আজ ঐতিহাসিক ৭ই মার্চ। স্বজাতি ও স্বাধিকারবোধে উদ্দীপ্ত বাঙালির ইতিহাসের এক অনন্যসাধারণ দিন। জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান একাত্তরের এইদিনে যে ঐতিহাসিক ভাষণ দিয়াছিলেন আজও উহার তাত্পর্য জাতীয় জীবনে গভীরভাবে অনুভূত হয়। সাতচল্লিশে দেশ বিভক্তির পর দুই যুগব্যাপী সংগ্রাম-সাধনার মধ্য দিয়া তদানীন্তন পূর্ব পাকিস্তানের বাঙালিরা মুক্তির যে মোহনায় উপনীত হইয়াছিল উহাকে চূড়ান্ত লক্ষ্যে পৌঁছাইয়া দিতে তাই ৭ই মার্চের ঐ ভাষণের রহিয়াছে অবিস্মরণীয় ভূমিকা। পাকিস্তানের সংখ্যাগুরু দলের নেতা হিসাবে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান তাঁহার ঐতিহাসিক ভাষণের মাধ্যমে একাত্তরের এইদিনে এতদঞ্চলের মুক্তিপাগল মানুষের মনে প্রত্যয়ের যে বীজ বপন করিয়া দিয়াছিলেন বিশ্বের ইতিহাসেই উহা এক বিরল ঘটনা।
সাতচল্লিশের দেশ বিভক্তির পর হইতেই তদানীন্তন পাকিস্তানে সংখ্যাগুরু এলাকা বলিয়া পরিচিত ও প্রধানত বাঙালি অধ্যুষিত এই অঞ্চলের উপর যে রাজনৈতিক আধিপত্য, সাংস্কৃতিক আগ্রাসন এবং অর্থনৈতিক বৈষম্য চাপাইয়া দেওয়া হইয়াছিল উহার বিরুদ্ধে শহীদ সোহরাওয়ার্দী, শেরেবাংলা ফজলুল হক, মাওলানা ভাসানী, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান প্রমুখ নেতার নিরবচ্ছিন্ন সংগ্রামী ভূমিকা আজও জাজ্বল্যমান হইয়া রহিয়াছে।
১৯৭০-এর ডিসেম্বরে অনুষ্ঠিত পাকিস্তানের ইতিহাসের একমাত্র সাধারণ নির্বাচনে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বাধীন আওয়ামী লীগ জাতীয় ও প্রাদেশিক পরিষদে নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা লাভ করা সত্ত্বেও তাঁহাকে ক্ষমতা হইতে নিবৃত্ত রাখিতে কুচক্রী মহলের মধ্যে ষড়যন্ত্র আর চক্রান্ত শুরু হয়। গোটা পূর্ব পাকিস্তান তখন অগ্নিগর্ভ ভিসুভিয়াসের রূপ ধারণ করিয়াছে। জনতাসাগরে তখন অশান্ত ঊর্মিমালার গর্জন, আকাশ-বাতাস প্রকম্পিত হইতেছে জনতার প্রচণ্ড নাদে। সার্বিক মুক্তির আকাঙ্ক্ষায় উদ্বেল জনতাশক্তি জাগিয়া উঠিয়াছে বঙ্গবন্ধুর জাদুকরী নেতৃত্বের প্রবল টানে। মানুষ মুক্তি চায়, সার্বিক মুক্তি। কেহই আর বদ্ধঘরে আবদ্ধ থাকিবে না, মুক্ত বিহঙ্গের ন্যায় আকাশে ডানা মেলিয়া ধরিবে সবাই। যৌবন জলতরঙ্গ আর কোন বাধাই মানিবে না। এই যখন অবস্থা তখন নির্যাতিত দেশের কাণ্ডারী হিসাবে বঙ্গবন্ধু জনতরীর হাল ধরিলেন। বাংলায় তখন যেন নূহের প্লাবন ডাকিয়াছে। ‘সামাল-সামাল’ ডাকে চারিদিক মুখরিত। শক্ত হাতে হাল ধরিয়াছেন জনগণের নয়নমণি মুজিব। ‘মুজিব বাইয়া যাওরে, নির্যাতিত দেশের মাঝে জনগণের নাও’- এই দাবি আর আহ্বান তখন সকলের কণ্ঠে ধ্বনিত- প্রতিধ্বনিত হইতেছে।
একটি জাতির জীবনে এমন মাহেন্দ্রক্ষণ, এমন ইতিহাস সৃষ্টিকারী বা যুগান্তকারী ঘটনা কদাচিত্ দেখা দেয়! একাত্তরের ৭ই মার্চে আমরা এমন এক গৌরবময় সোপানে গিয়া পা রাখিয়াছিলাম যাহা পরবর্তীতে আমাদের জাতিসত্তাকে মহিমান্বিত করিয়াছে। সংগ্রামে-আন্দোলনে-দেশপ্রেমে সারাদেশ তখন বঙ্গবন্ধু নামক এক পুরোধা-পুরুষের মধ্য দিয়া মূর্ত হইয়া উঠিয়াছে। জাগরণী মন্ত্র কণ্ঠে ধারণ করিয়া সেই অমৃতস্যপুত্র যখন সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের মঞ্চে আসিয়া বজ্র নির্ঘোষে ঘোষণা দিলেন ‘এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম’ তখন বাংলার মাটি ও বাংলার মানুষ একাকার হইয়া লক্ষ কোটি কামানের মতো গর্জন করিয়া উঠিল। বঙ্গবন্ধুর সেদিনের ভাষণ ছিল পাকিস্তানের বৈষম্যবাদী রাজনীতির সারসংক্ষেপ আর ভবিষ্যত্ কর্মপন্থার দিকনির্দেশনা।
কি ছিল বঙ্গবন্ধুর সে ভাষণে যাহা কিনা ইন্দ্রজালের মতো সকলকে মোহাবিষ্ট করিয়াছিল? আজ ঐ নিকট-অতীতের দিকে দৃষ্টিক্ষেপ করিলে কাহারও বুঝিতে কষ্ট হয় না যে, ঐ অসাধারণ ভাষণের মধ্য দিয়া বঙ্গবন্ধু যে শিক্ষাটি আমাদিগকে দিতে চাহিয়াছিলেন উহা হইল স্বশাসনের ও আত্মনিয়ন্ত্রণাধিকারের শিক্ষা। আমরা যোগ্যতার সহিত নিজেদেরকে শাসন করিব, দেশে গণতন্ত্র ও সামাজিক ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা করির—তিনি ঐ ভাষণের মধ্য দিয়া জনগণের মনে এই আকাঙ্ক্ষাকে আরও দৃঢ়ভাবে প্রোথিত করিয়াছিলেন। অবাধ, সুষ্ঠু ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচনের মাধ্যমে এবং যোগ্য ব্যক্তিকে যোগ্য স্থানে নিয়োগ প্রদান করিয়া তথা সকলের মৌলিক ও মানবিক অধিকার প্রতিষ্ঠা করিয়া একটি সুশৃংখল জাতি বিনির্মাণই ছিল বঙ্গবন্ধুর আরাধ্য। তিনি মানুষকে অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদী হইতে, সাহসী হইতে এবং সকল প্রকার ভ্রূকুটিকে অগ্রাহ্য করিয়া মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠা এবং সত্য ও ন্যায় প্রতিষ্ঠায় প্রয়োজনে জীবন বিসর্জন দিতে শিখাইয়াছেন। তিনি মানুষকে সকল প্রকার অন্ধত্ব, বন্ধ্যাত্ব ও কুসংস্কার হইতে মুক্ত করিতে চাহিয়াছেন। যাহা দেশ ও দেশবাসীর জন্য হিতকর, মঙ্গলজনক সেই কর্মধারা সৃষ্টিতে মানুষকে উজ্জীবিত করিয়াছেন তিনি তাঁহার আজীবনের সংগ্রামী ভূমিকার মধ্য দিয়া। তিনি আমাদেরকে শিখাইয়াছেন যে, যাহা কিছু মানুষের জন্য অকল্যাণকর তাহাই কুসংস্কার। সুতরাং, ঐ কুসংস্কারের প্রাচীর ভাঙ্গিয়া দিতে হইবে। আত্মবিশ্বাস, প্রত্যয়বোধ ও দেশপ্রেমে উদ্দীপ্ত হইয়া সেই চেতনায় সকলকে জাগিয়া উঠিতে হইবে, যে চেতনা মানুষকে সত্য, ন্যায় এবং কল্যাণের পথে পরিচালিত করে। ৭ই মার্চের ঐতিহাসিক ভাষণের তাত্পর্য তাই আবাহন নিয়ত। ঐ ভাষণের মধ্যে আমাদের জন্য মুক্তির পথের দিশা রহিয়াছে। আজ এত বত্সর পরও তাই উহার সামান্যতম গুরুত্ব হারাইয়া যায় নাই। আজ এই কথা নির্দ্বিধায় বলা যায় যে, আমরা সকলে অন্তরে ঐ ভাষণের তাত্পর্য ও গভীরতা যত অনুভব এবং ঐ ভাষণে নিহিত সত্য শিক্ষাকে যত বেশি গভীরে অনুধাবন করিতে শিখিব ততই আমাদের মুক্তির পথ সহজতর হইবে।
