[ আ লো ক পা ত ]

নির্মূলের রাজনীতি

আপডেট : ০৪ মার্চ ২০১৩, ২০:৩৪
নির্বিচারে পুলিশ গুলি করে একদিনে ষাটেরও অধিক মানুষ হত্যা করেছে, এখনও হত্যাযজ্ঞ চলছে। ফলে আমাদের প্রথম কাজ হচ্ছে হত্যাযজ্ঞ বন্ধ করা। এই বর্বরতার কঠোর নিন্দা করা। এর আগে ‘এই হত্যাযজ্ঞ বন্ধ করুন’ বলে আবেদন জানিয়েছি সকল পক্ষের কাছে। কিন্তু তার পরিবর্তে এই হত্যাযজ্ঞকে কেন ‘গণহত্যা’ বলা হোল তা নিয়ে শোরগোল শুরু করে দিয়েছে দলবাজ ও মতান্ধরা। তারা বলছে জামায়াত-শিবির পুলিশের ওপর আক্রমণ চালিয়েছে, অতএব নির্বিচারে পুলিশ দিয়ে মানুষ হত্যা জায়েজ। কারণ মারা হচ্ছে জামায়াত-শিবির। তাদের দাবি, যেহেতু পুলিশের ওপর আক্রমণ হয়েছে অতএব ক্ষমতাসীন সরকারের গণহত্যার পথই সঠিক পথ। ফলে গুলি চলেছে, হত্যাযজ্ঞ চলছে। আন্তর্জাতিকভাবে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে অনেক দেশ। তবুও এই হত্যাযজ্ঞ চলবে। একাত্তরে জামায়াতের ভূমিকা নিঃসন্দেহে নিন্দনীয়। মানবতার বিরুদ্ধে তাদের অনেকে জড়িত ছিল এবং তার বিচার হওয়া দরকার, এব্যাপারে কোনই সংশয় বা সন্দেহ নাই। জামায়াতের মতাদর্শের বিরুদ্ধেও মতাদর্শিক ভাবে লড়বার প্রয়োজন রয়েছে। এই কাজটি রাজনৈতিক কাজ, চিন্তা দিয়ে মোকাবিলা করবার কাজ, বুদ্ধি দিয়ে পরাস্ত করবার কর্তব্য। ক্রিমিনাল অপরাধের বিচার করবার কাজ এইগুলো নয়। সেটা আলাদা। তাকে আলাদা ও সুনির্দিষ্টভাবে শনাক্ত করে আদালত ও আইনী প্রক্রিয়ার মধ্যেই বিচারের কাজ করতে হবে। সমাজে নানান প্রচার প্রপাগাণ্ডায় এই ধারণা বদ্ধমূল করা হয়েছে যে, বিচারের নামে কয়েকজন জামায়াতের নেতাকে ফাঁসিতে ঝুলিয়ে দিতে পারলেই রাজনৈতিকভাবে জামায়াত-শিবিরকে নির্মূল করা সম্ভব। জামায়াত-শিবিরের সঙ্গে রাজনৈতিকভাবে মোকাবিলার হিম্মত যাদের নাই, তারাই কিছু নেতাকে ফাঁসি দিয়ে দিলে তাদের রাজনীতিরও কবর হবে বলে মনে করে। দুর্ভাগ্য যে, বামপন্থি প্রগতিশীল নামে পরিচিত বুদ্ধি-প্রতিবন্ধীও এটা মনে করে। নিজেদের আদর্শের ওপর এদের ঈমান কতোদূর এতেই সেটা বোঝা যায়। যদি দেশকে সামনে এগিয়ে নিয়ে যাবার জন্য আমরা সিদ্ধান্ত নিয়ে থাকি যে, একাত্তরের ক্ষত নিরাময়ের জন্য আমরা সকল প্রকার রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ ছাড়া একটি স্বচ্ছ ও বিশ্বাসযোগ্য আইনী প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধের বিচার করব, তাহলে বিচারকে বিচারই হতে হবে। ওপরে রাজনৈতিক যে কাজের কথা বললাম সেইসবকে আলাদা কর্তব্য জ্ঞান করে বিচারকে বিচারকাজ হিসাবেই সম্পন্ন করতে হবে। অর্থাত্ রাজনীতি ও বিচার প্রক্রিয়াকে অবশ্যই আলাদা রাখতে হবে। রাজনীতির কাজ রাজনীতির ক্ষেত্রে, বিচার প্রক্রিয়ার কাজ বিচারের জায়গায়। একাকার করে ফেললে চলবে না। আদালত সুনির্দিষ্ট অপরাধের বিচার করবে, সেই ক্ষেত্রে বিচারকে সুষ্ঠুভাবে সম্পন্ন করতে দিতে হবে। যদি সেটা আমরা করতে পারতাম তাহলেই সকল পক্ষের কাছে তা গ্রহণযোগ্য সমাধান হিসাবে বিবেচিত হোত। একাত্তরের ক্ষত নিরাময়ের একটা অগ্র পদক্ষেপ আমরা নিতে পারতাম। এই দুটো কাজকে একাকার করে ফেলার কারণে এই ধারণা বদ্ধমূল হয়েছে জামায়াত-শিবিরকে যে কোন মূল্যে ‘নির্মূল’ করাই আমাদের কাজ। তাহলে আমরা বিচার নয়, গৃহযুদ্ধের পরিস্থিতিই এতোকাল তৈরি করে এসেছি মাত্র। অনেকে বলে থাকেন জামায়াত বড় বেড়ে গেছে। তখন জামায়াতের এই বৃদ্ধিকে নিজেদের রাজনৈতিক ব্যর্থতা আকারে না দেখে জামায়াত-শিবিরকে নির্মূল করলেই বুঝি সেই ব্যর্থতা কাটিয়ে ওঠা যাবে মনে করি। দরকার ছিল নিজেদের আত্ম-সমালোচনা করা ও কারণ অনুসন্ধান না করা। তা না করে দাবি করা হয় এই দেশে জামায়াত-শিবিরের মতাদর্শ যারা ধারণ করে তাদের থাকবার কোন অধিকার নাই, তাদের পাকিস্তান ফেরত পাঠাতে হবে। তাহলে আমরা কি আসলে বিচার চাইছি? এই সকল কারণে এটা পরিষ্কার যে, নির্মূলের রাজনীতির অর্থ হচ্ছে বাংলাদেশকে একাত্তরের আগের নয় মাসে ফিরিয়ে নিয়ে যাওয়া। এখন একাত্তরের হাতিয়ার গর্জে উঠুক আরেকবার বলে আদতে বিচার নয়, আমরা গৃহযুদ্ধই শুরু করেছি। আমি সাবধান করেছিলাম যে, পুলিশ ক্ষমতাসীন দলের পক্ষে সন্ত্রাসী ভূমিকায় নামলে ধীরে ধীরে তার বিরুদ্ধে পালটা বল প্রয়োগের পক্ষে জনমত তৈরি হয়। জামায়াত-শিবির এই ফাঁদে ফেলতে চাইলেও আমরা যেন সেই ফাঁদে পা না দেই। এই পরিপ্রেক্ষিতেই আমি পুলিশ কর্মকর্তাদের কাছেও আকুতি জানিয়েছিলাম জনগণের মৌলিক নাগরিক ও মানবিক অধিকার রক্ষা করুন। নইলে আপনাদের ব্যক্তিগতভাবে একদিন জবাবদিহি করতে হবে। থানা আক্রমণ ও পুলিশ হত্যার দায়দায়িত্ব শেখ হাসিনার সরকারকেই বহন করতে দিন। তিনিই শান্তিপূর্ণভাবে বিক্ষোভ প্রকাশের সকল পথ বন্ধ করে দিয়েছেন। পুলিশ বাহিনীর যারা দায়িত্বে রয়েছেন তাদের এই বিপদ সম্পর্কে সতর্ক হতে বলেছিলাম। কিন্তু তারা নিজেদের আওয়ামী ক্যাডার বাহিনীতে পরিণত করবার পথকেই সঠিক মনে করেছেন। জনগণের চোখে এখন পুলিশ আওয়ামী লীগের দলীয় বাহিনী ছাড়া অধিক কিছু নয়। সন্ত্রাসী রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে জনগণ ফুঁসে উঠেছে। বগুড়া ধরে পুরা উত্তরবঙ্গ, কক্সবাজার, নোয়াখালী ইত্যাদি জেলায় সংঘর্ষ ছড়িয়ে পড়েছে। বিক্ষোভ ক্রমশ বিদ্রোহে পরিণত হতে চলেছে। পুলিশের পক্ষে নির্বিচার হত্যাযজ্ঞ চালিয়ে এই বিদ্রোহ দমন অসম্ভব। সকালে শোনা গিয়েছিল সেনাবাহিনীকে এখনই থানা পাহারা দিতে হচ্ছে। পরিস্থিতি যেখানে দ্রুত গিয়ে ঠেকেছে তাতে পুলিশের পক্ষে বহু জেলায় নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখা অসম্ভব। অথচ পরিস্থিতি এরকমই দাঁড়াবে এটা আন্দাজ করা মোটেও কঠিন ছিল না। জনগণের ক্ষোভ-বিক্ষোভ প্রকাশের পথ রুদ্ধ হলে তা সহিংসতার পথ গ্রহণ করে, এটা রাজনীতির অতি সাধারণ একটি সূত্র। যারা বাস্তবে কী ঘটছে তার বাস্তব বিশ্লেষণে না গিয়ে মতান্ধতা ও দলবাজিতা দিয়ে সত্যকে মিথ্যা দিয়ে ঢাকতে চেষ্টা করেছেন, তাদের বুদ্ধিবৃত্তিক দৈন্যতা খুবই স্পষ্ট। অর্থাত্ মতাদর্শিক ভাবে যেহেতু তারা জামায়াত-শিবির বিরোধী অতএব রাজনীতির খেলায় আসলে কি ঘটছে সেইদিকে নজর না দিয়ে তারা জামায়াত-শিবিরকে ঠেকাতে চেয়েছে পুলিশের গুলিতে হত্যা করে। আওয়ামী লীগের ঘাড়ে গিয়ে সওয়ার হয়েছিল তারা। মনে রাখা দরকার মতাদর্শ আর বাস্তব সমার্থক নয়। বিভিন্ন শ্রেণি ও শক্তির লড়াই কিভাবে পরস্পরের বিরুদ্ধে লড়ে, কিভাবে ক্ষমতার ভারসাম্য নানাভাবে নিজেকে ব্যক্ত ও প্রতিষ্ঠা করে সেটা বোঝার বিজ্ঞান আলাদা। যারা মার্কস ভাল করে পড়েছেন তাদের কাছে মার্কস নিছক আদর্শ মাত্র নয়। চোখের সামনে বাস্তবে কি ঘটছে, এবং সম্ভাব্য পরিণতি কী হতে পারে তা পাঠ ও বিশ্লেষণের বিজ্ঞানও বটে। বাংলাদেশ যারা নিজেদের মার্কসের ছাত্র মনে করেন, তারা বাস্তবতার প্রতি মনোযোগী না হয়ে, মতাদর্শিকভাবে কতোটা কারেক্ট বা সঠিক সেটা সামাজিকভাবে প্রমাণের জন্য ব্যস্ত হয়ে পড়েছিলেন। শাহবাগকে মহিমান্বিত করবার জন্য অধীর হয়ে পড়েছিলেন। সঠিক কথা বলে এবং শেখ হাসিনার শাহবাগী তামাসার বিরোধিতা করে ‘রাজাকার’ গালি শোনার জন্য প্রস্তুত ছিলেন না। শাহবাগ সমর্থন না করলে তাদের মধ্যবিত্তমার্কা প্রগতিশীলতার বেলুন ফুটা হয়ে যাবে সেই লজ্জায় তারা ভীত ছিলেন। ইতিহাস বড়ই নিষ্ঠুর। স্কাইপি কেলেঙ্কারি ফাঁস হবার পরপরই জামায়াত-শিবির বুঝে গিয়েছিল আইনী প্রক্রিয়ার মধ্যে তারা মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধে অভিযুক্তদের জন্য ন্যায়বিচার পাবে না। দেশে ও বিদেশে ট্রাইবুনালকে আন্তর্জাতিক মান বজায় রাখবার পক্ষে যে জোরালো দাবি ও চাপ বহাল ছিল তাতে তারা এই আশা করেছিল যে, বিচার প্রক্রিয়া যদি স্বচ্ছ ও সুষ্ঠু হয় তাহলে তারা প্রমাণ করতে পারবে অনেক অভিযোগ ভিত্তিহীন। সুনির্দিষ্ট অপরাধ প্রমাণিত হলে তা মেনে নেবার জন্যও তারা বাধ্য হোত। এছাড়া তাদের উপায় ছিল না। কিন্তু শেখ হাসিনা নির্বাচনের বছর যতোই ঘনিয়ে আসল মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধের বিচার নিয়ে রাজনৈতিক খেলায় মেতে উঠলেন। আজ পরিস্থিতির পুরা দায়দায়িত্ব তাকেই নিতে হবে। আর কেউই নয়। জামায়াত-শিবিরের কাছে নিয়মতান্ত্রিক রাজনীতি করবার ও সুবিচার পাবার সম্ভাবনা নাই এই সত্য পরিষ্কার হয়ে যাবার পরই জামায়াত-শিবির গত অক্টোবর থেকে বিক্ষিপ্তভাবে পুলিশের ওপর আক্রমণ চালিয়ে তাদের অবস্থান সরকার ও জনগণকে জানিয়ে দেবার চেষ্টা করে। অর্থাত্ জানিয়ে দিল, বিচার সুষ্ঠু ও স্বচ্ছ না হলে তারা বল প্রয়োগের পথে যাবে। সরকার তাকে গ্রাহ্য করেনি। তবে এরপর জামায়াতের সমাবেশে তারা ট্রাইব্যুনাল ও বিচারের বিরুদ্ধে বক্তব্য দেয় এবং অভিযুক্তদের নির্দোষ দাবি করে তাদের নিঃশর্ত মুক্তি চায়। এই সমাবেশে জামায়াত-শিবির গৃহযুদ্ধের হুমকি দেয়। এই রাজনৈতিক অবস্থান ছিল জামায়াত-শিবিরের জন্য আত্মঘাতী। শেখ হাসিনা ঠিক এ কথাটাই শুনতে চেয়েছিলেন এবং এই সুযোগে জামায়াত-শিবিরকে নিশ্চিহ্ন করবার পক্ষে তিনি মধ্যবিত্ত শ্রেণিকে তাতিয়ে নেন। স্কাইপি কেলেঙ্কারির পরে বিচার ব্যবস্থা কার্যত তার ন্যায্যতা হারিয়ে ফেলেছিল। জামায়াতের এই সমাবেশ ও একাত্তরে তাদের অপরাধ অকাতরে অস্বীকার করাকে সেক্যুলার মধ্যবিত্ত শ্রেণি বিশেষত শহরের তরুণদের বিশাল একটি অংশ চ্যালেঞ্জ হিসাবে গ্রহণ করে। শাহবাগের প্রাথমিক সফলতার এটাই প্রধান কারণ। শাহবাগীরা অভিযুক্তদের যে কোন প্রকারে ফাঁসিতে ঝুলিয়ে দিতে চায়। বিচার বলতে তারা একটি ডিকটেটেড ফাঁসির রায় চায়। তাদের নিরন্তর ফাঁসি ফাঁসি শুনে তাদের বাসনা সকলের কাছে আরও পরিষ্কার হয়ে যায়। ফাঁসির দাবিতে উন্মত্ত শহুরে মধ্যবিত্ত লক্ষ্য না করলেও আবুল কালাম আযাদ ও কাদের মোল্লার রায় দেখে জামায়াত-শিবির পরিষ্কার হয়ে গেল মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধের বিচারের ক্ষেত্রে ন্যায়বিচার পাওয়া অসম্ভব। কারণ রায় রাজনৈতিকভাবে নির্ধারিত হবে। আইনী প্রক্রিয়ার যৌক্তিক পরিণতি হিসাবে নয়। তদুপরি শাহবাগে ফাঁসির দাবির জন্য গণজাগরণের মঞ্চ খোলা ও তার প্রতি সকল প্রকার রাষ্ট্রীয়, সরকারি ও দলীয় সমর্থন দেখে জামায়াত শিবির বুঝে নিল বলপ্রয়োগের পথ গ্রহণ করা ছাড়া জামায়াত-শিবিরের সামনে কোন গণতান্ত্রিক, সাংবিধানিক বা আইনী পথ খোলা নাই। নিজের অস্তিত্ব নিয়ে টিকে থাকবার জন্য তাকে বলপ্রয়োগের পথে যেতে হোল। শেখ হাসিনাও এর জন্য তৈরিই ছিলেন। তিনি পুলিশকে সরাসরি গুলি চালাবার নির্দেশ দিলেন। জামায়াত-শিবির আওয়ামী লীগের মতোই মধ্যবিত্ত শ্রেণির দল। এই লড়াইটা মধ্যবিত্ত শ্রেণির মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকত এবং এতে জামায়াত-শিবিরের পরাজয় ছাড়া অন্য কোন সম্ভাবনা ছিল বলে আমার মনে হয়নি। কিন্তু আমার দেশ পত্রিকা নিষিদ্ধের দাবি ও তার সম্পাদক মাহমুদুর রহমানের ওপর শেখ হাসিনার দমন-পীড়নের কারণে মধ্যবিত্ত শ্রেণির একটি অংশ এবং ইসলামপ্রিয় বিশাল একটি জনগোষ্ঠীকে সরকার বিরূপ করে ফেলেছিল। তারা জামায়াত শিবিরের এই বলপ্রয়োগের কৌশলের প্রতি নীরব সমর্থন দিতে শুরু করে। সরকারের বিরুদ্ধে নিম্নমধ্যবিত্ত ও গরিব মানুষের ক্ষোভের কারণে পুলিশের বিরুদ্ধে জামায়াত শিবিরের বল প্রয়োগের কৌশলের প্রতিও জনগণের আগ্রহ বাড়তে থাকে। তারা ভাবতে থাকে জালিম শাহীকে উত্খাত করবার জন্য এ ছাড়া অন্য কোন পথ নাই। তারা জামায়াত-শিবিরের আদর্শ নয়, তাদের শক্তি প্রদর্শনে আকৃষ্ট হয়। ভুলে গেলে চলবে না পুলিশ সবসময় মজলুম ও গরিব মানুষের কাছে জালিম শাসকের সাক্ষাত্ প্রতিনিধি হিসাবেই হাজির থাকে। যে কারণে পুলিশের ওপর আক্রমণের প্রতি তারা সমর্থন দেয়। ইতিমধ্যে কিছু ব্লগারের ইসলাম বিদ্বেষ ও নবি করিমের ওপর কুিসত রচনা প্রকাশিত হয়ে পড়ার পর গ্রামের ধর্মপ্রাণ সাধারণ মানুষ শাহবাগের মতাদর্শিক চরিত্র সম্পর্কে সচেতন হয়ে ওঠে এবং এর বিরুদ্ধে ফুঁসে ওঠে। গ্রামে যারা কৃষক, ছোট ব্যবসায়ী, দিনমজুর ও নানান পেশায় নিয়োজিত মানুষ তারা বিক্ষোভে আস্তে আস্তে যুক্ত হয়ে পড়তে শুরু করে। আগুন যখন জ্বলছে ঠিক তখনই দেলাওয়ার হোসেইন সাইদীর মৃত্যুদণ্ডের রায় ঘোষণা হোল। দেলাওয়ার হোসেইন সাইদী কোন শ্রেণির প্রতিনিধি সেটা এই রায় ঘোষণার পর স্পষ্ট হয়ে ওঠে। কমপক্ষে পঞ্চাশের বেশি গ্রামের গরিব মানুষ জীবন দিল। আহত হয়েছে কয়েক হাজার। মনে রাখতে হবে তাকে এখনও ফাঁসি দেওয়া হয়নি, শুধু ট্রাইব্যুনালে রায় ঘোষণা করা হোল মাত্র। এর ফলে লড়াই মধ্যবিত্তের পরিসর থেকে বেরিয়ে গ্রামীণ খেটেখাওয়া গরিব মানুষের মধ্যে ছড়িয়ে পড়ল। রাজনীতির গুণগত উল্লম্ফন ঘটে গেল। শহরের বিরুদ্ধে গ্রামের গরিব জনগণের বিদ্রোহের একটি পটভূমি তৈরি হোল। বেগম খালেদা জিয়া বিদেশে চিকিত্সা শেষে ফিরে এসে কঠোর অবস্থান নেবেন এটা হয়তো কেউই আশা করেনি। শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে তিনি মূলত ‘গণহত্যা’ অর্থাত্ মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধের অভিযোগ এনেছেন। গত কয়েকদিনের হত্যাকাণ্ড আন্তর্জাতিক আইনের সংজ্ঞায় ‘গণহত্যা’-ই । ‘গণহত্যা’ হতে হলে হিটলারের ইহুদি নিধন কিম্বা একাত্তরের পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে তুলনীয় হতে হবে এমন কোন কথা নাই। এই ধরনের ফালতু তর্ক যারা করছেন তারা তাকে ভবিষ্যতে রক্ষা করতে সক্ষম হবেন না। তবে যারা এই তর্ক করছেন তাদের মূল উদ্দেশ্য এই হত্যাকাণ্ড চালিয়ে যাবার জন্য শেখ হাসিনাকে উত্সাহিত করা, যদিও তার দায়দায়িত্ব ভবিষ্যতে তারা কেউই নেবেন না। সুনির্দিষ্টভাবে জামায়াত-শিবির ‘নির্মূল’-ও গণহত্যা হিসাবে গণ্য হবে। গত কয়েকদিনের হত্যাকাণ্ডকে মানবাধিকারের বিরুদ্ধে অপরাধ হিসাবে প্রমাণ করা মোটেও কঠিন নয়। বাংলাদেশের রাজনীতিতে আস্তে আস্তে বেগম খালেদা জিয়া ও তার বিএনপি অপ্রাসঙ্গিক হয়ে উঠছিল। এখন তার কঠোর অবস্থান তাকে হয়তো সাময়িক রক্ষা করবে, কিন্তু তিনি যদি গণমানুষের এই বিদ্রোহ থেকে দূরে সরে থাকেন, তাহলে শেষ রক্ষা হবে কিনা এখনও বলা যায় না। তবে নিয়মতান্ত্রিক রাজনীতির পথ যে শেখ হাসিনা সকলের জন্য রুদ্ধ করে দিয়েছেন এটা বোঝার জন্য কাণ্ডজ্ঞানই যথেষ্ট। এই শিক্ষা যদি বেগম খালেদা জিয়া না পেয়ে থাকেন তাহলে গতকাল বিএনপির শান্তিপূর্ণ মিছিলে পুলিশের নির্বিচার গুলিবর্ষণ দেখে তিনি কিছু শিক্ষা নেবেন আশা করি। বাংলাদেশের জনগণ ফ্যাসিস্ট রাষ্ট্রব্যবস্থার বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়িয়েছে। প্রতিটি মুহূর্তই রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। যদি তারা ভুল পদক্ষেপ গ্রহণ করেন তাহলে ইতিহাস তাদের আঁস্তাকড়ে নিক্ষেপ করতে এক মুহূর্তও দেরি করবে না। বেগম খালেদা জিয়া রাজাকার ও যুদ্ধাপরাধীদের পক্ষে অবস্থান নিচ্ছেন আওয়ামী ফ্যাসিস্টদের এই ভাঙা রেকর্ড তাদেরই শুনতে মধুর লাগবে যাদের এইসব ফালতু গান শুনিয়ে ঘুম পাড়িয়ে রাখা সহজ। যারা মতান্ধ বা দলবাজ, দুর্বৃত্তগিরি ও দুর্নীতিই যাদের রাজনীতি, দেয়ালের লিখন তারা পড়তে অক্ষম। বাস্তবে রাজনীতিতে বিভিন্ন শ্রেণি ও শক্তির সমাবেশ কিভাবে ঘটছে সেটা বাস্তবে বিচার করাই আসল কাজ। যারা এই বিচার করতে অক্ষম তারা সারাক্ষণ আওয়ামী ফ্যাসিস্টরা তাদের ‘রাজাকার’ বলে গালি দিল কিনা তা ভেবে অস্থির হয়ে আছে। বাংলাদেশ বহু আগেই এই ধরনের বালখিল্য চিন্তা ও রাজনীতির স্তর অতিক্রম করে এসেছে। মনে রাখতে হবে নিয়মতান্ত্রিক আন্দোলন-সংগ্রামের পথ বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে, বিচার ব্যবস্থার দলীয়করণ বহু আগেই চরমে পৌঁছেছে। দুর্বৃত্তপনা ও দুর্নীতি ঠেকেছে নির্লজ্জ লুটতরাজে, তার ওপর চলছে গণহত্যা। এই পরিস্থিতিতে গণমানুষের মুক্তিই একমাত্র রাজনীতি। লেখক : কবি, প্রাবন্ধিক ও চিন্তাবিদ farhadmazhar¦hotmail.com

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন