আলোকপাত

প্রজন্ম-কথা

আপডেট : ০৫ মার্চ ২০১৩, ২১:২৪
পূর্বেই বলেছি একটি প্রজন্মকে তৈরি করা মানে একটি শিশুকে গড়ে তোলা। সেই শিশুকে আমরা কীভাবে গড়ে তুলছি— তার পিঠে পাঠ্যবইয়ের বাইরে একবোঝা উচ্ছিষ্ট বই চাপিয়ে তাকে কুঁজো করে রেখেছি। এই উচ্ছিষ্ট বইগুলোর না কোন সঠিক প্রকাশনা প্রতিষ্ঠান আছে, না আছে কোন সঠিক লেখক, না আছে কোন দেখভালের লোক। অথচ এই বইগুলো শুধু কমিশনের উপর কমিশন দিতে দিতে অবুঝ শিক্ষার্থীদের অভিভাবকের ঘাড়ে সকল কমিশনের বোঝা চাপে। কখনো চল্লিশ টাকা মূল্যমানের একটি বই বাধ্যতামূলক কিনতে হয় একশত আশি টাকা দিয়ে। আর কুঁজো হওয়া শিশুটিকে মাথা তুলে দাঁড়াতে তার যে শক্তি ক্ষয় হয় সেটা সে কোনদিন ফিরে পায় না। এই বাজে বইগুলো যখন দেশের নামকরা বিদ্যালয়গুলোতে পড়ানো হয় তখন শিশুর যে মানসিক ও শারীরিক কষ্ট তা দেখার কেউ নেই। এই শিশুটি যদি শুধুমাত্র তার সীমাবদ্ধ পাঠ্যবইয়ে নিবিষ্ট থাকত তাহলে সে খেলাধুলার সময় পেত। দেশের বিশিষ্ট ছড়াকার-কবি-সাহিত্যিকের ছড়া, কবিতা, গল্প, উপন্যাস পড়ে অবসর সময় কাটাতে পারত। তাদের জ্ঞানের পরিধি আরো বিস্তৃত হতো। একবছর পর মাসব্যাপী অমর একুশের যে বইমেলা হয়ে গেল সেখানে ক’জন শিশু তার পছন্দমতো বই কিনেছে বা বাবা-মায়ের সাথে বই কিনতে মেলায় গিয়েছে (?) — ইচ্ছে থাকা সত্ত্বেও তারা অনেকেই সময়ের অভাবে মেলায় যেতে পারেনি। একটি শিশুর জন্য সময়ের ভাবনা করাটা সত্যিই কী নির্মম! কখন তার অংকের টিচার, কখন তার ইংরেজির টিচার এসব নিয়েই তাদেরকে অস্থির থাকতে হয়। পাঠ্যবইয়ের বাইরে বাড়তি যে কমিশন বাণিজ্য বিদ্যালয়গুলোতে দেখা যায় সে-সব কি কর্তৃপক্ষের দৃষ্টিগোচর হয় না? বিদ্যালয়ের অনেক শিক্ষককে বলতে শুনেছি বোর্ডের বই-ই শিশুদেরকে শিক্ষাদানের জন্য যথেষ্ট। তারপরও কোমলমতি শিশুদের নিয়ে কেন এই বাণিজ্য? এখানে বিদ্যালয়-প্রধানের কী ভূমিকা থাকতে পারে, জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ড ঢাকা বাংলাদেশের কী ভূমিকা রাখা উচিত, শিক্ষা বোর্ডের ভূমিকা কী হতে পারে, শিক্ষামন্ত্রীই বা এ-ব্যাপারে কতটুকু ভূমিকা রাখার অধিকার সংরক্ষণ করেন — আমার কিছুই জানা নেই। কেন জানি না তাও বুঝি না। শিশুদের প্রতি এত দুর্বলতা কেন? সেই প্রশ্নই শুধু বার বার ঘুরে-ফিরে মাথাটাকে অস্থির করে তোলে। শিশুদেরকে গড়ে তোলার জন্য রোকনুজ্জামান খান (দাদাভাই) দৈনিক ইত্তেফাকের কচি-কাঁচার আসরকে কেন্দ্র করে কচি-কাঁচার মেলা গঠন করে এক ঐতিহাসিক দৃষ্টান্ত স্থাপন করে গেছেন। তদ্রূপ দৈনিক সংবাদের খেলাঘর পাতাকে কেন্দ্র করে হাবিবুর রহমান (ভাইয়া), দৈনিক আজাদের মুকুলের মাহফিলকে কেন্দ্র করে মুকুল ফৌজ গঠন করে মুহাম্মদ মোদাব্বের (বাগবান), দৈনিক বাংলার সাত ভাই চম্পাকে কেন্দ্র করে আফলাতুন, বাংলাদেশ বেতারের অধীনে প্রকাশিত মাসিক শাপলা শালুককে কেন্দ্র করে ফজল-এ-খোদা (মিতাভাই), চাঁদের হাটকে কেন্দ্র করে রফিকুল হক (দাদুভাই), মাসিক টাপুর টুপুরকে কেন্দ্র করে এখ্লাসউদ্দিন আহ্মদ, হৈ-হুল্লোড়কে কেন্দ্র করে ফয়েজ আহ্মদ উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত রেখে গেছেন। এখনও কিছু কিছু দৈনিকের শিশু-কিশোর পাতাগুলো ভূমিকা রেখে চলছে কিন্তু অধিকাংশ পাতায়ই দায়সারা ভাব লক্ষণীয়। সুতরাং আধুনিক যুগের সাথে তাল মিলিয়ে শিশু গড়ার দায়িত্ব নেই বললেই চলে। আমরা যখন শিশু ছিলাম শিশুদের পাতাগুলোর প্রতি আমাদের সযত্ন দৃষ্টি থাকত। প্রকাশিত কবিতা, ছড়া, গল্প বা উপদেশমূলক লেখালেখি পড়ে মুগ্ধ হতাম কিন্তু আজকালকার শিশুদের মধ্যে এই প্রবণতা অনেকটাই হ্রাস পেয়েছে। নতুন নতুন প্রযুক্তির সাথে তারা পরিচিত হচ্ছে বটে কিন্তু তাদের মধ্যে মেধার ঘাটতি রয়ে যাওয়ার আশঙ্কা উড়িয়ে দেয়া যায় না। এই তথ্য-প্রযুক্তির যুগে তারা নিজেরাই যখন জেনে যায় বিদ্যালয়ের প্রধান এবং বিদ্যালয় কমিটির যোগসাজশে কমিশন বাণিজ্য চলে তখন তাদের পরিষ্কার, স্বচ্ছ ও সুকোমল মগজে দুর্নীতি বিষয়টা আপনা-আপনি ঢুকে পড়ে। যখন তারা জানতে পারে তাদের একজন শিক্ষক কত টাকা ঘুষ দিয়ে শিক্ষকতার চাকরিটি পেয়েছেন তখন তাদের মাথায় ঘুষ-ঘুষ খেলা করে বলেই প্রণিধানযোগ্য। একটি শিশুর মানসিক বিকাশে সরকার, বিদ্যালয় ও পরিবারের ভূমিকা অতীব গুরুত্বপূর্ণ। সুতরাং পরবর্তী প্রজন্মকে গড়তে আমরা আরো সচেষ্ট হই যেন তারা সততা ও আদর্শ নিয়ে গড়ে ওঠে। কারণ তারাই একদিন এই রাষ্ট্র পরিচালনা করবে, বিশ্ব পরিচালনা করবে, তারাই একদিন নতুন শিশুকে গড়ে তুলবে। বইমেলা থেকে আমি যখন শিশু-কিশোর উপযোগী ছড়া, কবিতা, গল্পের বই কিনে আনি, আমার বিশ্ববিদ্যালয় পড়ুয়া সন্তান দু’টি হেসে খই ফোটায়। ওরা প্রশ্ন করে—তোমরাই লেখ, তোমরাই পড়, নাকি শিশুরাও পড়ে? এত সহজ প্রশ্নের জবাব দুঃসাধ্য, তবুও এই প্রজন্মটি যে বঙ্গবন্ধুকে জানে, বায়ান্নকে জানে, একাত্তরকে জানে, নব্বইকে জানে— এই প্রজন্মটি যে যুদ্ধাপরাধীদের অপরাধ সম্পর্কে জানে তাতে গর্বিত হই। বুক ফুলে ওঠে। ওরাই পারবে বাংলাদেশকে বিশ্বের মাঝে সমুন্নত রাখতে। লেখক : কবি ও শিশু-সাহিত্যিক

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন