উগো চ্যাভেজ বা হুগো শ্যাভেজ এখন বিগত। রেখে গেলেন দীর্ঘ এক ইতিহাস। তাঁর দেশ ভেনিজুয়েলা এখন যেখানে দাঁড়িয়ে, তার যা সম্পদ-সম্ভাবনা, তৈলাধার সব মিলিয়ে কি সেখানে থাকার কথা? পৃথিবীর ষষ্ঠ তৈল উত্পাদনকারী দেশ, জনসংখ্যা সম্পদ মিলিয়ে ভেনিজুয়েলার অবস্থান আরো মজবুত হতে পারতো। কেন হয়নি সে তর্কে না গিয়ে আমরা বরং হুগো শ্যাভেজের বর্ণাঢ্য জীবনের দিকে তাকাতে পারি, যেখানে আমাদের দেশের নেতাদের জন্য আছে অনেক উপাদান, তাঁদের কাছে শিক্ষণীয় এই চরিত্র আন্তর্জাতিক অঙ্গনে যতই বিতর্কিত হোক না কেন, স্বদেশ ও দেশের মানুষের কাছে তিনি ছিলেন নন্দিত এক মহানায়ক। কেমন মহানায়ক? যাঁর নিজের ভাষায় একদিন তিনি স্বপ্ন ভেঙ্গে দেখেন তাঁর প্রহরীরা বদলে গেছে। সেই অচেনা প্রহরীরা তাঁকে নিয়ে গেছিল অচেনা এক জায়গায়, হুকুম হল পেছন ফিরে না তাকিয়ে হেঁটে যেতে। হুগো বুঝলেন ফায়ারিং স্কোয়াড্, মৃত্যু নিশ্চিত, তাঁর ভাষায় এই কি জীবনের উপহার? জাতির জন্য সংগ্রাম ও সর্বস্ব বিলিয়ে দেয়ার পুরস্কার? কিন্তু গুলি হল না, শব্দ নেই, উল্টো হুগো ঘুরে দেখেন প্রহরীদের ভেতর চলছে তুমুল ঝগড়া, এক দল অন্য দলকে বলছে প্রেসিডেন্টকে গুলি করলে আমরা তোদের খুলি উড়িয়ে দেব। সে বচসা থেকে হেলিকপ্টার যোগে উড়ে যাওয়া হুগো ভেবেছিলেন, এই বোধকরি শেষ যাত্রা, চিরকাল খেপিয়ে তোলা পৃথিবীর শক্তিধর দেশগুলোর কোথাও নিয়ে যাওয়া হচ্ছে তাঁকে। কিন্তু হেলিকপ্টার এসে থামলো তাঁর প্রাসাদের উঠোনে, যেখানে হাজার হাজার ভেনিজুয়েলাবাসী অধীর আগ্রহে অপেক্ষায়। শ্লোগানে চিত্কারে জানিয়ে দিচ্ছিল ‘এটা তোমার জন্য হে হুগো, হে প্রেসিডেন্ট” সেই যে ঢুকলেন আর বের হতে হয়নি তাঁকে। চিরবিদায়ের অন্তিম মুহূর্ত পর্যন্ত সেখানেই ছিলেন ভেনিজুয়েলার নয়নের মণি হুগো শ্যাভেজ। কিন্তু সবটাই উজ্জ্বল আর অম্লান থাকে না চিরদিন। দেশের মানুষের অকৃত্রিম ভালোবাসা আর সমর্থন-সিক্ত হতে হতে শ্যাভেজের চরিত্রেও কিন্তু পরিবর্তন এসেছিল। যতটা তাঁর নিজের কারণে ততটাই আন্তর্জাতিক দৃষ্টিকোণে পরিবর্তনজনিত বাস্তবতায়। আমাদের দেশের স্বপ্নদ্রষ্টা মহীরুহ নেতা বঙ্গবন্ধুর বেলায়ও আমরা সে বিষয়টি প্রত্যক্ষ করি। উন্নয়নশীল দেশের রাষ্ট্র বা সরকার প্রধানদের সামনে থাকে নানাবিধ চ্যালেঞ্জ, তাঁদের বেছে নিতে হয় যে কোন একটি পথ, যে কোন একটি পক্ষ, শ্যাভেজও নিয়েছিলেন, ক্রমাগত যুক্তরাষ্ট্র বিরোধিতা আর পরাশক্তি নামে পরিচিত মুরুব্বীদের কাছ থেকে দূরে সরে গিয়েছিলেন তিনি।
স্বাভাবিকভাবইে তাঁর সখ্যতা গড়ে উঠেছিল ফিদেল ক্যাস্ট্রোর দেশ কিউবা, আহমেদ জানীর ইরান বা এ জাতীয় দেশগুলোর সাথে। মিশ্র অর্থনীতির ভারতের সাথেও বন্ধুত্ব ছিল তাঁর। কলকাতাও ঘুরে গেছেন। পৃথিবীর দু’ভাগের এক ভাগ তাঁকে লুফে নিয়েছিল। স্বভাবসুলভ রসিকতা আর নিয়ম ভাঙ্গার কারণে আমাদের মত দেশগুলোর সাধারণ নিরীহ মানুষের মধ্যে অসম্ভব জনপ্রিয়তা গড়ে উঠেছিল তাঁর। চীন দেশে নিরাপত্তা ব্যুহ ভেদ করে জনগণের কাছে চলে গিয়েছেন তিনি। ইচ্ছেমত ঘুরে বেড়িয়ে প্রহরীদের মিত্র করে তুলেছেন। চীনের প্রাচীর ডিঙ্গিয়েছেন পদব্রজে, তাও ইচ্ছামত। আবার এই মানুষটিই নির্বাচনের ফলাফল নিয়ে দেশের বিরোধী দলের কুমন্তব্যের ফাঁদে পড়েছেন। উঠেছে একনায়কত্বের কঠিন অভিযোগ।
প্রয়াত শ্যাভেজ আর যাই করেন, ভেনিজুয়েলার প্রতি মমত্ব ও প্রেমে ছিলেন একেবারে নিখাদ ও খাঁটি। কিন্তু ইংরেজিতে বলে অতিরিক্ত দেশপ্রেমও এক ধরনের বাড়াবাড়ি। ভেনিজুয়েলা চাইলেই গণতান্ত্রিক মূল্যবোধে থাকতে পারতো, ইউরোপ-আমেরিকার জনগণ ও উন্নতির সাথে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে চলতে পারতো। সেটা হয়নি, অধিকন্তু তাকে অপবাদ সইতে হয়েছে। দেশকেও রেখে গিয়েছেন এক ধরনের অনিশ্চিত ভবিষ্যত্ নেতৃত্বের হাতে। আমাদের দেশের এক ধরনের বুদ্ধিবৃত্তি ও বামরা যুক্তিতর্ক বা বাস্তবতার ধার না ধেরেই একপেশে ভালোবাসা বা প্রেমে মজে যান। যেমনটি দেখেছি নেপালের বেলায়, সে দেশের পাহাড়-জঙ্গলে যুদ্ধরত মাওবাদীদেরও সমর্থন করতে বাধেনি তাদের। এরা কোন বিষয় বা কোন মানুষকে নির্মোহভাবে দেখতে চায় না। অথচ শান্তি ও স্থিতির লক্ষ্যে বিশ্বায়নের এই কালে গণতন্ত্রের বিকল্প নেই। আমরা যুক্তরাষ্ট্র বলতে জর্জ বুশ আর ওবামাকে বুঝলেও ভুল হবে। এই দেশটির গণতান্ত্রিক ধারা উন্নয়ন, মানব জাতির কল্যাণে অবদানের কথাও স্মরণে রাখতে হবে। মনে রাখা প্রয়োজন ইউরোপ বা পাশ্চাত্যই আধুনিক পৃথিবীর সূতিকাগার। সে জায়গাটিতে গো ধরে নিজেকে বিচ্ছিন্ন রাখলে আলবেনিয়া হবার বিকল্প থাকে না। একদা এই দেশটি একা হতে হতে ইউরোপের সবচে গরীব দেশের তকমাও পেয়ে গিয়েছিল। শ্যাভেজের দেশ তেল ও অন্যান্য সম্পদের কারণে ঐ জায়গায় যায়নি। তাছাড়া হুগো শ্যাভেজ এর চরিত্রেও ছিল আকর্ষণ আর মুগ্ধ করার ক্ষমতা। সবচে বড় কথা তিনি দেশটকে শান্ত ও ঝঞ্ঝাহীন রেখেছিলেন। যে শিক্ষা আমাদের রাজনীতির জন্য অত্যন্ত জরুরি।
(সিডনি থেকে)
[email protected]
