পৃথিবীর বিশ কোটিরও অধিক লোক বাংলা ভাষায় কথা বলে। প্রায় দেড় হাজার বছর পূর্বে বাংলা ভাষার জন্ম। অনেক বাধা-বিপত্তি অতিক্রম করে এ ভাষা সমৃদ্ধ হয়েছে।
বাংলাভাষার উত্পত্তি ও জন্ম নিয়ে বিভিন্ন মতবাদ রয়েছে। অনেকে বলেন, বাংলা ভাষার জন্ম হয়েছে ‘সংস্কৃত’ ভাষা থেকে। কারও মতে ‘প্রাচীন প্রাকৃত’, কারও মতে ‘গৌড়ী প্রাকৃত’ থেকে বাংলা ভাষার জন্ম। মহান ভাষাতত্ত্ববিদ ড. মুহাম্মদ শহীদউল্লাহর মতে ‘গৌড়ী প্রাকৃত’ থেকেই নানান বিবর্তনের মধ্য দিয়ে বাংলা ভাষার উত্পত্তি ও বিকাশ লাভ ঘটেছে। অনেকের ধারণা আর্য-ব্রাহ্মণবাদী গুপ্ত যুগের অবসান শেষে বৌদ্ধ পাল রাজাদের রাজত্বকালের শুরুতেই অথবা তার কিছু পূর্বে বাংলা ভাষার পূর্ববর্তী স্তর অপভ্রংশের উত্পত্তি। আমাদের দেশের সবচেয়ে পুরোনো ভাষার নাম ‘প্রাচীন প্রাকৃত’। কালক্রমে ‘প্রাচীন প্রাকৃত’ অভিহিত হয় ‘আধুনিক প্রাকৃত’রূপে। আধুনিক প্রাকৃত ভাষা থেকে শাখা-প্রশাখা গড়ে উঠে ‘গৌড়ী প্রাকৃত’, ‘মাগধী প্রাকৃত’ ইত্যাদি নামে আরো কয়েকটি প্রাকৃত ভাষার জন্ম হয়। কালের বিবর্তনে প্রাকৃত ভাষার আরো পরিবর্তন ঘটে যায় এবং নাম হয় অপভ্রংশ। এই অপভ্রংশ থেকে জন্মলাভ করে আসামের ‘অহমিয়া’ ভাষা, উড়িষ্যার ‘উড়িয়া’ ভাষা, ভারতের ‘হিন্দী’ ভাষা এবং এতদাঞ্চলের ‘বাংলা’ ভাষা ইত্যাদি। মনে হয় প্রাচীনকালের কোন ভাষার সংস্কার করেই ‘সংস্কৃত’ নাম রাখা হয়েছে। কেননা, যা সংস্কার করা হয় সেটাই সংস্কৃত। ইতিহাস সাক্ষ্য দেয় প্রাচীন প্রাকৃত বা আধুনিক প্রাকৃত জনগণের মুখের ভাষা। কিন্তু সংস্কৃত ভাষা কখনও জনগণের মুখের ভাষা ছিল না। এখনও জনগণের মুখের ভাষা নয়। এটা হচ্ছে হিন্দুদের ধর্মীয় ভাষা। ব্রাহ্মণ-ভট্টাচার্য ছাড়া এ ভাষায় পণ্ডিত হবার কারও অধিকার ছিল না। হিন্দু-ব্রাহ্মণ্য রাজাদের যুগে বাংলা ভাষার উপর যে অত্যাচার হয়েছে তাতে বাংলা ভাষা নিশ্চিহ্ন হয়ে যাওয়ার কথা ছিল। কিন্তু সাধারণ মানুষ বাংলাকে ধরে রেখেছিল, টিকিয়ে রেখেছিল। পরবর্তীকালে ১২০৩ সালে ইখতিয়ার উদ্দিন মুহম্মদ বখতিয়ার খিলজী মাত্র ১৭ জন ঘোড়ু-সওয়ার নিয়ে হিন্দু-ব্রাহ্মণ্য রাজা লক্ষণ সেনকে পরাজিত করার পর শুরু হলো বাংলায় মুসলিম শাসন। তাতে মুক্ত হলো সংস্কৃতি, মুক্ত হলো ভাষা। এদেশের কর্মের সাথে, জীবনের সাথে জড়িত হলো বাংলা। বাঙালি মুসলমান বাংলার প্রতি পুরোদমে আকৃষ্ট হলো। বাংলার পাঠান বাদশাগণ, আমীর-ওমরাহ এবং সাধারণ মানুষ বাংলার কদর করতে লাগলো।
তারপর ১৭৫৭ সালে পলাশীর যুদ্ধে ষড়যন্ত্র ও বিশ্বাসঘাতকতার শিকার হয়ে ইংরেজদের হাতে নবাব সিরাজউদ্দৌলার শোচনীয় পরাজয়ের পর কয়েকশত বছরের মুসলিম শাসনের অবসান ঘটে এবং বাংলার জনগণ ও বাংলা ভাষার উপর নেমে আসে আবার নির্যাতন। ইংরেজ আমলে খৃস্টান মিশনারী ও সংস্কৃত পণ্ডিতগণ বাংলা ভাষা থেকে আরবী, ফার্সি, তুর্কী শব্দ এমনকি আঞ্চলিক শব্দও বিতাড়িত করার উদ্যোগ গ্রহণ করেন এবং বাংলা ভাষাকে বিশুদ্ধ করার অপপ্রচার চালিয়ে সংস্কৃত ভাষার শব্দরাজি চাপিয়ে দেন।
ইংরেজ আমলেই ১৯১১ সালে সর্বপ্রথম বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা করার প্রস্তাব দেন নবাব সৈয়দ নওয়াব আলী চৌধুরী। বাংলাকে শিক্ষার বাহন করার জন্যও তিনি জোর দাবি জানান। এরপর ১৯১৮ সালে কবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের সভাপতিত্বে শান্তিনিকেতনে অনুষ্ঠিত সর্বভারতীয় সম্মেলনে ভাষাতাত্ত্বিক পণ্ডিত ড. মুহম্মদ শহীদউল্লাহ ঘোষণা করেছিলেন:“শুধু ভারত কেন, সমগ্র এশিয়া মহাদেশেই বাংলা ভাষার স্থান হবে সর্বোচ্চ। ভাব-সম্পদ ও সাহিত্যগুণে বাংলা ভাষা এশিয়ার ভাষাগোষ্ঠীর মধ্যে অদ্বিতীয়।”
যা হোক, ১৯৪৭ সালে ইংরেজ শাসনের অবসান ও স্বাধীনতা লাভে পাকিস্তান নামক একটি স্বাধীন দেশের সৃষ্টির পরও পূর্ব বাংলার মানুষকে নতুন করে সংগ্রাম করতে হলো মাতৃভাষা বাংলা তথা রাষ্ট্রভাষা বাংলার প্রশ্নে। ১৯৪৭ থেকে ১৯৫২ এবং তত্পরবর্তী পর্যায়েও কঠোর ভাষা-সংগ্রামের মাধ্যমে, ভাষা শহীদদের রক্তের বিনিময়ে ১৯৫৬ সালে পূর্ব বাংলার জনগণের মাতৃভাষা বাংলা অন্যতম রাষ্ট্রভাষার মর্যাদা লাভ করে। তারপর এদেশের নির্যাতিত মানুষের মরণজয়ী ভাষা-সংগ্রামের ফলশ্রুতিতে ও কঠিন আন্দোলনের চেতনায় মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে দক্ষিণ এশিয়ায় একমাত্র ভাষাভিত্তিক রাষ্ট্র হিসেবে স্বাধীন ও সার্বভৌম বাংলাদেশের অভ্যুদয় ঘটে ১৯৭১ সালে।
বাংলাদেশ হওয়ার পরবর্তী পর্যায়ে ১৯৯৯ সালে জাতিসংঘের অংগ সংগঠন ইউনেস্কো সংগত কারণে যথোপযুুক্ত বিবেচনায় ঐতিহাসিক মহান ভাষা আন্দোলন দিবস একুশে ফেব্রুয়ারিকে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস হিসেবে ঘোষণা করে। ভাষা আন্দোলনের আনুষ্ঠানিক বিজয়ের পর এটা বাঙালি জাতির আরেকটি মহত্ বিজয় অর্জিত হলো। মে দিবস, নারী দিবস, মানবাধিকার দিবসের মতো বাঙালির ভাষার অধিকার প্রতিষ্ঠার সংগ্রাম বিশ্বব্যাপী পালিত হচ্ছে জগদ্বাসীর স্বীকৃতিপ্রাপ্ত আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস হিসেবে। এটা আমাদের জন্য পরম গৌরবের বিষয়।
লেখক :ভাষাসৈনিক
