দেশের ব্যবসায়ী সমপ্রদায় জিম্মি হইয়া পড়িয়াছেন। তাহারা এখন বিপদে নিপতিত। কি রাজনৈতিক, কি অর্থনৈতিক- সবদিক হইতেই তাহারা এমন এক পরিস্থিতি অতিক্রম করিতেছেন যাহা সামগ্রিক অর্থনীতিকে ক্ষতিগ্রস্ত করিতেছে। নূতন বিনিয়োগ নাই বলিলেই চলে। বিনিয়োগ হইবে কিভাবে? দেশের বিদ্যমান পরিস্থিতি নূতন বিনিয়োগ হইবার অনুকূলে নাই। এই পরিস্থিতি শুধু রাজনৈতিক পরিস্থিতির কারণেই নহে, কিছু আর্থিক নীতি গ্রহণ করা হইয়াছে, যাহা বিনিয়োগকে তলানিতে ঠেকাইতে যথেষ্ট। অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিতও সামপ্রতিক সময়ে বিনিয়োগ মন্দার কথা স্বীকার করিয়াছেন। গত বুধবার ব্যবসায়ী-শিল্পপতিদের শীর্ষ সংগঠন এফবিসিসিআইর নেতারাও অর্থমন্ত্রীকে জানাইয়াছেন যে, পরিস্থিতি খুবই খারাপ দিকে যাইতেছে। ক্ষতিগ্রস্ত অর্থনীতিকে টানিয়া তুলিবার জন্য তাহারা অর্থমন্ত্রীর দ্বারস্থ হইয়াছেন। তাহারা বলিয়াছেন, প্রয়োজনে সরকার ও বিরোধীদলীয় নেত্রীকে একসঙ্গে বসাইতে হইবে। যাহাতে আমরা সামনের দিকে আগাইয়া যাইতে পারি।
বিদ্যমান বাস্তবতার আলোকেই ব্যবসায়ীরা তাহাদের উদ্বেগের কথা জানাইয়াছেন। তাহারা দেখিতে পাইতেছেন যে, আর্থ-সামাজিক ও রাজনৈতিক ব্যবস্থাপনা সঠিক পথে আর নেই। নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে যাহারাই যেখানে বসিয়া আছেন, তাহারা বোধ হয় আর সামাল দিতে পারিতেছেন না। কিন্তুু তাহারা সরিয়াও যাইতেছেন না। যাহা সমস্যাকে আরো প্রকট করিয়া তুলিয়াছে। ব্যবসায়ী-শিল্পউদ্যোক্তাদের মতে, সামপ্রতিক সময়ে নেয়া বেশকিছু নীতি একেবারেই বাস্তবতাবিবর্জিত হইয়াছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংক ঘোষিত মুদ্রানীতিও বাস্তবতার আলোকে করা হয় নাই। মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণের নামে মুদ্রানীতি অতিমাত্রায় সংকুচিত করিবার ফলে শিল্পখাতে ঋণ প্রবাহ কমিয়া গিয়াছে। উদ্যোক্তারা এখন আর ব্যাংক হইতে কাঙ্ক্ষিত মাত্রায় ঋণ সুবিধা পাইতেছেন না। আবার হলমার্ক কেলেংকারির পর ব্যাংকগুলোও কঠোর অবস্থান নিয়াছে। ব্যাংক-গ্রাহক সম্পর্কের বিষয়টিও এখন গুরুত্ব কম পাইতেছে। ইহাতে করিয়া ভাল গ্রাহকরা ভোগান্তিতে পড়িয়াছেন। অথচ যাহাদের অজ্ঞতা কিংবা অসততা কিংবা দক্ষতার অভাব বা ইচ্ছাকৃত জালিয়াতির ফল হইতেছে হলমার্ক কেলেংকারি, তাহাদের জন্য অন্যরা কেন ভোগান্তি পোহাইবে- সেই প্রশ্নও অবান্তর নহে।
উপরন্তুু ঋণ নিয়া যাহারা ব্যবসাপাতি করিতেছেন, তাহারাও ক্রমেই খেলাপি হইবার পথে। খেলাপি ঋণের সংজ্ঞায় এমন কিছু পরিবর্তন আনা হইয়াছে যাহা শিল্প ও ব্যবসা-বান্ধব নহে। ব্যাংকাররাও বলিয়া থাকেন, নূতন নিয়মের ফলে খেলাপি ঋণের পরিমাণ বাড়িয়া যাইবে। গত এক বত্সরে খেলাপি ঋণের পরিমাণ ১৮ হাজার কোটি টাকা হইতে বাড়িয়া ৪২ হাজার কোটি টাকায় দাঁড়াইয়াছে। আগামীতে ইহা আরো বাড়িয়া যাইবে। কেননা, বাস্তবতার সঙ্গে এই নীতির কোন মিল নাই। এমনকি স্টেকহোল্ডারদের সঙ্গে আলোচনা করয়ািও এমন নীতি করা হয় নাই। উদাহরণস্বরূপ বলা যাইতে পারে যে, ব্যাংক হইতে এলসি খোলার পর বন্দরে পণ্য পৌঁছা এবং তাহা খালাস করিয়া আনা সময়সাপেক্ষ ব্যাপার। সেই পণ্য বাজারে বিক্রি করা পর্যন্ত ষাট দিন সময় যথেষ্ট নহে। অথচ এই ক্ষেত্রে ঋণের হিসাবে ষাট দিন হলেই তাহা স্পেশাল ম্যানসন একাউন্ট (এসএমএ) হইয়া যাইবে। ইহা কি যৌক্তিক হইতে পারে?
ব্যবসায়ীরা বলিয়া থাকেন, তাহা হইলে এমন নীতি কাহাদের স্বার্থে? ইহার পিছনে অন্য কোন উদ্দেশ্য রহিয়াছে কি না? ইহা কি দেশের শিল্পকারখানা বন্ধ করিবার কোন সুদূরপ্রসারী ষড়যন্ত্র? নাকি ব্যবস্থাপনা দুর্বলতা কিংবা নীতি প্রণয়নে দক্ষতার অভাবে এমনটি হইতেছে? ইহাও স্পষ্ট হওয়া প্রয়োজন। না হইলে ব্যবসা-বাণিজ্য আরো স্থবির হইয়া যাইবে। খেলাপি ঋণের পরিমাণও না বাড়িয়া উপায় থাকিবে না। কারণ, রাজনৈতিক অস্থিরতাও এখন যোগ হইয়াছে। অথচ পিছনে ফিরিয়া তাকাইলে দেখিতে পাওয়া যাইবে যে, বিশ্বমন্দার মধ্যেও বাংলাদেশ খুব বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয় নাই। হয়তো আন্তর্জাতিক আর্থিক ক্ষেত্রে আমাদের সম্পৃক্ততা কম বলিয়াই। কিন্তু বর্তমানে অভ্যন্তরীণ অস্থিরতা অর্থনীতিকে গিলিয়া খাইতেছে। এমনটি হইলে জাতীয় প্রবৃদ্ধি অর্জনও বাধাগ্রস্ত হইবে- ইহাতে কোন সন্দেহ নাই। তাই দেশের বৃহত্তর স্বার্থে অর্থনীতিকে আগাইয়া লইতে বিদ্যমান নীতি সংশোধন করিয়া সঠিক নীতি গ্রহণ করিতে হইবে। আর যদি কাহারো অদক্ষতার কারণে এমনটি হইয়া থাকে, তাহাদেরও আত্মজিজ্ঞাসার আলোকে নিজ হইতেই সরিয়া যাওয়া হইবে দূরদর্শী সিদ্ধান্ত, তাহা বিবেকবান মাত্রই মানিয়া লইবেন। কেননা, কাহারো অযোগ্যতা-অদক্ষতার দায়ভার জাতির কাঁধে চাপাইয়া দেওয়া সমীচীন হইবে না।
