গুরুত্বপূর্ণ সেতু ও সড়কের নিরাপত্তা

আপডেট : ১২ মার্চ ২০১৩, ২১:১৭
বঙ্গবন্ধু সেতুর নিরাপত্তার জন্য সেতুটির পূর্ব ও পশ্চিম পাড়ে মোট ১২টি ক্লোজসার্কিট (সিসি) ক্যামেরা স্থাপন করা হইয়াছিল। তন্মধ্যে ১০টি ক্যামেরাই নষ্ট। সেতুর উপরে স্থাপিত ৪টি ক্যামেরার মধ্যে ২টি ক্যামেরাও বিকল হইয়া আছে। ফলে মাত্র ২টি ক্যামেরা দিয়াই চলিতেছে দেশের সর্বাপেক্ষা গুরুত্বপূর্ণ এই সেতুটির নিরাপত্তার কাজ। অত্যন্ত উদ্বেগজনক এই খবরটি প্রকাশিত হইয়াছে গত সোমবারের ইত্তেফাকে। প্রতিবেদনে বলা হইয়াছে যে, এই অবস্থা চলিয়া আসিতেছে দীর্ঘদিন যাবত্। কিন্তু নষ্ট ক্যামেরাসমূহ মেরামতের কোনো উদ্যোগ নাই। কেন নাই তাহা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষই ভালো বলিতে পারিবেন। শুধু তাহাই নহে, সেতুর পূর্ব পাড়ে ওজন স্টেশনে স্থাপিত দুইটি সিসি ক্যামেরা চুরি হইয়া গিয়াছে গত ফেব্রুয়ারি মাসে। সংরক্ষিত এলাকার ভিতরে কিভাবে এমন একটি ঘটনা ঘটিতে পারিল তাহা আমরা বুঝিতে অক্ষম। মজার ব্যাপার হইল, ঘটনার প্রায় একমাস পর ক্যামেরা চুরির অভিযোগে বঙ্গবন্ধু সেতুর দুই কর্মচারীকে গ্রেফতার করিয়াছে পুলিশ। তাহাদের নিকট হইতে গুরুত্বপূর্ণ কিছু তথ্যও নাকি পাওয়া গিয়াছে, যদিও সেই তথ্য আদৌ আলোর মুখ দেখিবে কিনা বলা মুশকিল। তবে নিরাপত্তাজনিত সমস্যার অন্তর্নিহিত রহস্য অনুধাবন করিবার জন্য এই উদাহরণই যথেষ্ট বলিয়া আমরা মনে করি। দেশের অতি গুরুত্বপূর্ণ সেতুর নিরাপত্তার ব্যাপারে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের এই উদাসীনতা বা নির্লিপ্ততার বিষয়টি বিস্ময়কর হইলেও ইহা যে সারা দেশের বাস্তবতা হইতে বিচ্ছিন্ন কিছু নহে—তাহা বলার অপেক্ষা রাখে না। বস্তুত দেশের কোনো সেতু, উড়াল সড়ক কিংবা মহাসড়কই যে এখন নিরাপদ নহে—তাহা অস্বীকার করিবার উপায় নাই। প্রসঙ্গত উল্লেখ্য যে, রাজধানী ঢাকার মহাখালী, খিলগাঁও ও বিজয় সরণি-সংলগ্ন উড়াল সড়কের উপর দিয়া বাস-ট্রাক ও কাভার্ড ভ্যানসহ ভারি যানবাহন চলাচলে নিষেধাজ্ঞা রহিয়াছে। কিন্তু কেহই তাহার তোয়াক্কা করিতেছে না। আগে রাত্রির অন্ধকারে ভারি যানবাহন চলিত। এখন দিনেও চলে। মাঝখানে উড়াল সড়কের প্রবেশপথে বাঁশ বাঁধিয়া ভারি যানবাহন আটকাইবার একটি হাস্যকর উদ্যোগ নেওয়া হইয়াছিল। সেই বাঁশের বাধাও উধাও হইয়া গিয়াছে বহু আগেই। ফলও পাওয়া গিয়াছে তাত্ক্ষণিকভাবে। নির্মাণের কয়েক বত্সরের মধ্যেই চলাচলের অনুপযোগী হইয়া পড়িয়াছে খিলগাঁও ফ্লাইওভারটি। ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের গুরুত্বপূর্ণ মেঘনা ও দাউদকান্দি সেতুর চিত্রও ভিন্ন নহে। সেতু দুইটির বর্তমান বিপন্নদশার জন্য যে প্রধানত মাত্রাতিরিক্ত মালামাল বোঝাই যানবাহনই দায়ী—তাহা কাহারো অজানা নহে। দেশের প্রায় সর্বত্রই সড়ক, মহাসড়ক ও সেতুর উপর দিয়া নির্ধারিত সীমার কয়েকগুণ বেশি ভারি যানবাহন অবাধে চলাচল করিতেছে। বহু স্থানে ওজন নিয়ন্ত্রক যন্ত্র আছে। আছে হাইওয়ে পুলিশ এবং সেতু রক্ষণাবেক্ষণকারী কর্তৃপক্ষ। কিন্তু সবই বজ্র আঁটুনি ফস্কা গেরো মাত্র। দেখা যায়, যেই কারণে বঙ্গবন্ধু সেতুর ওজন স্টেশনের সিসি ক্যামেরা চুরি হইয়া যায়, একই কারণে বিকল হইয়া যায় বেশিরভাগ ওজন নিয়ন্ত্রক যন্ত্র। আর সচল থাকিলেই বা কী! সরিষার মধ্যে যদি ভূত থাকে সেই ভূত তাড়াইবে কে? দুর্ভাগ্যজনক হইলেও সত্য যে, স্বাধীনতাপরবর্তী গত চার দশকেও দেশের গুরুত্বপূর্ণ সেতু, উড়াল সড়ক ও মহাসড়কের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার মতো নির্ভরযোগ্য কোনো সিস্টেম বা ব্যবস্থা গড়িয়া তোলা সম্ভব হয় নাই। ফলে প্রায় প্রতিটি ক্ষেত্রে রক্ষকই পরিণত হইয়াছে ভক্ষকে। নিরাপত্তা বিধানের নামে চলিতেছে লুটপাট। আর তাহার দায় বহন করিতে হইতেছে দরিদ্র দেশের দরিদ্র জনগণকে। সকলেরই মনে রাখা দরকার যে, আমাদের সম্পদের সীমাবদ্ধতা আছে। আমরা ইচ্ছা করিলেই যে বঙ্গবন্ধু সেতুর মতো অবকাঠামো নির্মাণ করিতে পারি না তাহা বুঝিবার জন্য বিশেষজ্ঞ হইবার প্রয়োজন নাই। ক্ষতিগ্রস্ত সড়ক-মহাসড়কগুলি সংস্কার করিতেও যেইখানে সরকারকে হিমশিম খাইতে হয়, সেইখানে জাতীয় সম্পদের এই অপচয়, এই যথেচ্ছাচার কোনোভাবেই মানিয়া লওয়া যায় না। কিন্তু বিড়ালের গলায় ঘন্টা বাঁধিবে কে?

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন