আলোকপাত

নারী নির্যাতন বনাম নারীর ক্ষমতায়ন

আপডেট : ০৯ মার্চ ২০১৩, ২২:০৫
নারীর ক্ষমতায়ন বিশ্বময় ব্যাপক আলোচিত একটি বিষয়। নারীর যথাযোগ্য অধিকার নিশ্চিত করা, পুরুষের সাথে তার বৈষম্য বিলোপ করা এবং নেত্রীত্ব ও ক্ষমতা ব্যবহারে নারীর অংশীদারিত্ব নিশ্চিত করা ইত্যাদি হলো নারীর ক্ষমতায়নের মূল কথা। বিশ্বের বিভিন্ন দেশ আজ এই বিষয়গুলো গুরুত্ব দিচ্ছে। নারীকে সমাজে প্রতিষ্ঠিত করার জন্য বিশ্বময় প্রচেষ্টা চলছে। এক্ষেত্রে অগ্রগতির পরিমাণও দৃশ্যত অনেক। বিশ্বের অনেক দেশেই আজ নারীরা রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার পাশাপাশি অনেক গুরুত্বপূর্ণ পদের অধিকারী হয়েছেন। বাংলাদেশ এক্ষেত্রে অনেক অগ্রণী বলে বিশ্বময় মনে করা হয়। কিন্তু সত্যিকার অর্থে নারীর ক্ষমতায়ন বিশ্বময় কতটুকু হয়েছে বিভিন্ন মিডিয়ায় প্রকাশিত সংবাদসমূহ পর্যালোচনা করলেই তা ভালোভাবে বোধগম্য হবে। সামপ্রতিক সময়ে এদেশে নারীর প্রতি যে পরিমাণ সহিংস আচরণের খবর প্রকাশিত হচ্ছে তাতে করে এদেশে সামগ্রিকভাবে নারীর অবস্থার যে কতটা অগ্রগতি হয়েছে তা যে কেউ বুঝতে পারে। পুলিশ হেডকোয়ার্টার্স ক্রাইম পরিসংখ্যান রেকর্ড সূত্রে জানা যায়, ২০১১ সালে ৩৬৩৮টি ধর্ষণের ঘটনা নথিভুক্ত হয়। ২০১২ সালে নথিভুক্ত হয় ৩৮৪০টিরও বেশি। ২০১৩ সালের শুরুতেই ধর্ষণের ঘটনা বিভিন্ন মিডিয়ায় যেভাবে আসছে তা ভীষণ আশঙ্কাজনক। আসলে বিশ্বময় পরিস্থিতি অনেকটা বাংলাদেশের মতোই। ইউনাইটেড স্টেট ডিপার্টমেন্ট অব জাস্টিসের নথি থেকে জানা যায়, সামপ্রতিক বছরগুলোতে সেখানে ধর্ষণের পরিমাণ বছরে দুই লক্ষ ছাড়িয়ে গেছে। আমেরিকায় প্রতি ৬ জনের একজন নারী জীবনে কোন না কোন সময় ধর্ষণের শিকার বা ধর্ষকের আক্রমণ থেকে কোনক্রমে মুক্ত হবার অভিজ্ঞতা আছে। এক জরিপে বলা হয়েছে, আমেরিকাতে প্রতি ২ মিনিটে একজন নারী ধর্ষিত হয়। নারীর অগ্রগতি নিশ্চিত করার লক্ষ্যে নারীর প্রতি দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন ঘটাতে হলে ধর্মীয় শিক্ষার প্রতি বিশেষভাবে গুরুত্ব দিতে হবে। ধর্ম মানবিক শ্রদ্ধাবোধকে জাগ্রত করার শিক্ষা দেয়। ধর্মের সঠিক ব্যাখ্যা নিশ্চিত করতে পারলে এবং সঠিক ধর্মীয় জ্ঞান দ্বারা ধর্মবিশ্বাসীদের অনুপ্রাণিত করতে পারলে নারীর অধিকার নিশ্চিত হবার পথ সুগম হবে। আমাদের দেশে যৌথ পরিবার ব্যবস্থা ক্রমশ বিলীন হয়ে যাচ্ছে। তথাকথিত ছোট পরিবার সুখী পরিবার বলে দাবি করা হলেও এতে করে নতুন প্রজন্ম আত্মীয়তার বন্ধন থেকে অনেকটা বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ছে। ঘনিষ্ঠ নারী-পুরুষদের সাথে সুখে-দুঃখে মিলেমিশে থাকার ফলে মানবিক সহানুভূতি অনেকটা বৃদ্ধি পায়। যৌথ পরিবারের অনুপস্থিতিতে আমাদের ভবিষ্যত্ প্রজন্ম অনেকটা স্বার্থপর হয়ে উঠার সম্ভাবনা রয়েছে। এই অশুভ সম্ভাবনাকে রোধ করতে না পারলে দুর্বলের ওপর সবলের নির্যাতন বন্ধ হবে না। যৌথ পরিবার ব্যবস্থা ফিরিয়ে আনা যুগের বাস্তবতায় সম্ভব না হলেও সুস্থ সংস্কৃতি চর্চা ও নানারকম সামাজিক কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে সামাজিক সম্পর্ককে সুদৃঢ় করতে পারলে এবং সর্বোপরি নৈতিকতাবোধ উন্নত করতে পারলে সহমর্মিতার মনোভাব সৃষ্টি করা ও তা সচল রাখা সম্ভব হতে পারে। নারীর প্রতি সহিংসতা অথবা যে কোন অশোভন আচরণ যারা করে তাদের তালিকায় কেবল পুরুষ নয়, নারীরাও আছে। অর্থাত্ নারীও অনেক সময় নারীর প্রতি অত্যাচার করে। বিত্তশালী শাশুড়ির দ্বারা গরিব ঘর থেকে আসা পুত্রবধূ অনেক ক্ষেত্রেই দুর্ব্যবহার বা নির্যাতনের শিকার হয়। আবার অর্থনৈতিকভাবে শক্তিশালী পুত্রবধূর হাতে অর্থ-সম্পদহীন শাশুড়ি অনেক সময়ই অবহেলার পাত্র হয়ে উঠেন। নারী কর্তৃক নারী নির্যাতনের এরকম উদাহরণ আরও অনেক রয়েছে। এতে করে একটি বিষয়ই প্রমাণিত হয় যে, আসলে নির্যাতন বা সহিংসতার বিষয়টি মূলত দুর্বলের ওপর সবলের নির্যাতন। আর এই নির্যাতনমূলক মানসিকতা মূলত নৈতিক চেতনার ঘাটতি থেকেই উত্সারিত। তাই নৈতিক চেতনার এই ঘাটতি পূরণ করতে পারলে কেবল নারীর ওপর নয়, নারী-পুরুষ নির্বিশেষে যে কোন মানুষের ওপর নির্যাতন বা সহিংস আচরণ করার ইচ্ছা বিলোপ ঘটতে পারে। লেখক:দর্শনের শিক্ষক, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় চেয়ারম্যান, অ্যাসোসিয়েশন ফর প্রাকটিক্যাল এথিক্স [email protected]

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন