাজনৈতিক পরিচালক দিয়ে কোন ব্যাংক দক্ষভাবে চলতে পারে না। বোর্ড সদস্যদের শিক্ষাগত যোগ্যতা ও অভিজ্ঞতা কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নীতিমালায় থাকা উচিত। সরকার যত বেশি ঋণ নেবে, সাধারণ ব্যবসায়ী ও শিল্পপতিরা তত কম ঋণ পাবেন। এ ব্যাপারেও সরকারের ভাবা উচিত। ব্যাংকিং সেক্টর সবল থাকলে অর্থনীতিও শক্তিশালী হবে। লেখক : এফসিএ ও কথাসাহিত্যিক

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন