আধুনিক মালয়েশিয়ার রূপকার ড. মাহাথির মোহাম্মদ সম্প্রতি এক আলোচনা সভায় বাংলাদেশের নৈরাজ্যকর পরিস্থিতি সম্পর্কে কিছু গুরুত্বপূর্ণ ও দিকনির্দেশনামূলক বক্তব্য দিয়াছেন । গত কয়েক সপ্তাহের সহিংসতায় ব্যাপক প্রাণহানিতে তিনি উদ্বেগ প্রকাশ করিয়াছেন। তিন বলিয়াছেন যে, যদি দেশের কোথাও কোন সমস্যা থাকে, তাহলে দয়া করিয়া সবার সঙ্গে সংলাপে বসুন। নিরপেক্ষ কাহাকেও বিচারক মানিয়া হইলেও ফয়সালা করুন। তিনি সতর্ক করিয়া দিয়া ইহাও বলিয়াছেন যে, ‘ যারা তরবারির সঙ্গে বসবাস করে তারা তরবারির আঘাতেই মারা যায়।’ অর্থাত্ কেহ যদি হত্যাযজ্ঞ ও সন্ত্রাসের মধ্য দিয়া কোনো কিছু করিতে চায়, তাহা হইলে তাহারও মরণ হইবে ঠিক একই পদ্ধতিতে। অন্যদিকে ওআইসির (অরগানাইজেশন অব ইসলামিক কনফারেন্স) মহাসচিব প্রফেসর ড. একমেলুদ্দিন এহসানুগ্লু বাংলাদেশের রাজনৈতিক দলগুলিকে সংযত আচরণ ও আইনের শাসনের প্রতি সকলকে শ্রদ্ধাশীল হওয়ার আহ্বান জানাইয়াছেন। ব্রিটেনের প্রভাবশালী সাময়িকী ইকোনমিস্ট শাহবাগের শান্তিপূর্ণ বিক্ষোভ দেশকে বিভক্ত করিতেছে বলিয়া সতর্কবাণী উচ্চারণ করিয়াছে।
দিন যতই যাইতেছে, ততই বাংলাদেশের রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা নিয়া আশঙ্কা ও অনিশ্চয়তা বাড়িতেছে। রাজপথে বাড়িতেছে সহিংসতা ও রক্তপাত। ইহাতে ঢাকাস্থ সব বিদেশি মিশনের রাষ্ট্রদূত ও মিশনের প্রধানরা উদ্বেগ ও উত্কণ্ঠা প্রকাশ করিয়াছেন। সেই সঙ্গে বিশ্বনেতৃবৃন্দের নিকট হইতেও এখন প্রতিক্রিয়ার কথা জানা যাইতেছে। উল্লেখ্য, দেশ ও জাতিকে ভাগ করার কথা আমাদের দেশেও বেশ সমস্বরে উচ্চারিত হইতেছে। ইহা সম্যক আলোচনার দাবি রাখে। বর্তমানে বাংলাদেশ দুই ভাগে বিভক্ত হইয়া পড়িয়াছে তাহাতে কোন সন্দেহ নাই। একদিকে আছে ১৮ দলীয় জোট, অন্যদিকে মহাজোট। একদিকে আছে বাঙালি জাতীয়তাবাদ, ধর্মনিরপেক্ষ ও সমাজতান্ত্রিক শক্তি, অন্যদিকে বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদ ও ইসলামি শক্তি। ইহার বাহিরে যাহারা আছে বলিয়া দাবি করিতে পারেন, শেষ বিচারে দেখা যাইবে তাহারাও কোন না কোনভাবে এই দুই শিবিরেই অন্তর্ভুক্ত। একটি গণতান্ত্রিক দেশে আদর্শ ও মতের পার্থক্য থাকিবেই। কিন্তু কেন তাহারা পরস্পর মুখোমুখি অবস্থানে উপনীত হইয়াছেন তাহা গভীর চিন্তার বিষয়।
প্রথমত বাংলাদেশে রাষ্ট্রীয় স্তম্ভ ও গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলি শক্তিশালী না হওয়ায় এই হতাশাজনক পরিস্থিতির সৃষ্টি হইয়াছে। দ্বিতীয়ত আইনের শাসনের অভাবে জাতি ও মতাদর্শগত ভেদাভেদ রেখাগুলি বড় হইয়া উঠিয়াছে। ‘আমরা বলি, নানা মুনির নানা মত’। প্রতিটি সমাজে প্রত্যেকের চিন্তা-ভাবনার মধ্যে কোন না কোনভাবে মতের অমিল থাকেই। আল্লাহতায়ালা মানুষকে সৃষ্টিই করিয়াছেন এইভাবে। আকার-আকৃতি, চলন-বলন ও ভাবনায় প্রত্যেকেই আলাদা। কিন্তু যখন সকলে একই আইনের প্রতি শ্রদ্ধাশীল থাকে, সকলের জন্য আইন সমভাবে প্রযোজ্য হয়, তখন সামান্য মতপার্থক্যগুলি আর বড় হইয়া দেখা যায় না। বিভেদরেখাগুলি বলিতে গেলে অস্পষ্ট থাকে। একটি সাধারণ ঐক্য তখন এমনিতেই প্রতিষ্ঠিত হইয়া যায়।
কিন্তু আমরা আইন প্রণয়ন ও বাস্তবায়নে কখনো নির্মোহ হইতে পারিতেছি না। সকলের কথা চিন্তা করিতে পারিতেছি না। সংবিধান অনুযায়ী শপথ গ্রহণ করিয়াও কাহারও প্রতি উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে অনুরাগ বা বিরাগভাজনের স্বাক্ষর রাখিতেছি। প্রকৃতপক্ষে ইহাই প্রধান সমস্যা। এই সংকীর্ণতার কারণে আমাদের জাতীয় স্বার্থ উপেক্ষিত হইতেছে। অন্যের অ্যাসাইনমেন্ট ও এজেন্ডাকে প্রাধান্য দিতে গিয়া নিজেদের এজেন্ডা ও অ্যাসাইনমেন্ট গড়াগড়ি খাইতেছে ও জলাঞ্জলি দিতে হইতেছে, যাহা খুবই দুঃখজনক। আর এভাবেই আমাদের মধ্যে বিভক্তি বাড়িতেছে। অশান্তি বাড়িতেছে। গণতন্ত্র ও আইনের শাসন যথার্থভাবে কায়েম ছাড়া আমাদের এই সংকট হইতে উত্তরণের আর কোন উপায় নাই।
