‘নারী’ একটা ছোট্ট শব্দ কিন্তু এর তাত্পর্য অনেক। এক নারী জন্মের পর একই অঙ্গে ধারাবাহিকভাবে আসে তিন রূপ-কন্যা, জায়া, জননী। নারীর এই রূপ শাশ্বত, তুলনাহীন। বিধাতা মানুষকে সৃষ্টি করেছেন নারী ও পুরুষ রূপে। এদের বৈষম্য নির্ধারিত লিঙ্গভেদে। সৃষ্টির প্রথম থেকে নারীকে চিহ্নিত করা হয়েছে দুর্বল হিসেবে। বিধাতার দেয়া শারীরিক সমস্ত ঐশ্বর্য থাকা সত্ত্বেও পুরুষের তুলনায় নারী নিজেকে দুর্বল ভাবে। সাবলীলভাবে চলা ফেরায় বাধাপ্রাপ্ত হয়। কোন নারীর চলাফেরায় যদি সদর্প ভাব থাকে তবে তাকে নারীরাই বলে ‘একদম ছেলেদের মত স্বভাব মেয়েটার।’ নারী জাগরণের অগ্রদূত বেগম রোকেয়া বলেছেন, ‘মেয়েরা বুদ্ধির চর্চা করে না, অথচ প্রতিভা ব্যয় করে পাঁচশত রকমের আচার বানায়।’ বুদ্ধিভিত্তিক বা কিছুটা শারীরিক পরিশ্রম জড়িত কাজের ক্ষেত্রে মেয়েদের প্রায়ই বলতে শোনা যায়, আমরা এ কাজ করতে পারবো না, এটা কি আমাদের কাজ? এতে স্পষ্ট বোঝা যায়, সমাজ শুধু দুর্বল বলে না, মেয়েরাও নিজেদেরকে রেখেছে দুর্বল করে। অবশ্য এর ব্যতিক্রমও আছে। এ প্রসঙ্গে একটা পত্রিকার খবর, রাজশাহীতে একটা আম বাগান পাহারার দায়িত্বে ছিল একজন মহিলা, সে তার ছেলে-মেয়েকে বাগানেই ঘুমানোর জায়গা করে দেয়। সঙ্গে তার শাশুড়িকে রাখে বাচ্চাদের নিরাপত্তার কারণে। এক সাংবাদিক তাকে প্রশ্ন করে, আপনার একা ভয় লাগে না? মেয়েটি উল্টো সাংবাদিককে প্রশ্ন করে, ‘আপনার কয়টা হাত?’ উত্তর আসে দুটো। তখন সে বলে, আমারও দুইটা হাত, তাহলে ভয় লাগবে ক্যান? এই কথাটির মধ্যে লুকিয়ে আছে বিরাট প্রতিবাদ।
‘নারীবাদ’ শব্দটি এখন বহুল প্রচলিত। সাম্যবাদ, সমাজবাদ, পুঁজিবাদ, বর্ণবাদ, জাতীয়তাবাদ, ফ্যাসিবাদ ইত্যাদির অনুকরণে ফেমিনিজমের অনুবাদ করা হয় নারীবাদ। ইংরেজিতে শব্দটা আসে ল্যাটিন শব্দ ‘ফ্যামিনা’ থেকে, এর সাথে লাগানো হয়েছে ইজম। এই নারীবাদের প্রধান কথা নারীদের অধিকার আদায় করা। রোকেয়া তার বিভিন্ন লেখায় বোঝাতে চেয়েছেন পুরুষদের মতো নারীরাও সবকিছু করতে পারে। তার মানে রেল লাইনের মতো সমান্তরালভাবে চলতে পারে নারী-পুরুষ। যেহেতু নারী ও পুরুষ একটি এককের দুটি অংশ, সেহেতু একটি ছাড়া অপরটি অসম্পূর্ণ। সিমোন দ্য বুভেঁয়ার ও ভার্জিনিয়াউলফ নারীর অবস্থানকে যথাক্রমে ‘অপর’ এবং ‘আয়না’ হিসাবে আখ্যায়িত করেছেন।
১৯৫২ সালে জাতিসংঘ নারীদের সমান অধিকারের দাবি স্বীকার করে নেয় নিউইয়র্কের ঘোষণায়। এতে নারী ও পুরুষের অধিকার সমানভাবে স্বীকৃত হয়েছে। বেইজিং সম্মেলনে নারীদের ক্ষমতায়নের ঘোষণাও দেয়া হয়। তার পরেও সমান অধিকার কে কোথায় কতটুকু পেল তা জানবার বিষয়। সবচেয়ে বড় কথা নারীকে সমান অধিকারের সাথে সম্মান দিতে হবে,। সম্মান পাওয়ার সুযোগ করে দেবে নিজের ঘর। যে ঘরে স্বামী তার স্ত্রীকে সম্মান করে না। তাকে সম্মান করে না পরিবারের অন্য সদস্যরা। এখানে পরিবার থেকে পাওয়া অধিকার থেকে বঞ্চিত হয় নারী। পরিবার থেকে ছেলের পড়াটা চালিয়ে যায়। মেয়েকে আর পড়ানো হয় না। ছেলে ও মেয়েতে প্রভেদ সৃষ্টি করেছে সমাজ। সম্পদের ব্যাপারেও মেয়েরা পেছনে থাকে। ছেলের সমান সম্পদ মেয়েকে দেয়া হয় না। স্বামীর সম্পদেও স্ত্রীর ভাগ কম। এ সংসারেও ছেলে-মেয়েরা মায়ের চেয়ে সম্পত্তির ভাগ বেশি পায়। আসলে প্রাকৃতিক কারণে ছেলে ও মেয়েতে দৈহিক ভিন্নতা থাকতে পারে, কিন্তু অন্যান্য বৈষম্য সৃষ্টি করেছে সমাজ। এই ভ্রান্ত ধারণা থেকে বেরিয়ে আসতে হবে। আর এর জন্য শুধু নারী নয় এগিয়ে আসতে হবে পুরুষকেও। পরিবার ও সমাজের পূর্ণতার জন্য নারী-পুরুষ উভয়েরই প্রয়োজন আছে। তাই এ বছরের আন্তর্জাতিক নারী দিবসে আমরা সোচ্চার হই নারীর প্রতি সহিংসতা বন্ধে ও নারীর সম অধিকার প্রতিষ্ঠায়।
লেখক :কথাসাহিত্যিক ও প্রাবন্ধিক
