শ্রমিকদের নিরাপত্তা ও স্বাস্থ্য সুরক্ষা

আপডেট : ০৯ মার্চ ২০১৩, ২২:০৪
গার্মেন্টসসহ সব সেক্টরের শ্রমিকদের স্বাস্থ্য সুরক্ষা নিরাপত্তা নিশ্চিত করিতে জাতীয়ভাবে একটি নীতিমালা প্রণয়নের উদ্যোগ গ্রহণ করিয়াছে সরকার। শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয় এই সংক্রান্ত নীতিমালার খসড়া চূড়ান্ত করিয়াছে। ৯ পৃষ্ঠার এই নীতিমালায় বলা হইয়াছে যে, সরকার শ্রমিকদের নিরাপত্তা প্রদানে ২৬টি দায়িত্ব পালন করিবে। ইহার পাশাপাশি নীতিমালায় অধিক্ষেত্র, লক্ষ্য, নৈতিক ও আইনগত বাধ্যবাধকতা, স্টেকহোল্ডারদের দায়িত্ব, সংগঠন, সমিতি ও শ্রমিক ইউনিয়নের দায়িত্ব এবং এই সেক্টরে নিয়োজিত কর্মকর্তা ও ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষের দায়-দায়িত্ব সম্পর্কে বিস্তারিত দিক-নির্দেশনা দেওয়া হইয়াছে। বিশেষত সরকারের ২৬টি দায়-দায়িত্বের মধ্যে আছে— পেশাগত স্বাস্থ্য ও নিরাপত্তা ঝুঁকি ও ঝুঁকিপূূর্ণ খাত চিহ্নিত করা, দুর্ঘটনার পর শ্রমিকদের প্রয়োজনীয় চিকিত্সা ও ক্ষতিপূরণ পাওয়ার বিষয়টি নিশ্চিত করা, ক্ষতিগ্রস্ত শ্রমিকদের পুনর্বাসন করা, পেশাগত রোগ নির্ণয় ও নিরাময়ে সক্ষম বিশেষায়িত ইনস্টিটিউট স্থাপন, বিশেষজ্ঞ চিকিত্সক তৈরি ও নিয়োগ, পেশাগত দক্ষতা উন্নয়নে প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা, শ্রমঘন এলাকায় শ্রম আদালত স্থাপন করা, নিয়মিতভাবে স্টেকহোল্ডার বা শ্রমিকদের মতামত নেওয়া ও সেই অনুযায়ী ব্যবস্থা গ্রহণ, শ্রমিকদের স্বাস্থ্য ও নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে যেসব যন্ত্রপাতি আমদানি করা হইবে তাহার শুল্কহার ও ভ্যাট মওকুফ করা প্রভৃতি। চলতি মাসের মধ্যেই মন্ত্রিসভার অনুমোদন নিয়া নীতিমালাটি চূড়ান্ত করা হইবে বলিয়া জানা গিয়াছে। সরকারের এই নীতিমালাকে আমরা প্রথমেই স্বাগত জানাই। সরকার যে ২৬টি দায়িত্ব নিজে পালন করিবার কথা বলিয়াছে, তাহার সঠিক বাস্তবায়ন হইলে শ্রমিকদের নিরাপত্তা নিয়া তেমনভাবে উদ্বিগ্ন হইবার কোন কারণ থাকিবে না। বস্তুত এই দায়িত্বগুলি পালন করাটাই চ্যালেঞ্জ স্বরূপ। সম্প্রতিকালে বাংলাদেশে গার্মেন্টসহ বিভিন্ন শিল্প প্রতিষ্ঠানে ভয়াবহ অগ্নিকান্ডের ঘটনা ঘটিয়াছে। ইহাতে অনেক শ্রমিক হতাহত হইয়াছেন। বিশেষত তাজরিন গার্মেন্টসে অগ্নিকান্ডের ঘটনায় শতাধিক ব্যক্তির প্রাণহানি ঘটে। ইহা লইয়া দেশে-বিদেশে ব্যাপক সমালোচনা হয়। অগ্নিকান্ডসহ প্রাকৃতিক দুর্ঘটনা যে কোন সময়েই সংঘটিত হইতে পারে। কিন্তু আমাদের নিরাপত্তা ও দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা যদি দুর্বল হয়, তাহা হইলে ক্ষয়-ক্ষতির পরিমাণ বেশি হওয়াই স্বাভাবিক। তাহাছাড়া আমাদের অসতর্কতা ও অব্যবস্থাপনার কারণে বারংবার একই ধরনের ঘটনার পুনরাবৃত্তি ঘটিতে থাকিলে বিদেশি ক্রেতারা বিরাগভাজন ও বিমুখ হইবেন ইহাও জানা কথা। ইহার নেতিবাচক প্রভাব পড়িবে ব্যবসা-বাণিজ্য ও বিনিয়োগের ওপর। বিশেষত রফতানিমুখি খাতগুলি ক্ষতিগ্রস্ত হইবে। ইতোমধ্যে যাহারা আমাদের তৈরি পোশাকের ক্রেতা, তাহারা দীর্ঘমেয়াদি ব্যবসায়িক স্বার্থে আমাদের শ্রমিকদের নিরাপত্তা নিয়া প্রশ্ন তুলিয়াছেন। যেমন যুক্তরাষ্ট্র শ্রমিক নেতা আমিনুল ইসলাম হত্যাকাণ্ডের বিচারসহ গার্মেন্টস শিল্পে শ্রমিকদের নিরাপত্তার বিষয়টিকে অগ্রাধিকার প্রদান করিতেছে। কেননা যুক্তরাষ্ট্রের শ্রমিক নেতাদের মধ্যেও ইহার ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়া হইতেছে। একইভাবে ইউরোপীয় ইউনিয়নও শ্রমিকদের নিরাপত্তা রক্ষায় পদক্ষেপ গ্রহণের কথা বলিয়া আসিতেছে। এরূপ প্রেক্ষাপটে সরকারের এই নীতিমালা প্রণয়নের উদ্যোগ শুভবুদ্ধির পরিচায়ক। শিল্প প্রতিষ্ঠানে মালিক ও শ্রমিক উভয়েরই স্বার্থ সংরক্ষণ করা প্রয়োজন। মালিকগণ যেমন শ্রমিকদের নিয়মিত বেতন-ভাতা-বোনাসসহ যাবতীয় সুযোগ-সুবিধার প্রতি খেয়াল রাখিবেন, তেমনি শ্রমিকগণও নিজ প্রতিষ্ঠানকে লাভজনক ও প্রতিষ্ঠানের ভাবমূর্তি উজ্জ্বল করিতে নিয়মিত ও যথাযথ দায়িত্ব পালন করিয়া যাইবেন। কিন্তু আমাদের দেশে কোন কোন ক্ষেত্রে ইহার ব্যত্যয় ঘটিতেছে বলিয়াই শ্রমিক অসন্তোষ লাগিয়া আছে। আমাদের আরও মনে রাখা দরকার যে, শিল্প প্রতিষ্ঠানের উন্নতি না হইলে শ্রমিকের উন্নতি হইবে না, আবার শ্রমিকের উন্নতি না হইলে ঐ শিল্প প্রতিষ্ঠানেরও উন্নতির সম্ভাবনা কম। অবশ্য অনেক শিল্পমালিক রহিয়াছেন, যাহারা বরাবরই শ্রমিকদের সব রকম নিরাপত্তার ব্যাপারে প্রযত্নশীল এবং তাহাদের প্রশংসা না করিয়া পারা যায় না। যাহা হউক, পোশাক শিল্প, জাহাজ ভাঙ্গা শিল্প ও নির্মাণ শিল্পসহ সকল শিল্প প্রতিষ্ঠানে শ্রমিকদের নিরাপত্তার বিষয়টি আগে সুনিশ্চিত করিতে হইবে। কেননা সেফটি ফাস্ট বা নিরাপত্তাই প্রথম। এজন্য নীতিমালাকে শুধু কাগজে-কলমে সীমাবদ্ধ না রাখিয়া তাহা সঠিকভাবে বাস্তবায়ন করিতে হইবে।

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন