পরিবেশ বলতে বোঝায় বুড়িগঙ্গা শুকিয়ে না যাওয়া, ময়লায় পার্শ্ববর্তী এলাকা দুর্গন্ধযুক্ত না হওয়া। পরিবেশ বলতে বোঝায় সাধারণ বৃষ্টিতেই শহরের সব ময়লা উপচে না পড়া। পরিবেশ বলতে বোঝায় রাস্তায় হাঁটার সময় মাস্ক না পরা কিংবা হাঁটার সময় বাতাসে বেড়ানো ধূলো-বালি হাত দিয়ে সরিয়ে না দেয়া অথবা নিজেকে ধূলোয় ধূসরিত না করা। পরিবেশ বলতে আরো বোঝায় রাস্তায় অযত্নে পড়ে থাকা ময়লা- রাস্তায় বিছিয়ে-বিছিয়ে কাকদের প্রতিযোগিতাপূর্ণ অন্ন ভোজন না করা। পরিবেশ বলতে বোঝায় একটি গাছ কাটলে কমপক্ষে একটি গাছ লাগানো। আরও কত কি!
সাম্প্রতিককালে বিশ্বব্যাপী প্রাকৃতিক পরিবেশের ক্রমাবনতির ফলে সব ধরনের প্রাণের অস্তিত্ব এবং মানব সভ্যতার উন্নয়নে একটি মারাত্মক সমস্যা হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে। বাংলাদেশের জন্য পরিবেশের সমস্যা নতুন কোনো সমস্যা নয়। ভৌগোলিক অবস্থান, বনজ সম্পদের পরিমাণ, মাটির প্রকৃতি, আবহাওয়ার তাপমাত্রা, আর্থ-সামাজিক অবস্থা, জনসংখ্যায় শিক্ষার হার, শিল্পায়ন ও সামগ্রিক উন্নয়নের মাত্রা ইত্যাদির উপর বাংলাদেশের পরিবেশ নির্ভরশীল। নানাবিধ কারণে আমাদের পরিবেশ বিনষ্ট হয়। এর মধ্যে রয়েছে- বিশাল জনসংখ্যা, বৃক্ষ নিধন এবং এর ফলে সৃষ্ট মরুময়তা, জনসচেতনতার অভাব, আবর্জনা, যানবাহনের কালো ধোঁয়া, জ্বালানির অভাব, নদী ভাঙন, বদ্ধ জলাশয়, ইট ভাটার ধোঁয়া ও ধূলো, নানা প্রাকৃতিক বিপর্যয় যেমন -বন্যা, ঘূর্ণিঝড় ও অনাবৃষ্টি, মানব সৃষ্ট প্রাকৃতিক বিপর্যয় যেমন- ফারাক্কা বাঁধ, রাসায়নিক সার ও কীটনাশক ব্যবহার, চিংড়ি চাষ, ম্যানগ্রোভ বনরাজির অবক্ষয়, গ্রীণ হাউজ এবং যথেচ্ছ পরিমাণ কার্বন নিঃসরণ।
পৃথিবীর সবচেয়ে জনবহুল দেশের মধ্যে বাংলাদেশ একটি। কিন্তু ন্যূনতম প্রয়োজনের তুলনায় এর বনভূমির পরিমাণ অনেক কম এবং যা আছে অঞ্চলভেদে তার বন্টনও সমান নয়। দেশের বার্ষিক বন উজাড়ের পরিমাণ প্রায় ০.৫৫ শতাংশ। দারিদ্র্য,জনসংখ্যার ক্রমবৃদ্ধি এবং ভূমির ওপর মাত্রাতিরিক্ত চাপ—এই বন উজাড়কে আরো ত্বরান্বিত করেছে। এসব কারণে নানা মাত্রিক পরিবেশ সমস্যার সৃষ্টি হচ্ছে এবং প্রাকৃতিক দুর্যোগসহ বিভিন্ন কারণে অপরিমেয় ক্ষতির সম্মুখীন হচ্ছে আমাদের অর্থনীতি ও জনপদ। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান বর্ষপঞ্জিতে ১৯৮৫-৮৬ সালে দেশের মোট বনভূমির পরিমাণ দেখানো হয়েছে ১৩.৪১ শতাংশ। একই সময়ে করা অর্থনৈতিক জরিপে বনাঞ্চলের পরিমাণ দেখানো হয়েছে ৯.৩ শতাংশ। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান পকেট বই ১৯৯৬-এ বনভূমির পরিমাণ ১২.৯ শতাংশ দেখানো হয়েছে এবং বাংলাদেশ অর্থনৈতিক সমীক্ষা ২০০০-এ মোট বনভূমি ২৫ লক্ষ হেক্টর তথা ১৭ শতাংশ উল্লেখ করা হয়েছে। আমরা যদি এই পরিসংখ্যানই ধরে নেই তাহলে বন উজাড়ের হার অনুসারে বর্তমান অবস্থা সহজেই অনুমান করতে পারি। বন উজাড়ের বিভিন্ন কারণ রয়েছে যা এরকম- ক্রমবর্ধমান জনসংখ্যা, বনাঞ্চলে আবাসন, জ্বালানি সংগ্রহ, অনিয়ন্ত্রিত ও ধ্বংসাত্মক নগরায়ন ইত্যাদি। পরিবেশ দূষণ বলতে শুধু বন উজাড়কেই বোঝায় না বরং অন্য অনেক উপাদান রয়েছে যা পরিবেশকে নানা মাত্রায় দূষিত করছে যা পূর্বেই আমি উল্লেখ করেছি। পরিবেশ সুরক্ষায় আমাদেরসহ সরকারের যা করণীয় রয়েছে তা হলো- জাতীয় পরিবেশ নীতির সফল বাস্তবায়ন, অবকাঠামো নির্মাণের পূর্বে পরিবেশগত প্রভাব সম্পর্কে প্রাক-নিরূপণ(Environmental Impact Assessment), জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণ, পরিবেশ অধিদপ্তরের ক্ষমতায়ন, সমন্বিত ও সুপরিকল্পিত ভূমির ব্যবহার, শিক্ষার হার বৃদ্ধিকরণ, পরিকল্পিত নগরায়ন, বর্জ্য পরিশোধন ব্যবস্থা নিশ্চিতকরণ, নির্দিষ্ট শিল্প এলাকা নির্ধারণ, ইট ভাটায় কাঠের বিকল্প জ্বালানির ব্যবস্থা করা, ব্যাপকহারে বৃক্ষ রোপণ ও সংরক্ষণ, রাসায়নিক সার ও কীটনাশক ব্যবহার কমানো, বন্যা নিয়ন্ত্রণে পরিকল্পনা ও তার বাস্তবায়ন ,বর্জ্যে নিরাপদ অপসারণ, শিল্প-কারখানায় পরিবেশ শিক্ষা বাধ্যতামূলক করা, পরিবেশ সম্পর্কে সামাজিক আন্দোলন গড়ে তোলা। আমার মনে হয় গণমাধ্যমগুলো এ ব্যাপারে জনসচেতনতায় ব্যাপক ভুমিকা রাখতে পারে। কারণ অতীতের তুলনায় গণমাধ্যমের সংখ্যা যেমনিভাবে বাড়ছে, তেমনি মানুষের গণমাধ্যমের ওপর নির্ভরতার হারও বেড়েছে।
বর্তমান সরকার ক্ষমতায় আসার পর ‘এনফোর্সমেন্ট’ নামে এক নতুন মাত্রার দূষণ-বিরোধী অভিযান পরিচালনা করে যা সবার কাছে প্রশংসনীয় হয়েছে। আন্তর্জাতিকভাবে এটি পিপিপি ( Polluters Pay Principal) বা ইকো-ট্যাক্স নামে পরিচিত। এই অভিযানের ফলে ‘পরিবেশ অপরাধী’ বলে পরিচিত যারা, তারা অনেক সতর্ক হয়েছে পূর্বের তুলনায়। একই সাথে ক্ষতিপূরণের ব্যবস্থাও করা হয়েছে এবং এই ক্ষতিপূরণ ধার্য ও আদায়ের ক্ষমতা দেয়া হয়েছে পরিবেশ অধিদপ্তরের মহাপরিচালককে “বাংলাদেশ পরিবেশ সংরক্ষণ আইন -১৯৯৫” যা সংশোধন করা হয় ২০১০ সালে।
উন্নয়নশীল বিশ্বকে আজ এটি অনুধাবন করতে হবে যে, সাহায্য পাওয়াই বড় কোনো পাওয়া নয়। বরং এর পাশাপাশি বিশ্ব জনমত গড়ে তুলতে হবে এবং সমন্বিতভাবে কথিত উন্নত বিশ্ব সম্প্রদায়কে প্রবল চাপ প্রয়োগ করতে হবে। প্রয়োজনে সব ধরনের সাহায্য বা করুণা প্রত্যাখ্যান করতে হবে। আমার বিশ্বাস- উন্নয়নশীল বিশ্ব অতীত থেকে শিক্ষা নিয়ে “হাত-পাতা” স্বভাব থেকে দূরে সরে আসবে। সমস্বরে আওয়াজ তুলতে হবে - “করুণা নয়, কার্বন নিঃসরণ বন্ধ কর”।
লেখক : শিক্ষার্থী,
গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগ, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়, ঢাকা।
