প্রবৃদ্ধি অর্জনের প্রধান অন্তরায় ক্রমবর্ধমান জনসংখ্যা ও সুশাসন

আপডেট : ০৫ মার্চ ২০১৩, ২১:২৭
বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় সমস্যা এর বিশাল জনগোষ্ঠী, যা তার ভৌগোলিক আয়তন ও প্রাকৃতিক সম্পদের তুলনায় কল্পনাতীত বিশাল। পাশাপাশি দেশের প্রতিটি সেক্টরে সুশাসনের অভাব। বর্তমানে ক্রমবর্ধমান জনসংখ্যা বৃদ্ধির ফলে সরকারের গৃহীত নানামুখী উন্নয়নমূলক কর্মকাণ্ড বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। একইসঙ্গে পরিবেশের উপর মারাত্মক প্রভাব ফেলছে। অত্যধিক জনসংখ্যা বৃদ্ধির ফলে মানুষের মৌলিক চাহিদা অন্ন, বস্ত্র, শিক্ষা, চিকিত্সা, বাসস্থানসহ রাষ্ট্রীয় ও সামাজিক সকল প্রকার সুযোগ-সুবিধা থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। ফলে সমাজে বাড়ছে দারিদ্র্য, বেকারত্ব, বাসস্থান সংকট, খাদ্য সমস্যা, অপরাধ, সন্ত্রাস, দুর্নীতি, অপুষ্টি, ভিক্ষাবৃত্তি, মাদকাসক্তি, নিরাপত্তাহীনতাসহ আরো নানাবিধ সমস্যা। মূলত মাত্রাতিরিক্ত জনসংখ্যা হচ্ছে অনেক জটিল সমস্যা কারণ যা জীবনযাত্রার মান কমিয়ে দেয়। জনসংখ্যার উচ্চবৃদ্ধি উন্নয়নশীল দেশের সীমিত সম্পদের উপর চাপ সৃষ্টি করছে এবং বিভিন্ন সেক্টরে ভয়াবহ বিপর্যয় ডেকে আনছে। বর্তমানে ক্রমবর্ধমান জনসংখ্যা, দুর্বল সুশাসন ও দুর্নীতি ধনী-গরীব নির্বিশেষে দেশের সকল নাগরিকের জীবনে প্রত্যক্ষভাবে ক্ষতিকর প্রভাব ফেলছে। এখন এদেশের কম-বেশি অধিকাংশ মানুষ এই দুর্নীতির ভুক্তভোগী। আমাদের সকলেরই জানা- দুর্নীতির প্রভাবে এদেশের বেশির ভাগ উন্নয়ন ব্যাহত হচ্ছে। দেশে দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি ও সুশাসনের অভাবে বিভিন্ন সেক্টরে দুর্নীতি আমাদের জাতীয় প্রবৃদ্ধি অর্জনে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। এ অবস্থার অবসান না করতে দেশে ঊর্ধ্বমুখী প্রবৃদ্ধি অর্জন তথা ২০২১ সালের মধ্যে দেশকে মধ্যম আয়ের দেশে পরিণত করার কথাও কল্পনায় পরিণত হবে। বর্তমানে চরম দরিদ্রতা, আইন-শৃংখলার অবনতি, অব্যাহত সন্ত্রাস, চাঁদাবাজি, নিরাপত্তাহীনতা, সামাজিক অবক্ষয়, সম্পদের অপচয়, আত্মসাত্, অপব্যবহার ইত্যাদির মূলে দুর্নীতির প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ প্রভাব একেবারে স্পষ্ট। দেশের জাতীয় উন্নয়ন ও জনগণের মধ্যে চরম বৈষম্য পাশাপাশি জাতীয় প্রবৃদ্ধি আনয়নের স্বার্থে সরকার তথা এই দেশবাসীকে দুর্নীতি রোধে কার্যকরী ভূমিকা রাখতে হবে। তাদেরকে নিজ নিজ অবস্থান থেকে শপথ নিতে হবে- আমি নিজে দুর্নীতির কাজ করবো না, অন্য কেউকে করতে দেব না। এই শপথ কার্যকর করার পাশাপাশি নিয়ন্ত্রণবিহীন স্বাধীন দুর্নীতি দমন কমিশনকে স্বাধীনভাবে কাজ করার ক্ষমতা অর্পণ, প্রশাসনিক সংস্কার, দলীয় নিয়োগ বন্ধকরণ, প্রতিষ্ঠানের ভিতরে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিতকরণ, ন্যায়পাল কার্যকরকরণ, স্বাধীন আইন ও বিচার বিভাগের উপর থেকে সকল প্রকার প্রভাব দূরীকরণ, দ্রুত বিচারকার্য সুসম্পন্ন ও শাস্তির বিধান নিশ্চিতকরণ, সুশীল সমাজকে কার্যকরকরণ, স্থানীয় সরকারকে ক্ষমতায়ন, কেন্দ ীয় ক্ষমতা বিকেন্দ ীকরণ, প্রশাসনিক ট্রাইব্যুনালকে শক্তিশালীকরণ, ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ, গণমাধ্যমগুলোকে স্বাধীনভাবে মতামত প্রকাশের ক্ষমতা অর্পণ এবং প্রভাবমুক্তকরণ, রাজনৈতিক নেতাদের কথায় না কাজে তাদের মানসিকতার পরিবর্তন করে নির্বাচনের প্রাক্কালে জনগণের সামনে দেয়া ওয়াদা পালনসহ স্ব-স্ব প্রতিষ্ঠান থেকে দুর্নীতি রোধে সামাজিক আন্দোলন গড়ে তোলা সম্ভব হলে দুর্নীতি কিছুটা হলেও রোধ করা সম্ভব হবে। পাশাপাশি দুর্নীতি থেকে দেশ ও জাতিকে রক্ষা করার জন্য প্রয়োজন রাজনৈতিক নেতাদের সদিচ্ছা, সততা, স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতা দ্রুত নিশ্চিতকরণ জরুরি। দেশের প্রতিটি কর্মকর্তা-কর্মচারী যদি সততা ও নিষ্ঠার সাথে নিজ নিজ দায়িত্ব পালন করেন, এইক্ষেত্রে প্রতিটি কর্মকর্তা-কর্মচারীর বেতন কাঠামো তাদের প্রয়োজনের সাথে সামঞ্জস্য রেখে যদি পরিবর্তন করা সম্ভব হয় এবং দেশের সরকার প্রধান থেকে শুরু করে প্রতিটি জনগণকে তাদের অর্জিত সম্পদের হিসাব প্রকাশ ও তাদের ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের নিকট জবাবদিহি করানো সম্ভব হয় এবং এই কাজে যদি সবার উত্সাহ বাড়ানো যায় তবে দুর্নীতির এই ভয়াবহতা থেকে দেশবাসী কিছুটা হলেও রক্ষা পেতে পারে। এর ধারাবাহিকতায় সুশাসন প্রতিষ্ঠার পথ প্রশস্ত ও সুগম হতে পারে। কোন আইন প্রয়োগ করে বা চাপ প্রয়োগ করে দেশ থেকে দুর্নীতি রোধ করা সম্ভব হবে না যদি না জনগণ নিজ নিজ জায়গা থেকে এটা প্রতিরোধে ঐক্যবদ্ধ আন্দোলন গড়ে তুলতে না পারেন। এজন্য এখন থেকেই সরকার, রাজনৈতিক ব্যক্তিবর্গ, সর্বস্তরের জনগণকে দেশের জাতীয় প্রবৃদ্ধি আনয়নে দুর্নীতিকে না বলার প্রক্রিয়া শুরু করতে হবে। আর এটিই হবে জাতির জন্য সফল পদক্ষেপ। এজন্য শুধু দরকার সকলের সদিচ্ছা। দেশকে মধ্যম আয়ের দেশ হিসেবে প্রতিষ্ঠাই হোক আমাদের সকলের ব্রত। লেখক: লাইব্রেরিয়ান বিজিএমইএ ইউনিভার্সিটি অব ফ্যাশন এন্ড টেকনোলজি (বিইউএফটি) [email protected]