জলবায়ু পরিবর্তন তহবিল ব্যয়ে স্বচ্ছতা প্রয়োজন

আপডেট : ০৮ মার্চ ২০১৩, ২১:৩৩
সংসদ সদস্যরা জলবায়ু পরিবর্তন তহবিলের ব্যয়ের স্বচ্ছতা লইয়া প্রশ্ন উত্থাপন করিয়াছেন। তাহারা বলিয়াছেন, সরকারের সতর্ক অবস্থানের পরও এই তহবিলের সঠিক ব্যবহার নিশ্চিত করা যায় নাই। ফলে কাঙ্ক্ষিত মাত্রায় ঝুঁকি মোকাবিলা করা সম্ভব হইতেছে না। জাতীয় সংসদ ভবনের আইপিডি সম্মেলন কক্ষে গত মঙ্গলবার মতবিনিময় সভায় সংসদ সদস্যরা এই দাবি জানান। জলবায়ু তহবিলের ব্যয়ে অনিয়মের কথা তুলিয়া ধরিয়া ডেপুটি স্পিকার কর্নেল (অব.) শওকত আলী বলেন, জলবায়ু তহবিল কীভাবে ব্যবহূত হইতেছে, তাহা জনপ্রতিনিধিরা জানেন না। পাশাপাশি বিভিন্ন পত্র-পত্রিকার প্রতিবেদন হইতে জানা যাইতেছে জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলার বরাতে যে বিপুল অর্থের প্রবাহ বাংলাদেশে আসিতেছে, তাহা নূতন ধরনের দুর্নীতিরও জন্ম দিতেছে। নূতন নানান প্রতিষ্ঠান গড়িয়া উঠিয়াছে ইহাকে ঘিরিয়া। সরকারী ও বেসরকারী পর্যায়ে এই অর্থ যেনতেনভাবে নূতন ও পুরাতন মামুলি সব প্রতিষ্ঠানকে দেওয়া হইতেছে। সরকারের দিক হইতে দলীয় বিবেচনাও কাজ করিতেছে এই অর্থ বণ্টনের ক্ষেত্রে। জলবায়ু পরিবর্তনের বৈশ্বিক রাজনীতিতে সকলের দৃষ্টি এখন বাংলাদেশের দিকে পড়িয়াছে। বিশেষত জলবায়ু পরিবর্তন ও বৈশ্বিক উষ্ণতা বৃদ্ধির ফল হিসাবে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বাড়িতেছে এবং কেবল ৪৫ সেন্টিমিটার উচ্চতা বৃদ্ধি পাইলে বাংলাদেশের উপকূলবর্তী শতকরা ১০ ভাগ ভূমি পানির নিচে তলাইয়া যাইবে। কোটি লোক হইয়া পড়িবে জলবায়ু উদ্বাস্তু, সম্ভাবনা দেখা দিবে গৃহযুদ্ধের। ইহাছাড়া, বিশেষজ্ঞরা অনুমান করিতেছেন যে, সিডর এবং আইলার মতো ঘূর্ণিঝড় ঘন ঘন দেখা দিতেছে জলবায়ু পরিবর্তনের ফল হিসাবেই। শিল্পোন্নত দেশসমূহ কার্বন নিঃসরণের মাধ্যমে বৈশ্বিক উষ্ণতা বৃদ্ধির জন্য এককভাবে দায়ী থাকিলেও, উহার কুফল ভোগ করিতেছে বিশ্বের সবাই। এখন জলবায়ু পরিবর্তনকে ঘিরিয়া চলমান বৈশ্বিক রাজনীতির দুইটি দিক রহিয়াছে। বৈশ্বিক সমঝোতা এরূপ যে শিল্পোন্নত দেশগুলি কার্বন নিঃসরণের পরিমাণ যথাসম্ভব কমাইয়া আনিবে আর ঝুঁকির মুখে রহিয়াছে এরূপ দেশগুলিকে ঝুঁকি মোকাবিলায় অর্থসাহায্য প্রদান করা হইবে এবং এই অর্থ প্রদান করিবে ধনী দেশগুলি। এই রাজনীতিতে বাংলাদেশ এখন উচ্চকণ্ঠ, বিশেষত কোপেনহেগেন সম্মেলন হইতেই বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠা করিয়াছে যে তাহার অনেক কথা বলিবার আছে এবং বিশ্বনেতৃত্বকে তাহা শুনিতে হইবে। বলাবাহুল্য, বিভিন্ন বৈশ্বিক ও আঞ্চলিক সম্মেলনে বিশ্ব নেতৃবৃন্দ তাহা মন দিয়া শুনিতেছে। বাংলাদেশের জন্য তাহারা জলবায়ু তহবিল গঠন করিয়া দিয়াছেন। বাংলাদেশ বরাদ্দ বাড়াইবার দরকষাকষি করিয়াছে। কিন্তু এইরূপ তহবিল ব্যবহারে অস্বচ্ছতা জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলাকে ব্যর্থ করিয়া দিবে। শিল্পোন্নত দেশসমূহের মানুষের জীবনযাপন পদ্ধতির মধ্যেই রহিয়াছে কার্বন নিঃসরণ পরিমাণ বৃদ্ধি তথা জলবায়ু পরিবর্তনের রহস্য। কলকারখানার উত্পাদনের পাশাপাশি তাহারা চট করিয়া প্রাইভেট কার ব্যবহার বন্ধ কিংবা বিমানভ্রমণ হ্রাস করিতে পারিতেছে না। সবচাইতে বেশি কার্বন নিঃসরণকারী দেশ যুক্তরাষ্ট্র কিয়োটো চুক্তিতে স্বাক্ষরই করে নাই। অন্যদিকে অনুন্নত ও ঝুঁকির ভিতর থাকা দেশগুলি যতটা না উন্নত দেশগুলির কার্বন নিঃসরণ কমাইয়া আনিতে চাপপ্রয়োগে আগ্রহী, তাহার চাইতে ক্ষতিপূরণের অর্থ পাইতে অধিক আগ্রহী। আবার অর্থ পাইবার পর যদি তাহা ব্যবহারে স্বচ্ছতা না থাকে, তাহা হইলে বুঝিতে হইবে, এই তহবিল কাহারো কাহারো পকেট ভারী করিবে মাত্র, জলবায়ু বিপর্যয় ঠেকাইতে এই তহবিলের বিশেষ কিছু ভূমিকা থাকিবে না। তাই পরিস্থিতির অবনতির পূর্বেই জলবায়ু পরিবর্তন তহবিলের সুষ্ঠু ব্যবহারের দিকে মনোযোগ দিতে হইবে।

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন