সাম্প্রতিক সময়ে বাংলাদেশের সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের ওপর যে সহিংস এবং অমানবিক হামলা চালানো হয়েছে এবং মন্দির-উপাসনালয় যেভাবে ভাঙচুর এবং পোড়ানো হয়েছে, তা একটি ‘গণতান্ত্রিক’ দাবিদার রাষ্ট্রের জন্য এবং ‘সভ্য’ দাবিদার সংখ্যাগুরু সম্প্রদায়ের জন্য অত্যন্ত লজ্জার এবং অসম্মানের। যুদ্ধাপরাধীদের বিচারকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠা শাহবাগ-কেন্দ্রিক গণআন্দোলন, দেশব্যাপী তার ক্রমবিস্তার, কাদের মোল্লাসহ যুদ্ধাপরাধীদের ফাঁসির দাবি, যুদ্ধাপরাধের অভিযোগে অভিযুক্ত সাঈদীর বিচার, আটটি অভিযোগ সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণিত হওয়ায় ফাঁসির রায়, প্রতিক্রিয়া হিসাবে দেশব্যাপী জামায়াত-শিবিরের সিরিয়াল সহিংসতা এবং তাণ্ডব—এগুলো হচ্ছে অতি-সাম্প্রতিক বাংলাদেশে সংঘটিত ঘটনার পরম্পরা। এর কোনটার সাথেই প্রত্যক্ষ কিংবা পরোক্ষভাবে এদেশের ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের সম্প্রদায়গত কোন ধরনের সম্পৃক্ততা নেই। অথচ জামায়াত-শিবিরের তাণ্ডবের সুযোগে একধরনের সন্ত্রাসীর অন্যতম প্রধান আক্রমণের লক্ষ্যবস্তু হয়েছে এদেশের ধর্মীয় সংখ্যালঘু সম্প্রদায়; বিশেষ করে হিন্দু সম্প্রদায়ের লোকজন। বিভিন্ন বাড়িতে হামলা, আগুন জ্বালিয়ে ঘরবাড়ি পুড়িয়ে দেয়া, হিন্দু ও বৌদ্ধ সম্প্রদায়ের ঘরবাড়ি লুটপাট, মন্দির ও পেগোডায় হামলা, প্রতিমা ভাংচুর ইত্যাদি হেন কোন ঘটনা নেই যা ঘটানো হয়নি। কিন্তু কেন? যদি যুক্তির খাতিরে ধরেই নিই, শাহবাগের গণআন্দোলনের জোয়ার লেগেছে সারা বাংলাদেশের প্রতিটি প্রান্তরে। বিভিন্ন বিভাগীয় শহরে, জেলায় জেলায় গড়ে উঠেছে গণজাগরণ মঞ্চ। সেখানে ধর্ম-বর্ণ-শ্রেণী-পেশা-বয়স-লিঙ্গ নির্বিশেষে মানুষ যোগদান করেছে এবং সংহতি জানিয়েছে। কিন্তু সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের লোকজন তো একা সংহতি প্রকাশ করেননি। তাই, প্রতিপক্ষকে আঘাত করাই যদি জামায়াত- শিবিরের সহিংসতা এবং আক্রমণের মূল লক্ষ্য হয়ে থাকে, সেখানে বেছে বেছে ধর্মীয় সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের লোকজন, বিশেষ করে হিন্দু সম্প্রদায়ের লোকজন কেন এ হিংস সন্ত্রাসীদের সহিংসতার শিকার হবেন? এ আক্রমণ যে অত্যন্ত সুপরিকল্পিত রাজনৈতিক সিদ্ধান্তের অংশ, সেটাকে সাম্প্রদায়িক রাজনীতি বলে। তাছাড়া যদি তর্কের খাতিরে ধরেই নিই গণজাগরণ মঞ্চে যুদ্ধাপরাধী-বিরোধী আন্দোলনের সামিল হওয়ার কারণে এ হামলা হয়; সেটাও যুক্তির মানদণ্ডে টেকে না। কেননা, দেশব্যাপী গণজাগরণ মঞ্চের সঙ্গে একাত্মতা প্রকাশ করবার বিষয়টি এদেশের আর দশজন নাগরিকের মতই সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের লোকদের ব্যক্তি-স্বাধীনতার বিষয় এবং ব্যক্তি-মানুষের নিজস্ব রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত। যার সাথে সম্প্রদায়গত সম্পৃক্ততার বা অসম্পৃক্ততার কোন সম্পর্ক নেই। অথচ বেছে বেছে আঘাত করা হয়েছে এদেশের সংখ্যালঘু সম্প্রদায়কে। এটা ‘সভ্য’ দাবিকারী এ সমাজের জন্য, সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির ক্যানভাসার তথাকথিত সুশীল সমাজের জন্য, ‘সেক্যুলার’ বলে গলা-ফাটানো রাষ্ট্রের জন্য এবং সর্বোপরি এদেশের সংখ্যাগুরু সম্প্রদায়ের জন্য অত্যন্ত পরিতাপের ব্যাপার।
সাঈদীর ফাঁসির রায় ঘোষণার পর থেকে সন্ত্রাসীরা সারাদেশে নজিরবিহীন তাণ্ডব চালাচ্ছে। কিন্তু দুর্ভাগ্যজক হচ্ছে, এ তাণ্ডবলীলার এক ধরনের সন্ত্রাসীরা চালাচ্ছে ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের ওপর হামলা। ইতোমধ্যে নোয়াখালী, চট্টগ্রাম, বাগেরহাট, সাতক্ষীরা, বরিশাল, গাজীপুর, গাইবান্ধা, নেত্রকোনা, ব্রাহ্মণবাড়িয়া, মৌলভীবাজার, কক্সবাজার, হবিগঞ্জ, মুন্সিগঞ্জ, চাঁপাইনবাবগঞ্জ, রংপুর ও জয়পুরহাটের বিভিন্ন এলাকায় বিভিন্ন হিন্দু বাড়িতে হামলা, অগ্নিসংযোগ, লুটপাট, মন্দির পোড়ানো এবং প্রতিমা ভাংচুর করা হয়েছে। মূলত ফেব্রুয়ারির ২৮ তারিখের পর থেকে এদেশের সংখ্যালঘু সম্প্রদায় এই সন্ত্রাসীদের তাণ্ডবের হিংস তায় একধরনের চরম নিরাপত্তাহীনতায় দিনাতিপাত করছে। রায় ঘোষণার পর পরই শিবিরের ক্যাডাররা চট্টগ্রামের বাঁশখালীর দক্ষিণ জলদি পাড়ায় ২০টি হিন্দু বাড়িতে হামলা করে অগ্নিসংযোগ করে, লুটপাট করে, ১৭ জনকে মারাত্মভাবে আহত করে এবং দুইজনকে হত্যা করে। ঐ একইদিনে নোয়াখালীর বেগমগঞ্জে দুইটি মন্দির ভাংচুর করে এবং বায়ান্নবাড়ি ও নাপিতবাড়ি এলাকার আটটি হিন্দু বাড়িতে হামলা চালিয়ে ব্যাপক ধ্বংসযজ্ঞ সংঘটিত করে নগদ টাকা, মূল্যবান জিনিসপত্র এবং স্বর্ণালংকার লুট করে নিয়ে যায় জামায়াত-শিবিরের ক্যাডাররা। কুমিল্লার বাহ্মণপাড়ায় একটি মন্দির ও প্রতিমা ভাংচুর করা হয়। লক্ষ্মীপুরের রায়পুরের হরিচাঁদ ও গুরুচাঁদ সেবা আশ্রম ও রাধা গোবিন্দ নামের দু’টি মন্দির পেট্রোল দিয়ে পুড়িয়ে দেয়া হয়। বাগেরহাটের মোরেলগঞ্জের দু’টি মন্দিরে হামলা করে মন্দিরের প্রতিমা ভাংচুর করা হয়। বরিশালের গৌরনদীতে গত ২ তারিখ ভোররাতে মন্দিরে হামলা করে অগ্নিসংযোগ এবং আটটি প্রতিমা ভাংচুর করা হয়। একই তারিখে গভীর রাতে নেত্রকোনার পূর্বধলায় সনাতন ধর্মাবলম্বীদের কয়েকটি মন্দিরে হামলা চালিয়ে বেশ কয়েকটি প্রতিমা ভাংচুর করা হয়। লক্ষ্মীপুরের রামগতিতে হিন্দু সম্প্রদায়ের কয়েকটি বাড়িতে হামলা চালিয়ে ঘরবাড়ি পুড়িয়ে দেয়া হয়। ব্রাহ্মণবাড়িয়ার কসবায় ধর্মীয় সংখ্যালঘুর ১১টি দোকানে হামলা করে অগ্নিসংযোগ ও লুটপাট করা হয়। হবিগঞ্জের বিভিন্ন স্থানে ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের ওপর একই রকম হামলা, অগ্নিসংযোগ, লুটপাট, মন্দির পোড়ানো এবং প্রতিমা ভাঙার ঘটনা ঘটেছে। কক্সবাজারের মহেশখালী এবং ফাঁসিয়াখালিতে মন্দিরে হামলা, ভাঙচুর এবং প্রায় ২০টি হিন্দু বাড়িতে লুটপাট করে সন্ত্রাসীরা। চাঁপাইনবাবগঞ্জের শিবগঞ্জে মন্দিরে অগ্নিসংযোগ করে জ্বালিয়ে দেয়া হয় আশেপাশের ঘরবাড়ি। জয়পুরহাটে কড়ই-কাদিপুর গ্রামের দুটি হিন্দু বাড়ি পেট্রোল ঢেলে জ্বালিয়ে দেয় সন্ত্রাসীরা। এরকম অসংখ্য হামলা, অগ্নিসংযোগ, লুটপাট, মন্দির পোড়ানো এবং প্রতিমা ভাংচুরের ঘটনা গোটা দেশব্যাপী গণহারে চলছে। কিন্তু কেন? এ জিজ্ঞাসার উত্তর জানাটা জরুরি।
এদেশে সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের ওপর হামলা এটাই প্রথম নয়। একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধের সময়ও সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের লোকদেরকেই তুলনামূলকভাবে বেশি নির্যাতনের শিকার হতে হয়েছে। হিন্দু বাড়িতেই বেছে বেছে আক্রমণ করতো রাজাকার-আলবদর বাহিনীর লোকেরা। হিন্দু মেয়েদেরকে ধর্ষণ করাটা ছিলো রাজাকার বাহিনীর একটি প্রায়োরিটি লিস্টের কাজ। হিন্দু বাড়ি লুট করা, হিন্দুদের সম্পত্তি নিজের নামে লিখে নেয়া, জোর করে কলমা পড়িয়ে ধর্মান্তরিত করা ইত্যাদি হেন কোন অপকর্ম নেই একাত্তরের রাজাকার-আলবদর বাহিনীর নামে জামায়াতের তত্কালীন সদস্যরা করেনি। যদিও পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী এবং তাদের এদেশীয় দোসর রাজাকার-আলবদরদের কাছে হিন্দু-মুসলমান কোন ভেদাভেদ ছিলো না। তাই একাত্তরেও সংখ্যালঘু সম্প্রদায়কে অনেক চড়া মূল্য দিতে হয়েছে। এতোদিন পর এসে ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের ওপর সন্ত্রাসীদের নির্বিচার তাণ্ডব দেখে মনে হচ্ছে যেন সেই একাত্তর আবার ফিরে এসেছে। তখন তো ছিলো পাকিস্তান আমল। কায়েম ছিলো পাকিস্তানি শাসন ব্যবস্থা। কিন্তু আজকে একটি স্বাধীন, সার্বভৌম দেশে কেন ধর্মীয় সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের লোকদেরকে সেই একাত্তরের অভিজ্ঞতার ভেতর দিয়ে জীবন যাপন করতে হবে? একটি ‘উদার’, ‘গণতান্ত্রিক’ ও ‘ধর্মনিরপেক্ষতা’র দাবিদার রাষ্ট্রে কেন ধর্মীয় সংখ্যালঘু সম্প্রদায়কে কেবল ধর্মীয় সংখ্যালঘু হওয়ার কারণে উগ্র-সাম্প্রদায়িক গোষ্ঠীর সহিংস ও হিংস আক্রমণের শিকার হতে হবে?
এখানে প্রসঙ্গত উল্লেখ্য যে, ২০০১ সালের নির্বাচনের পর এদেশের ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের ওপর ব্যাপক নির্যাতন ও হত্যাযজ্ঞ চালানো হয়। আওয়ামী লীগ ২০০৮ সালের নির্বাচনের আগে ঐ ঘটনার সঠিক তদন্ত করে সুষ্ঠু বিচার করবেন—এরকম একটা প্রতিশ্রুতি দিয়ে এদেশের ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের সমর্থন আদায় করে। ২০০৯ সালের ২৭ ডিসেম্বর একটি বিচার বিভাগীয় তদন্ত কমিটি গঠন করা হয় এবং সে কমিটি ২০১১ সালের ২৪ এপ্রিল পাঁচ খণ্ডে লিখিত একটি রিপোর্টও জমা দেয়; কিন্তু এরপর সেটা অন্যান্য তদন্ত কমিটির রিপোর্টের মতই রাজনৈতিক হিমাগারের বর্জ্য হয়ে পড়ে আছে। এভাবেই নির্বাচিত হওয়ার পর ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের উপর নির্যাতনের বিচারের বিষয়টিও অন্যান্য আর দশটি ইস্যুর মত ‘রাজনৈতিক বাকোয়াজে’ পরিণত হয়। ফলে, ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের প্রতি অধিকতর সংবেদনশীল বলে জনশ্রুত ও উপস্থাপিত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলেও বাংলাদেশে ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের উপর অসংখ্য আক্রমণের ঘটনা ঘটেছে। রামুর বৌদ্ধমন্দিরের নৃশংস হামলা ও ভয়াবহ অগ্নিসংযোগের দাগ এখনো শুকায়নি। বাতাসে এখনো মন্দিরের পোড়া গন্ধ পাওয়া যায়। ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের সুরক্ষা এবং তাদের যথাযথ নিরাপত্তা বিধানের কথা দূরে থাক, বর্তমান আওয়ামী লীগ সরকার পঞ্চম সংশোধনীর মাধ্যমে ইসলামকে রাষ্ট্রধর্ম হিসাবে বহাল রেখে প্রকারান্তরে ধর্মীয় সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের লোকদেরকে দ্বিতীয় শ্রেণির নাগরিকে পরিণত করেছে। তাই সাঈদীর ফাঁসির রায়কে কেন্দ্র করে জামায়াত-শিবিরের তাণ্ডবের সঙ্গে সঙ্গে এক প্রকার সন্ত্রাসীদের লক্ষ্যবস্তু হিসাবে ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের ওপর যে আক্রমণ হচ্ছে তার দায় ও দায়িত্ব রাষ্ট্রকেই নিতে হবে। কেননা, একদিকে রাষ্ট্রের নাগরিক হিসাবে সকলের জান-মালের সুরক্ষার দায়িত্ব রাষ্ট্রের, অন্যদিকে ধর্মীয় সংখ্যাগুরুর প্রতিনিধিত্বশীল একটি সরকার রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্বে থাকায় ধর্মীয় সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের নিরাপত্তা বিধান করাও রাষ্ট্রের দায়িত্ব। এটা অত্যন্ত দুঃখের এবং লজ্জার যে, স্বাধীনতার ৪২ বছর পরও ধর্মীয় সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের লোকদের বিশেষ করে হিন্দু সম্পদ্রায়ের লোকদেরকে এখনো সাম্প্রদায়িক হিংস তার আগুনে পুড়তে হয়। সত্যিকার অর্থে, সাম্প্রদায়িকতার আগুনে কেবল ধর্মীয় সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের লোকজনই পুড়ে না, সাথে সাথে পুড়ে আমাদের ‘সভ্য-সমাজ’ হওয়ার আইডিনটিটি এবং ‘সেক্যুলার’ রাষ্ট্র হওয়ার গৌরববোধ। সত্যিকার অর্থে স্বাধীনতার ৪২ পছর পরেও সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের এ নিরাপত্তাহীনতা সংখ্যাগুরু সম্পদ্রায়ের জন্য একধরনের ‘সংখ্যাগুরুত্বের’ লজ্জা। সম্প্রতি সংঘটিত এ ব্যাপক সাম্প্রদায়িক সহিংসতা মূলত আমাদের ‘সেক্যুলার’ হওয়ার যে গৌরব তার গরিবিয়ানাকেই অত্যন্ত নগ্নভাবে উন্মোচিত করে।
লেখক : সহযোগী অধ্যাপক, নৃবিজ্ঞান বিভাগ, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়। বর্তমানে হুমবোল্ট ভিজিটিং ফেলো হিসাবে জার্মানের একটি বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যাপনা করছেন
