আজ আন্তর্জাতিক নারী দিবস। দেশকালনির্বিশেষে নারীকে নিজের অধিকার প্রতিষ্ঠার জন্য দীর্ঘপথ পাড়ি দিতে হইয়াছে। সেই পথ যে মসৃণ ছিল না তাহা সর্বজনবিদিতই বলা চলে। দীর্ঘ সংগ্রামী পথপরিক্রমায় নারীর অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অর্জন হইল জাতিসংঘের উদ্যোগে বিশ্বব্যাপী একযোগে এই নারী দিবস উদযাপন। উল্লেখ্য যে, জাতিসংঘের আহ্বানে ১৯৭৫ সাল হইতে বিশ্বের দেশে দেশে দিবসটি উদযাপিত হইয়া আসিতেছে। পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্রে নারীর অবস্থান ও অগ্রযাত্রাকে অবারিত করা ইহার মূল লক্ষ্য হইলেও প্রতি বত্সরই সুনির্দিষ্ট একটি আহ্বান বা বক্তব্যকে সামনে রাখিয়া দিবসটি উদযাপন করা হয়। এইবারের নারী দিবসের মূল প্রতিপাদ্য হইল, ‘অঙ্গীকার অঙ্গীকারই: নারীর বিরুদ্ধে সহিংসতা প্রতিরোধের এখনই সময়’। এই প্রসঙ্গে ইউনেস্কোর মহাসচিব ইরিনা বোকোভার প্রদত্ত বক্তব্যটি এইখানে প্রণিধানযোগ্য। তিনি বলিয়াছেন যে, কোথায় আমরা দাঁড়াইয়া আছি এবং নারীর অধিকার বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে কী ধরনের প্রতিবন্ধকতা এখনও বলবত্ আছে তাহা নির্মোহভাবে বিচার-বিশ্লেষণ করিয়া দেখাও এই দিবসের অন্যতম লক্ষ্য। তাহার মতে, বিশ্বব্যাপী নারীর প্রতি ক্রমবর্ধমান সহিংসতাই হইল নারী অধিকারের সবচাইতে মারাত্মক লঙ্ঘন। স্থান ও কালভেদে সহিংসতার ধরন ভিন্ন হইলেও ফলাফল সর্বক্ষেত্রেই অভিন্ন। আর তাহা হইল নারীর মৌলিক অধিকার ও মানবিক মর্যাদার চরম বরখেলাপ।
বাংলাদেশের বাস্তবতাও ভিন্ন নহে। যদিও ইহা অনস্বীকার্য যে, স্বাধীনতা পরবর্তীকালে সামগ্রিকভাবে নারীর ক্ষমতায়নের ক্ষেত্রে বিস্ময়কর অগ্রগতি অর্জিত হইয়াছে আমাদের দেশে। শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও অর্থনৈতিক স্বাবলম্বিতাসহ সামাজিক উন্নয়নের প্রায় প্রতিটি সূচকেই ইহা প্রবলভাবে দৃশ্যমান। আমাদের অর্থনীতির অতি গুরুত্বপূর্ণ তিনটি ক্ষেত্র—কৃষি, ক্ষুদ্রঋণ ও পোশাক শিল্পে নারীর মুখ্য অবদানের বিষয়টি কাহারো অবিদিত নহে। কর্মসূত্রে বিদেশেও পাড়ি জমাইতেছেন অনেকে। উচ্চতর পদ ও প্রতিষ্ঠানেও নারীর পদচারণা দ্রুত বৃদ্ধি পাইতেছে। বিমান চালনা হইতে শুরু করিয়া ব্যবসা-বাণিজ্য পর্যন্ত কোনো ক্ষেত্রেই নারী আজ পিছাইয়া নাই। এমনকী রাজনীতির ক্ষেত্রেও নারীর অংশগ্রহণ অত্যন্ত আশাব্যঞ্জকই বলিতে হইবে। তাহা শুধু এই কারণে নহে যে, আমাদের প্রধানমন্ত্রী ও বিরোধী দলীয় নেত্রী নারী। বরং সিটি কর্পোরেশন, পৌরসভা, উপজেলা পরিষদ ও ইউনিয়ন পরিষদের মতো স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানগুলিতেও বিপুলসংখ্যক নারী শুধু যে নির্বাচিত হইয়া আসিয়াছেন তাহাই নহে, প্রশংসনীয় অবদানও রাখিতেছেন তাহাদের অনেকেই। সামাজিক, রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে নারীর এই ক্রমবর্ধমান ভূমিকার বিষয়টি আন্তর্জাতিকভাবেও স্বীকৃত ও প্রশংসিত হইয়া আসিতেছে দীর্ঘদিন যাবত্। কিন্তু পরিতাপের বিষয় হইল, বিশাল এই অর্জনও নারীকে সহিংসতা ও নিপীড়নের হাত হইতে রক্ষা করিতে পারে নাই। বরং ইহার মাত্রা যেন দিনদিন বাড়িয়াই চলিয়াছে। তাহা শুধু শারীরিক নির্যাতনেই সীমাবদ্ধ থাকিতেছে না, অনেক ক্ষেত্রে বিপন্ন করিয়া তুলিতেছে নারীর জীবনও। শক্ত আইন আছে। সরকারের সদিচ্ছারও কোনো অভাব নাই। কিন্তু সহিংসতার এই দানবকে থামানো যাইতেছে না কিছুতেই।
প্রসঙ্গত উল্লেখ্য যে, নারী দিবসকে সামনে রাখিয়া জাতিসংঘের পৃষ্ঠপোষকতায় নারী পর্বতারোহীদের একটি দল গত ৫ই মার্চ আফ্রিকার সর্বোচ্চ পর্বতশৃঙ্গ কিলিমানজারোতে পৌঁছিয়াছেন। সেইখানেই আজ তাহারা দিবসটি উদযাপন করিবেন। উদ্দেশ্য হইল, বিশ্ব নারী সমাজের নিকট এই বার্তাটি পোঁছাইয়া দেওয়া যে, স্বপ্নকে বাস্তবে রূপায়িত করার জন্য যদি আন্তরিকভাবে চেষ্টা চালানো হয় তাহা হইলে কোনোকিছুই অসম্ভব নহে। নারীর সম্মুখে বাধা অনেক। তবে শিক্ষা ও সচেতনতার মাধ্যমে সকল বাধাই অতিক্রম করা সম্ভব বলিয়া তাহারা মনে করেন। বার্তাটি নিঃসন্দেহে তাত্পর্যপূর্ণ। নিজের পথ যে নিজেকেই তৈরি করিয়া লইতে হয় আমাদের নারী আন্দোলনের পথিকৃত্ বেগম রোকেয়াই তাহার উজ্জ্বল উদাহরণ। পাশাপাশি, সামাজিক সচেতনতা এবং দায়িত্বশীলতারও কোনো বিকল্প নাই।
