বর্তমান সরকার রূপকল্প ২০২১ বাস্তবায়নে শিল্প উত্পাদন বাড়িয়ে জিডিপিতে এর অবদান বর্তমানে ৬.৫ শতাংশ হতে বৃদ্ধি করে ৭.৫ শতাংশে উন্নীতকরণ ও অদূর ভবিষ্যতে জিডিপি প্রবৃদ্ধি ডাবল ডিজিটে উন্নীতকরণ প্রয়োজন। বাংলাদেশের উত্তরোত্তর সাফল্য বিভিন্ন দেশি এবং বিদেশি বিশেষজ্ঞ এবং প্রতিষ্ঠান দ্বারা সমর্থিত হয়েছে। তবে দেখা যায়, কিছু কিছু ক্ষেত্রে সফলতা অর্জন সম্ভব হলেও কতিপয় ক্ষেত্রে ঋণাত্মক গতি লক্ষ্য করার মতো। ফরেন এক্সচেঞ্জ রিজার্ভ এর পরিমাণ বর্তমানে রেকর্ড ১৪ বিলিয়ন মার্কিন ডলারে এবং রেমিটেন্স প্রবাহের পরিমাণ জুন ২০১২ তে ১২.৮৪ বিলিয়ন মার্কিন ডলারে উন্নীত হয়েছে। অন্যদিকে মূলধনি যন্ত্রপাতি আমদানি প্রবৃদ্ধি ঋণাত্মক ২৮ শতাংশ এবং কাঁচামাল আমদানি প্রবৃদ্ধি ঋণাত্মক ১২ শতাংশ এবং রপ্তানি প্রবৃদ্ধি ২০১১-১২ অর্থবছরে এক অংকের কোঠায় (৫.৯ শতাংশ) নেমে আসার পাশাপাশি বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবাহ কমে যাওয়া অর্থনীতির জন্য আশংকার কারণ। পরিসংখ্যানে দেখা যায়, ২০১০-১১ অর্থবছরে বেসরকারি খাতে বিনিয়োগের পরিমাণ জিডিপির ১৯.৫ শতাংশ থেকে হ্রাস পেয়ে ২০১১-১২ অর্থবছরে ১৯.১ শতাংশে দাঁড়িয়েছে এবং সরকারি খাতে বিনিয়োগ একই সময়ে ৫.৬ শতাংশ থেকে বৃদ্ধি পেয়ে ৬.৩ শতাংশে দাঁড়িয়েছে।
বাংলাদেশ, চীন, ভারত ও মিয়ানমার এই চারটি দেশের সমন্বয়ে গঠিত বিসিআইএম আঞ্চলিক সহযোগিতা ফোরামে ভৌগোলিকভাবে মধ্যস্থানে অবস্থান করার কারণে বাংলাদেশ স্ট্রাটেজিক্যাল সুবিধাজনক অবস্থানে রয়েছে। পৃথিবীর মোট জনসংখ্যার প্রায় অর্ধেক এ অঞ্চলে বাস করার কারণে বাংলাদেশের অর্থনীতি বিসিআইএম ভুক্ত ২.৭ বিলিয়ন জনবহুল বাজারে প্রভাব বিস্তারের সুযোগ তৈরি হয়েছে। এই সুবিধাজনক অবস্থাকে কিভাবে কাজে লাগিয়ে আমাদের ব্যবসা ও বাণিজ্যকে আরও সমৃদ্ধ করা যায় সে ব্যাপারে সরকারি ও বেসরকারি খাতের সম্মিলিত প্রয়াস প্রয়োজন।
ব্যবসা-বাণিজ্য ও বিনিয়োগ মূলত: দেশের স্থিতিশীলতার উপর নির্ভর করে। রাজনৈতিক পরিবেশ স্থিতিশীল না হলে বৈদেশিক বিনিয়োগ আসবে না, দেশীয় বিনিয়োগ উল্লেখযোগ্যভাবে হ্রাস পাবে এবং নতুন উদ্যোক্তা তৈরি হবে না। অতি সম্প্রতি সারাদেশের রাজনৈতিক অস্থিরতা ও সহিংসতায় ব্যবসায়ী মহল চরম বিভ্রান্তি ও বিব্রতকর অবস্থায় রয়েছে। গত কিছু দিন যাবত্ হরতাল এবং রাজপথে রাজনৈতিক কর্মসূচির ফলে বিভিন্ন ব্যবসা প্রতিষ্ঠান, ধর্মীয় পবিত্র স্থান এবং যাত্রী ও পণ্যবাহী পরিবহনে অগ্নিসংযোগ ও ভাংচুরের মতো ঘটনার মধ্যদিয়ে দেশ গভীর সংকটের মধ্যদিয়ে ধাবিত হচ্ছে। এ ধরনের সহিংস এবং সাংঘর্ষিক রাজনীতি ব্যবসা-বাণিজ্য ও দেশের উন্নয়নকে ব্যাপক হুমকির মুখে ঠেলে দেবে বলে আমি মনে করি। যে মুহূর্তে ব্যবসায়ী সমাজ বাংলাদেশের অপার সম্ভাবনা এবং সুযোগকে কাজে লাগিয়ে ব্যবসা-বাণিজ্য উন্নয়নের জন্য বিভিন্ন উদ্যোগ গ্রহণ করতে যাচ্ছে এবং বিদেশি বিনিয়োগকারীরা বাংলাদেশে বিনিয়োগ ও ব্যবসা-বাণিজ্য সম্প্রসারণে প্রস্তুতি নিচ্ছে, সে মুহূর্তে রাজনৈতিক দল কর্তৃক সৃষ্ট বিরাজমান রাজনৈতিক সংকটের কারণে এ সুযোগ হাতছাড়া হয়ে যাবে। এ ধরনের রাজনৈতিক সহিংসতা চলমান থাকলে দেশ দ্রুত চরম সামাজিক ও অর্থনৈতিক বিপর্যয়ের পথে এগিয়ে যাবে। আমরা আশা করি, ব্যবসায়ী সমাজের উপলব্ধিসমূহ বিবেচনা করে বর্তমান সরকার তা নিরসনে উদ্যোগী হবে। হরতালের কারণে সামাজিক নিরাপত্তা হ্রাসের পাশাপাশি ভেঙ্গে পড়ছে দেশের পণ্য স্থানান্তর ও বাজারজাত প্রক্রিয়া। তাছাড়াও কানসাট বিদ্যুত্ কেন্দ্রসহ দেশের বিভিন্ন বিদ্যুত্ কেন্দ্রে উত্পাদন কমে যাওয়ায় কোল্ডস্টোরেজগুলোতে রক্ষিত পণ্য সামগ্রীর পচন সৃষ্টি হচ্ছে। যা অর্থনীতির জন্য অত্যন্ত ভয়াবহ নেতিবাচক সূচক তৈরি করবে। বৈশ্বিক মন্দার কবলে পড়েও বাংলাদেশ অনেকগুলো সূচকে ভারতের অবস্থানকে ছাড়িয়ে গেছে বলে সে দেশের রাষ্ট্রপতি প্রণব মুখার্জি ও অর্থনীতিবিদ অমর্ত্যসেন স্বীকার করেছেন। এই শুভ বাক্যের সদ্ব্যবহার করতে হলে রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা দরকার। সরকার তার উদার মন নিয়ে রাজনৈতিক সংকট সমাধানে আলোচনা করার জন্য বিরোধী দলকে আহবান করতে হবে। ঠিক একই মনন ও মেধায় বিরোধীদলকে যুক্তিসংগত দাবি আদায়ের মধ্যদিয়ে অর্থনৈতিক উন্নয়নের গতিকে বেগবান করতে হবে। কি সরকার কি বিরোধী দল অথবা ধর্মীয় মূল্যবোধের সকল পক্ষকে দেশের কল্যাণ ও অর্থনীতি উন্নয়নের চাকাগুলো চলার পথ করে দিতে হবে।
লেখক : প্রেসিডেন্ট, ঢাকা চেম্বার অব
কমার্স এণ্ড ইন্ডাষ্ট্রি
