পরিস্থিতি দুর্ভাগ্যজনক

আপডেট : ০৫ মার্চ ২০১৩, ২১:২৪
সংঘাতপূর্ণ রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে ২৭ দিনের ব্যবধানে সারাদেশে নারী ও শিশুসহ প্রাণহানি ঘটিয়াছে কমপক্ষে ১০৭ জন মানুষের। নিহতদের মধ্যে ৬ জন পুলিশও রহিয়াছেন। গত রবি ও সোমবার জামায়াতে ইসলামীর আহ্বানে দেশ জুড়িয়া পালিত হইয়াছে ৪৮ ঘণ্টার হরতাল কর্মসূচি। এই দুই দিনের মৃত্যুর সংখ্যা সর্বাধিক। নিহত হওয়া ছাড়াও মারাত্মকভাবে আহত-রক্তাক্ত হইয়াছেন বহু মানুষ। হতাহতদের বেশিরভাগই গ্রামাঞ্চলের প্রান্তিক মানুষ। যাহারা নিহত হইয়াছেন তাহাদের মধ্যে যেমন আছেন হরতাল সমর্থক রাজনৈতিক কর্মী, তেমনই আছেন সাধারণ নিরীহজন। অন্যদিকে অস্থির পরিস্থিতির মধ্যে দেশের নানা স্থানে গোপনে এবং ক্ষেত্রবিশেষে প্রকাশ্যে সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের মন্দিরে ও বাড়িঘরে ভাঙচুর ও আগুন লাগাইবার ঘটনা ঘটিয়াছে। সামগ্রিক এই পরিস্থিতিকে বিভিন্ন মহল বিভিন্নভাবে ব্যাখ্যা করিয়া চলিয়াছেন। পরস্পর দোষারোপ করা হইতেছে। তবে সকলেই উদ্বিগ্ন। সরকারের তরফ হইতে কোনো প্রেসনোট দিয়া পরিস্থিতি সম্পর্কে ব্যাখ্যা প্রদান করা না হইলেও মন্ত্রিগণের অনেকেই এই হত্যাকাণ্ডের জন্য স্পষ্টতই জামায়াত-শিবিরকে দায়ী করিয়াছেন। এমনও বলা হইয়াছে যে, আত্মরক্ষার্থে পুলিশের গুলি চালাইবার অধিকার রহিয়াছে। পক্ষান্তরে বিরোধী দলীয় নেত্রী বেগম খালেদা জিয়া এই হত্যাকাণ্ডকে ‘গণহত্যা’ বলিয়া আখ্যায়িত করেন। তিনি সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের মন্দিরে ও বাড়িতে হামলার তীব্র নিন্দা জ্ঞাপন করেন। অন্যদিকে সরকারি দল এবং সহমত পোষণকারিগণ সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের উপাসনালয় এবং তাহাদের বাড়িঘরে হামলার জন্য জামায়াত-শিবিরকে দায়ী করিয়া চলিয়াছেন। মন্দির, গীর্জা এবং সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের বাড়িঘরে ভাঙচুর ও হামলার ঘটনার তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদ জানাইয়াছে জামায়াতে ইসলামীও। তাহারা দোষী ব্যক্তিদের খুঁজিয়া বাহির করিতে বিচারবিভাগীয় তদন্ত কমিটি গঠনের দাবি জানাইয়াছে। মোট কথা সার্বিক পরিস্থিতি যেমন উদ্বেগজনক, তেমনই ধূম্রজালে পূর্ণ। চলমান অস্থির, অস্বাভাবিক এবং শঙ্কাপূর্ণ পরিস্থিতির জন্য কে কতখানি দায়ী তাহা নির্ণয় করা সহজ নহে। কেননা জনমত স্পষ্টতই বিভক্ত। কিন্তু রূঢ় বাস্তবতা এই যে, দেশের শতাধিক নাগরিকের প্রাণহানি ঘটিয়াছে। স্বাধীন ও গণতান্ত্রিক দেশের নাগরিক হওয়া সত্ত্বেও তাহাদের জীবন দিতে হইয়াছে আইন-শৃংখলা রক্ষাকারী বাহিনীর গুলিতে কিংবা সহিংসতায়। বাংলাদেশের সাধারণ মানুষ সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতিতে বিশ্বাসী হইলেও সংঘাতপূর্ণ পরিস্থিতিতে হিন্দু সম্প্রদায়ের বাড়িতে এবং তাহাদের মন্দিরে আগুন দেওয়া হইয়াছে, ভাঙচুরের ঘটনা ঘটিয়াছে। প্রায় প্রতিটি ঘটনাই সংঘটিত হইয়াছে রাতের অন্ধকারে, লোকচক্ষুর আড়ালে। কে বা কাহারা এইরূপ ন্যক্কারজনক ঘটনা ঘটাইয়াছে সেই প্রশ্নটি অমীমাংসিত রহিয়া গিয়াছে। পরিস্থিতির সুযোগ লইয়া এই দেশের মানুষের সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির জায়গাটি ভাঙ্গিয়া খান খান করিয়া দিবার দুরভিসন্ধি চরিতার্থ করিবার জন্য কোনো তৃতীয় পক্ষ সক্রিয় নাই, সেই কথা নিশ্চিত করিয়া বলা যায় না। আন্তর্জাতিক সমাজের চোখে বাংলাদেশের রাজনৈতিক নেতৃত্ব এবং রাজনৈতিক সমাজকে ব্যর্থ ও অপরিণামদর্শী হিসাবে চিহ্নিত করিবার জন্যও এইরূপ জঘন্য কাণ্ড ঘটানো হইয়া থাকিতে পারে বলিয়া মনে করেন পর্যবেক্ষক মহলের অনেকেই। আবার প্রতিপক্ষকে নিশ্চিহ্ন করিয়া দিবার নীলনকশার অংশ হিসাবেও সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের উপর এই অন্যায় আঘাত হানা হইয়া থাকিতে পারে। যাহারা যেই উদ্দেশ্যেই এইরূপ ন্যক্কারজনক কর্মকাণ্ড সংঘটিত করিয়া থাকুক না কেন, আমরা তাহাদের ধিক্কার জানাই। এই পরিস্থিতি দুর্ভাগ্যজনক।

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন