পদ্মা সেতু না ঢাকার যানজট

আপডেট : ০৮ মার্চ ২০১৩, ২০:৫৭
কিছুদিন আগের সংবাদপত্রের খবর ঢাকার যানজটে বাত্সরিক ক্ষতির পরিমাণ প্রায় বিশ হাজার কোটি টাকা। যানজট নিয়ে এই খবর শেষ না হতেই নতুন খবর ঢাকা পৃথিবীর সবচেয়ে বাসের অযোগ্য শহর। বিশ্বের সবচেয়ে খারাপ শহরের এই খেতাবটি পাওয়ার ক্ষেত্রে নিঃসন্দেহে যানজট একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে বৈ কি। অন্যদিকে, সময়ের আলোচিত বিষয় পদ্মা সেতু করতেও লাগবে নাকি ঠিক প্রায় বিশ হাজার কোটি টাকার মতোই। স্বপ্নের এই পদ্মা সেতুর জন্য প্রতিশ্রুত বিশ্ব ব্যাংকের অর্থ প্রত্যাহারের পর প্রধানমন্ত্রী থেকে শুরু করে দলীয় নেতা-কর্মীদের পর্যন্ত রাতের ঘুম হারাম। দেশমাতৃকার সম্মান রক্ষার্থে চাঁদার ঝুলি হাতে তারা নেমে পড়েছেন দেশের আনাচে-কানাচে এবং ইতিমধ্যেই সেই চাঁদার টাকা সংগ্রহ করতে গিয়ে নিজের জীবন পর্যন্ত বিসর্জন দিয়েছেন একজন। বিশ্ব ব্যাংকের শর্ত মেনে তদন্ত করেও শেষ রক্ষা হলো না। আত্মসম্মান রক্ষার্থে তাই নিজ অর্থেই পদ্মা সেতু নির্মাণের এই সিদ্ধান্ত সরকারের। অথচ ঢাকার যানজট নিয়ে সরকারের আদৌ কোন মাথাব্যথা আছে বলে মনে হয় না। নিরন্তর যানজটে নাকাল ঢাকার লোকসংখ্যা অর্থাত্ ভোটার কিন্তু নেহায়েত কম নয়। প্রথম আলোর হিসাবটি যদি সত্যি হয় তাহলে তো এক বছর ঢাকার যানজট নিয়ন্ত্রণে রাখতে পারলেই পরের বছর পদ্মা সেতু নির্মাণ সম্ভব। তার মানে এক ঢিলে দুই পাখি মারা আর কি ! নিঃসন্দেহে পদ্মা সেতু দেশের দক্ষিণাঞ্চলের মানুষের ভাগ্য উন্নয়নে অনেক সহায়ক হবে। সময় বাঁচবে প্রায় ২ ঘণ্টা অর্থাত্ খুলনা যেতে ৮-৯ ঘণ্টার জায়গায় ২ ঘণ্টা সময় কম লাগবে হয়তোবা। কিন্তু খোদ ঢাকাতে বসে যখন ২০ মিনিটের পথটি ২ ঘণ্টায়ও শেষ হয় না অর্থাত্ সেই একই সময় নষ্ট হচ্ছে ২০ মিনিটের জায়গায়, সংগত কারণেই প্রশ্ন জাগে, পদ্মা সেতু নিয়ে যেখানে এত মাতামাতি, ঢাকার যানজট নিয়ে কারো তেমন মাথাব্যথা আছে বলে তো মনে হয় না। বিপুল জনসংখ্যার জন্য গড়পড়তা জিডিপি’র হিসাবে বিশ্বে আমাদের অবস্থান অনেক নিচে হলেও জাতি হিসাবে আমরা বাস্তবে ততটা নিচ নই বলেই আমার বিশ্বাস। কিন্তু আফসোসের বিষয়, কিছু চরম লজ্জাজনক খেতাব আমাদের ভাগ্যে জুটেছে সাম্প্রতিক সময়গুলোতে। বিশ্বের সবচেয়ে দুর্নীতিগ্রস্ত দেশ, অতঃপর বিশ্বের সবচেয়ে বাসের অযোগ্য শহর। বিষয়টি নিয়ে সরকারের উচ্চমহল থেকে কোন প্রতিবাদ বা বক্তব্য শুনেছি বলে আমার মনে পড়ে না। পদ্মা সেতু নিয়ে যতটা বিব্রত তারা সেই তুলনায় কিন্তু বিষয়টিকে মোটেই হালকাভাবে দেখা উচিত ছিল না। বিশ্বের বাসযোগ্য শহরের তালিকাটি করেছে দি ইকনমিস্ট আর ফলাও করে বিবিসিসহ আন্তর্জাতিক প্রচার মাধ্যমগুলো তা প্রচার করেছে ঢাকার নামটি উল্লেখ করে। মানসম্মানের কথা না হয় বাদই দিলাম, অর্থনৈতিক বিবেচনায়ও ঢাকার পরিবেশ, বিশেষ করে যানজটের ব্যাপারটি কোন অংশেই কম গুরুত্বপূর্ণ নয়। যানজটে বছরে বিশ হাজার কোটি টাকা ক্ষতির খবরটি অনেকের কাছে গাঁজাখোরী মনে হলেও নির্মম সত্যটি হচ্ছে এটি অবাস্তব কিছু নয়। একটা সময় ছিল পরিবেশ যথা যানজট, জলাবদ্ধতা বা নদী দূষণ ব্যাপারগুলো অনেকের কাছে অস্বস্তিকর মনে হলেও এর সাথে অর্থনৈতিক সম্পর্ক খুব একটা আছে বলে মনে করা হত না। কিন্তু সাম্প্রতিককালে পরিবেশ বিজ্ঞানের অভূতপূর্ব অগ্রগতির ফলে এখন এই ধরনের অনেক বিষয়ই হিসেব করে বলে দেয়া যাচ্ছে কোনটার ফলে কত ক্ষতি হচ্ছে। এই যেমন বিশ্ব ব্যাংকের একটি হিসাবমতে পরিবেশ দূষণের জন্য বাংলাদেশ বছরে প্রায় ৪% হারে জিডিপি হারাচ্ছে। হিসাবটা যে খুব কঠিন তাও কিন্তু না। মনিপুরীপাড়া থেকে বসুন্ধরা নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয় যেতে কোন এক ছুটির দিনে সময় লাগে মোটামুটি ১৫ থেকে ২০ মিনিট। ব্যস্ত দিনে তা হতে পারে দেড় থেকে দুই ঘণ্টা। সেমিনার কিংবা মিটিং- এর অনেক দাওয়াত পেলেও কখনও যাবার কথা ভাবতেই পারি না। কেননা এক্ষেত্রে দিনটাই মাটি। নিজে বঞ্চিত হচ্ছি অনেক অভিজ্ঞতা সঞ্চয়ের সুযোগ থেকে, রাষ্ট্রও। প্রতিদিন গাড়ির তেল পুড়ছে বহুগুণ, গাড়িটির অবচয় মূল্য বাড়ছে, বায়ু দূষিত হচ্ছে, বাড়ছে রোগবালাই, চরম অস্বস্তিতে মনের উপর প্রভাব পড়ছে, কর্মক্ষমতা কমছে। তাই একটু একটু করে ঢাকার দুর্নাম শুনে বিদেশিরা ভাবছে এখানে ব্যবসা করতে আসা ঠিক হবে কিনা। সর্বোপরি রোগ-শোকে জর্জরিত একটি দুর্বল পরবর্তী প্রজন্ম উপহার দিচ্ছি আমরা! টাকার হিসাব করলে এই ক্ষতির পরিমাণ দুই কোটি লোকের জন্য বছরে গড়ে দশ হাজার টাকা করে— এই অংকটি মোটেই অযৌক্তিক কিছু নয়। আমার জানামতে ঢাকা এবং তার আশপাশে প্রায় ২ কোটির মতো লোকের বাস। তাছাড়া প্রতিদিন সারাদেশ থেকে লাখে লাখে লোক ঢুকে এই শহরটিতে। সর্বোপরি মূল ঢাকার প্রায় এক থেকে দেড় কোটি লোককে প্রতিদিনই রাস্তায় নামতে হয়, যা কিনা বাংলাদেশের আর কোথাও হয়ে থাকে না। সুতরাং শ্রমঘণ্টা নষ্টের হিসাবে জনপ্রতি ঢাকার ক্ষতি অন্য যে কোন অঞ্চলের চাইতে হাজারগুণ বেশি সম্ভবত। সর্বোপরি ঢাকার এই যানজট সমস্যাটি অনেকাংশেই সমাধান করা যায় বিশ্ব ব্যাংকের মতো সংস্থার সাহায্য ছাড়াই। বছরের পর বছর ধরে একটি কথা বিশেষজ্ঞ থেকে ধরে আপামর জনসাধারণ বলে আসছে যে, গণপরিবহন ব্যবস্থার উন্নয়ন করতে হবে। ট্যাক্সি ব্যবস্থাটিও এখন প্রায় মুখ থুবড়ে পড়েছে। নেই পর্যাপ্ত সি এন জি অটোরিকশাও। যার ফল - ঢাকার রাস্তায় এখন প্রায় ৭৫% গাড়িই ব্যক্তিগত। ক্ষমতায় আসার প্রথম দিন থেকেই তো এ ব্যাপারে ব্যবস্থা নেয়া যেত। প্রাইভেট কার আরোহীদের বাসে উঠাতে গেলে এক্ষেত্রে প্রাইভেট সেক্টরে শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত ভালো বাসের সংখ্যা বাড়ানো দরকার ছিল, প্রয়োজনে বিশেষ ট্যাক্স সুবিধা দিয়ে। অতঃপর মানুষ ধীরে ধীরে কার ছেড়ে বাস ব্যবহারের সাথে সাথে “পজিটিভ ফিডব্যাক” মেকানিজমে যানজট কমা শুরু হত। শহরের স্কুল, কলেজ বা বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর জন্য বাস সার্ভিসের ব্যবস্থা করা যেত সংশ্লিষ্ট শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোকে বিশেষ আর্থিক সুবিধা দিয়ে। সরকারি অফিসগুলোতে অন্তত ছোট গাড়ি কমিয়ে বাস/মাইক্রোবাস ব্যবহার বাড়ানো যেত। মোড় কিংবা সিগনালগুলোর সংস্কার ও প্রশস্ত করা এবং আরও দক্ষতার সাথে ট্রাফিক নিয়ন্ত্রণ করা, প্রয়োজনে কমিউনিটি ট্রাফিক পুলিশিং-এর ব্যবস্থা করা যেত। দীর্ঘমেয়াদে ফ্লাইওভার বা এম আর টি- এর পরিকল্পনার পাশাপাশি স্বল্পমেয়াদে এই ছোট বিষয়গুলোর গুরুত্ব কোন অংশেই কম ছিল না। বরং সরকারের পাঁচ বছরের সময়কালেই এর সুবিধাগুলো পাওয়া যেত। আর্থিক বিবেচনায় বিনিয়োগ ও প্রাপ্তির হিসাবটিও এখানে অনেক বেশি হত। আমার তো ধারণা, বাকি যে এক বছর সময় আছে সেই সময়ের মধ্যেই এর সুফল পাওয়া সম্ভব। কিন্তু অজানা কারণে আমাদের সরকারগুলোর মধ্যে এইসব সহজলভ্য সমাধান বাদ দিয়ে বড় প্রকল্পের দিকেই ঝোঁক বেশি দেখা যায়। দেশের দক্ষিণাঞ্চলের মানুষের ভাগ্য উন্নয়নে পদ্মা সেতুটি প্রয়োজনীয় বটে। তবে এ মেয়াদে এটি শুরু হবার সম্ভাবনাও খুবই ক্ষীণ। অথচ ঢাকাসহ দেশের আর সব অঞ্চলের মানুষের জন্য যোগাযোগ মন্ত্রণালয়ের অধীনেই আরও অনেক জনগুরুত্বপূর্ণ বিষয় বাকি, ঢাকার যানজট ও গণপরিবহন ব্যবস্থা, ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ক, রেলওয়ের উন্নয়ন ইত্যাদি। জনসেবার জন্য হোক আর ভোটের জন্যই হোক- কোন অংশ বিবেচনায়ই এগুলো কম গুরুত্বপূর্ণ নয়। ক্ষমতাধর মন্ত্রী-আমলাসহ দেশের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের বাস এই ঢাকা শহরে। দেশের অর্থনীতিতে এই শহরের জনপ্রতি অবদান অন্য সব অঞ্চলের চাইতে অনেক বেশি। যানজটে আটকা পড়ে এখানে কোটি কোটি শ্রমঘণ্টা নষ্ট হবার মধ্য দিয়ে সমগ্র দেশই আসলে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। ক্ষমতার বাকি আর এক বছরে সম্ভবত এটাই একটি জনগুরুত্বপূর্ণ বিষয়, যা কিনা কোন দাতা সংস্থার সাহায্য ছাড়াই অনেকাংশে উন্নতি সম্ভব। ঢাকাবাসীর পক্ষ থেকে আমরা সরকারের কাছে অন্তত এই আশাটি করছি। লেখক:পরিবেশ প্রকৌশলী, সহযোগী অধ্যাপক ও বিভাগীয় প্রধান, পরিবেশ বিজ্ঞান ও ব্যবস্থাপনা বিভাগ; কো-অর্ডিনেটর, সিভিল অ্যান্ড এনভায়রনমেন্টাল ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগ, নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন