হরতাল সমর্থকদের বাধার কারণে গত রবিবার উত্তরাঞ্চলের ১১টি জেলায় কোনো জাতীয় পত্রিকা পৌঁছায় নাই। ফলে সংবাদপত্র শিল্পের সাথে জড়িত ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানসমূহই শুধু ক্ষতিগ্রস্ত হয় নাই, একই সাথে তথ্য জানার অধিকার হইতে বঞ্চিত হইয়াছেন সংশ্লিষ্ট জেলাসমূহের হাজার হাজার মানুষ। সংবাদপত্রে প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, গত রবিবার ভোরে ঢাকা-রংপুর মহাসড়কের বগুড়ার বনানী বাইপাস, নয়মাইল এবং শেরপুরে জাতীয় পত্রিকা বহনকারী সকল গাড়ি আটকাইয়া দেন হরতাল সমর্থকরা। বারবার অনুরোধ করিয়াও কোনো কাজ না হওয়ায় সন্ধ্যায় গাড়িগুলি ঢাকায় ফিরিয়া আসে। ফলে গাইবান্ধা, রংপুর, দিনাজপুর, কুড়িগ্রাম, লালমনিরহাট, ঠাকুরগাঁও, নীলফামারী, পঞ্চগড়, জয়পুরহাট ও নওগাঁ প্রভৃতি জেলার কোথাও জাতীয় পত্রিকা যায় নাই। সারাদিন অপেক্ষা করিয়াও সংবাদপত্র পাঠ করিতে পারেন নাই এইসব এলাকার বিপুলসংখ্যক পাঠক। ইহাতে পাঠকদের পাশাপাশি এজেন্টদের মধ্যেও হতাশার সৃষ্টি হইয়াছে। অর্থনৈতিকভাবেও ক্ষতিগ্রস্ত হইয়াছে সংবাদপত্র শিল্পের সাথে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানসমূহ। স্থানীয় একজন এজেন্ট জানাইয়াছেন যে, পত্রিকা দিতে না পারায় তিনি গ্রাহকদের নিকট হইতে ফেব্রুয়ারি মাসের বিলও তুলিতে পারেন নাই।
সংবাদপত্র পরিবহনে বাধা দেওয়ার বিষয়টি দুর্ভাগ্যজনক শুধু নহে, অপ্রত্যাশিতও বটে। আমাদের দেশে হরতালের অভিজ্ঞতা নূতন নহে। প্রায় সকল রাজনৈতিক দলই বিভিন্ন সময়ে হরতাল করিয়াছেন। কিন্তু সংবাদপত্র পরিবহনে বাধা দেওয়ার ঘটনা অত্যন্ত বিরল। কারণ ঐতিহ্যগতভাবে হাসপাতাল, ক্লিনিক, ঔষধের দোকান, খাবারের দোকান ও অ্যাম্বুলেন্সসহ যেইসব জরুরি ও জনগুরুত্বপূর্ণ সেবাকে হরতালের আওতামুক্ত রাখা হয় গণমাধ্যম তন্মধ্যে অন্যতম। এমনকী স্বাধীনতাপূর্বকালের সেই উত্তাল দিনগুলিতেও সংবাদপত্র এবং ইহার সহিত সংশ্লিষ্ট সাংবাদিকসহ সকল কর্মী ও পরিবহন হরতালের আওতামুক্ত ছিল। স্বাধীনতাপরবর্তীকালে তৈরি পোশাক শিল্পসহ রফতানি খাতকেও হরতালের আওতামুক্ত রাখার বিষয়ে রাজনৈতিক দলগুলির মধ্যে একটি ঐকমত্য গড়িয়া উঠিয়াছে। বলার অপেক্ষা রাখে না যে, রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ বিষয়টি ভালো করিয়াই জানেন এবং গুরুত্বের সাথে তাহা অনুসরণও করিয়া আসিতেছেন দীর্ঘদিন যাবত্। এইবার শুধু যে ইহার ব্যত্যয় ঘটিয়াছে তাহাই নহে, এমনকী সংবাদপত্রের জন্য অত্যাবশ্যক নিউজপ্রিন্ট পরিবহনও বিঘ্নিত হইতেছে বলিয়া জানা গিয়াছে। মতাদর্শগত ভিন্নতার কারণে বহু স্থানে সংবাদপত্র পোড়ানো হইয়াছে। অঞ্চলবিশেষে বিশেষ বিশেষ পত্রিকার পরিবহন ও বিতরণ বাধাগ্রস্ত করা হইয়াছে জোরপূর্বক। ইহা যে অসহিষ্ণুতারই বহিঃপ্রকাশ তাহা বলার অপেক্ষা রাখে না।
অসহিষ্ণুতা যে কাহারো জন্য মঙ্গলজনক নহে তাহা সকলেই জানেন। সর্বাপেক্ষা গুরুত্বপূর্ণ কথাটি হইল, গণতন্ত্র ও অসহিষ্ণুতা একসাথে যায় না। নানা মতের মানুষের শান্তিপূর্ণ সহাবস্থানই হইল গণতান্ত্রিক সমাজের আসল সৌন্দর্য ও শক্তি। গণতন্ত্রে প্রত্যেকেরই স্বাধীনভাবে নিজের মতামত প্রকাশের অধিকার রহিয়াছে। যতো অমিলই থাকুক না কেন, পরমতের প্রতি শ্রদ্ধা প্রদর্শনের নামই হইল সহিষ্ণুতা। এই সহিষ্ণুতা ছাড়া গণতন্ত্র অচল। দুর্ভাগ্যজনকভাবে আমাদের সমাজে অসহিষ্ণুতাকে উসকাইয়া দেওয়ার মতো মানুষের কোনো অভাব নাই। অতএব, গণতন্ত্রপ্রিয় প্রতিটি মানুষকে যেমন এই ব্যাপারে অত্যন্ত সতর্ক থাকিতে হইবে, তেমনি অধিকতর প্রজ্ঞা, দূরদর্শিতা ও দায়িত্বশীলতার পরিচয় দিতে হইবে আমাদের রাজনৈতিক নেতৃত্বকেও।
