জাল সনদ প্রসঙ্গে

আপডেট : ১০ মার্চ ২০১৩, ২১:৩১
গত বুধবার দৈনিক ইত্তেফাকে প্রকাশিত একটি সংবাদ পাঠকদের দৃষ্টি না কাড়িয়া পারে নাই। কেননা, খবরটিতে শিক্ষা সনদ জালের যে অভিযোগ উঠিয়াছে উহাতে যে কেহই বিচলিত বোধ না করিয়া পারিবেন না। খবরটিতে বলা হইয়াছে, শিক্ষাগত যোগ্যতার সার্টিফিকেট জাল হওয়ার কারণে মাধ্যমিক স্তরে বিভিন্ন বিদ্যালয়ে নিয়োগ লাভকারী পাঁচ হাজার দুইশত আশি জন সহকারী গ্রন্থাগারিকের নিয়োগের বৈধতা লইয়া প্রশ্ন উঠিয়াছে। শুধু প্রশ্নই ওঠে নাই, এইসব সনদের মধ্যে মাত্র ১২১টি বৈধ বলিয়া প্রমাণিত হইয়াছে। অর্থাত্, ৫২৮০টি সনদের বলিতে গেলে সবগুলিই জাল। ইহার ফলে স্বাভাবিকভাবেই সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ জাল সনদধারীদের বেতন-ভাতা বন্ধ করিয়া দিয়াছে। উল্লেখ্য, বিগত কয়েক বত্সর যাবত্ দেশের ৫ হাজার ৪০১টি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের প্রতিটিতে একজন করিয়া সহকারী শিক্ষকের পদমর্যাদায় সহকারী গ্রন্থাগারিক নিয়োগ দেওয়া হয়। চাকুরি লাভের বা বেতন-ভাতা পাইবার জন্য আবেদনকারীদের সকলেই নিয়ম অনুযায়ী গ্রন্থাগার বিজ্ঞানের সংশ্লিষ্ট কোর্সের সনদ জমা দেয়। এই সকল সনদের ৭১৬টি জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের এবং ৪ হাজার ৬৮৫টি দারুল ইহসান বিশ্ববিদ্যালয়ের। এখন এই জাল সনদের কারণে পাঁচ সহস্রাধিক কর্মচারী বা সহকারী গ্রন্থাগারিকের বেতন-ভাতা বন্ধ, অর্থাত্ এই বিপুল সংখ্যক ব্যক্তি এবং তাহাদের পরিবার-পরিজনেরা নিদারুণ আর্থিক সংকটে পতিত হইয়াছেন। এ জন্য দায়ী কে? এই প্রশ্নটি নিশ্চয়ই এ ক্ষেত্রে অবান্তর নহে। কেননা, চাকুরি পাইবার জন্য আবেদনকারীরা মরিয়া হইয়া সনদ সংগ্রহ করিয়াছে আর জাল সনদ পাইবার জন্য তাহাদেরকে উল্লেখিত দুইটি বিশ্ববিদ্যালয়ের সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদেরকে ‘খুশী’ যে করিতে হইয়াছে সে কথা তো বলাই বাহুল্য। আবার চাকুরি লাভের জন্য কোনো কোনো ক্ষেত্রে নিয়োগ কর্তৃপক্ষকেও ‘খুশী’ হয়তো করা হইয়া থাকিতে পারে। জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় ও দারুল ইহসান বিশ্ববিদ্যালয় কিরূপে জাল সার্টিফিকেট দিল? শিক্ষা সার্টিফিকেটও যদি মুড়িমুড়কীর ন্যায় কিনিতে পারা সম্ভব হয় তাহা হইলেতো দেশে ভরসা করিবার মতো আর কিছু থাকে না। বিশ্ববিদ্যালয়গুলি জাল সনদ প্রদানের বন্দোবস্ত রাখিয়াছে বলিয়াই তো চাকুরি প্রত্যাশীরা উহার সদ্ব্যবহার করিতেছে। জাল সনদ যদি না পাওয়া যাইতো তাহা হইলে নিশ্চয়ই উহা কাহারও হস্তগত হইতো না এবং ইহার ফলে চাকুরি লাভার্থে কাহারও পক্ষেই এই জাল সনদ দাখিল করিয়া নিয়োগ প্রাপ্তিও সম্ভব হইতো না। এই ক্ষেত্রে ইহাই হইতেছে একেবারেই সহজ হিসাব। সুতরাং অসাধু ব্যবস্থা বজায় রাখিয়া এবং মানুষের অসহায়ত্বের সুযোগ লইয়া যাহারা আজ এতগুলি লোককে বিপদের মুখে ঠেলিয়া দিয়াছে তাহাদেরকে সনাক্ত করাটাই এক্ষেত্রে অধিক জরুরি বৈ নয়! আর যাহারা বেতন-ভাতা পাইতেছিল এবং এক্ষণে অবৈধ সনদ দাখিলের কারণে যাহাদের বেতন-ভাতা বন্ধ করিয়া দেওয়া হইয়াছে তাহারাও অপরাধ করিয়াছে ইহাতে সন্দেহ কী! কিন্তু যে চক্রটি ইহাদের কাঁধে বন্দুক রাখিয়া দুষ্কর্ম চালাইয়া গিয়াছে তাহারা অনেক বড় অপরাধী। গুরু পাপ করিয়াও ইহারা বাঁচিয়া গেলেও লঘু পাপে ঐ সহকারী গ্রন্থগারিকেরা আজ বিপদাপন্ন। এমতাবস্থায় ইহাদের বিষয়টি মানবিক দৃষ্টিকোণ হইতে বিবেচনা পাইবার কিছু দাবি রাখে বৈ কি! আরেকটি বিষয় শিক্ষায়তনে পাঠাগার কালচার পুনরায় এবং অত্যন্ত বলিষ্ঠভাবে চালু করা অত্যাবশ্যক। এক্ষেত্রে কোন প্রকার গড়িমসি করা চলিতে পারে না আর সে ক্ষেত্রেও ঐ সহকারী গ্রন্থাগিরকদের প্রয়োজন তাই অস্বীকার করা যাইবে না।

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন