পাবলিক প্লেসে ধূমপানের অর্থদণ্ড দ্বিগুণ (৫০ টাকার বদলে ১০০ টাকা) এবং তামাকজাত দ্রব্যের বিজ্ঞাপন নিষিদ্ধ করার প্রস্তাব রাখিয়া ২০০৫ সালের ধূমপান এবং তামাক দ্রব্য ব্যবহার (নিয়ন্ত্রণ) আইন সংশোধনে জাতীয় সংসদে বিল উত্থাপন করা হইয়াছে কয়েক দিন আগে। প্রস্তাবিত আইনে অপ্রাপ্ত বয়স্কদের কাছে তামাকজাত দ্রব্য বিক্রি নিষিদ্ধ করা হইয়াছে। আগামী ১০ কার্যদিবসের মধ্যে বিলটি পরীক্ষা-নিরীক্ষা করিয়া সংসদে রিপোর্ট দেওয়ার জন্য স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটিতে পাঠানো হইয়াছে। প্রস্তাবিত আইনে বেসরকারি অফিসকেও ধূমপানমুক্ত এলাকা হিসাবে অন্তর্ভুক্ত করা হইয়াছে। আবার এই কথাও বলা হইয়াছে যে, একই ব্যক্তি দ্বিতীয়বার বা বারংবার একই অপরাধ করিলে পর্যায়ক্রমে দ্বিগুণ হারে অর্থদণ্ড দিতে হইবে। বিলে গুল, জর্দা, খৈনি সাদাপাতাসহ চোষণ ও চিবানোর মাধ্যমে গ্রহণ করা তামাকজাত দ্রব্যকে অন্তর্ভুক্ত করা হইয়াছে।
বিশ্বের বিভিন্ন দেশেই ধূমপান ও তামাক দ্রব্য ব্যবহারে কোন না কোনভাবে নিয়ন্ত্রণারোপের দৃষ্টান্ত রহিয়াছে। তবে তামাক চাষাবাদ, ফলানো, উত্পাদন ও ক্রয়-বিক্রয় সম্পূর্ণভাবে নিষিদ্ধ একমাত্র ভুটানে। আমরা জানি, ধূমপান স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর। অনুরূপভাবে জাতীয় স্বাস্থ্যের জন্যও হুমকি স্বরূপ। ইহা হার্টের অসুখ ও ক্যান্সার হইতে শুরু করিয়া বিভিন্ন রোগের উপসর্গ তৈরি করে। অন্যদিকে ধূমপায়ী ব্যক্তি শুধু নিজেরই ক্ষতি করে না, আশেপাশের মানুষের জন্যও ক্ষতির কারণ হইয়া দাঁড়ায়। এক গবেষণায় দেখা গিয়াছে যে, ধূমপায়ীর সংস্পর্শ লাভকারী ব্যক্তির ফুসফুস ক্যান্সারের ঝুঁকি শতকরা ২০-৩০ ভাগ। অধিকাংশ দেশে ১৫ হইতে ২১ বছর পর্যন্ত বয়সী মানুষের ধূমপান, তাহা বহন ও ক্রয়-বিক্রয় নিষিদ্ধ। তবে ইহা যতটা না আইনের বিষয়, তাহার চাইতে ইহা আসলে অভ্যাসের ব্যাপার। ইহা সামাজিক সচেতনতার বিষয়।
বাংলাদেশে দুই দশক আগেও বাসে-ট্রেনে এমনকি বিমানেও ধূমপানের দৃশ্য অহরহ দেখা যাইত। এখন ইহা বলিতে গেলে অকল্পনীয়। বরং গণপরিবহনে যাহারা এখন ধূমপান করেন, তাহাদের মধ্যে এক প্রকারের অস্বস্তি ও লজ্জাবোধ কাজ করে। ইহাও সচেতনতার কারণেই হইয়াছে। এই পরিস্থিতি তৈরিতে আইনেরও একটা ভূমিকা আছে বৈকি। কেননা যাহারা ধূমপায়ী নন, তাহারা ধূমপায়ী ব্যক্তিদের আইনের কথা বলিয়া নিরুত্সাহিত করিতে বা নিষেধ করিতে পারিতেছেন। সেই অধিকারের ভিত্তি তৈরি হইয়াছে। কিন্তু যে দেশে আইনের শাসন নাই, সেখানে আইনের অপব্যবহারই বেশি হইয়া থাকে। ২০০৫ সালে এই সংক্রান্ত প্রথম আইনটি করার পর বাংলাদেশে যত্রতত্র ধূমপানের অর্থদণ্ড আদায়ের দৃশ্য চোখে পড়ে। পুলিশের দুর্নীতি নিয়া কথাও ওঠে। তাহার পরই আইনটি গুরত্ব হারাইয়া ফেলে। তবে আইন করার কারণে পত্র-পত্রিকায় ও টেলিভিশনসহ বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রচার-প্রচারণা চলে। ইহাতে কিছুটা হইলেও সচেতনতার কাজটি হইয়া যায়।
এখন পাবিলক প্লেসে ধূমপান নিষিদ্ধ করার আইনটি সংশোধন করা হইতেছে ইহা খুবই ভাল কথা। তবে আইনের বাস্তবায়ন নিশ্চিত করিতে হইবে। বাস্তবায়নের ধারাবাহিকতা বজায় রাখিতে হইবে। সাধারণত যাহারা একবার ধূমপায়ী হন, তাহাদের এই নেশা সহজে যায় না। এইজন্য পাবলিক প্লেসের কোন সুনির্দিষ্ট কর্নার বা স্থানে আলাদাভাবে ধূমপানের ব্যবস্থাও থাকা প্রয়োজন। সিঙ্গাপুর ও আমেরিকাসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশের এয়ারপোর্টগুলিতে যত্রতত্র ধূমপান করা যায় না বটে, তবে সেজন্য আলাদা প্লেস রহিয়াছে। সেই প্লেসের বাহিরে যেখানে সেখানে ধূমপান করিলেই সঙ্গে সঙ্গে পুলিশ আসিয়া বাধা দেয়। বাংলাদেশেও এরকম বিকল্প ব্যবস্থা থাকা দরকার। আইনেও ইহার উল্লেখ থাকা প্রয়োজন। তাহলেই ধূমপান নিয়ন্ত্রণ আইন আরও বাস্তবায়নযোগ্য হইতে পারে। আমরা এ ব্যাপারে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের দৃষ্টি আকর্ষণ করি।
