ইন্টারনেট যেভাবে বদলে দিচ্ছে বিশ্বকে

আপডেট : ১২ মার্চ ২০১৩, ২১:৩০
তথ্যপ্রযুক্তির প্রসার এবং প্রতিটি ক্ষেত্রেই এর সংশ্লিষ্টতা আর নতুন কিছু নয়। বরং উন্নত দেশগুলো থেকে শুরু করে উন্নয়নশীল বা অনুন্নত দেশগুলোতেও মানুষ জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে তথ্যপ্রযুক্তিকে একীভূত করে নিয়েছে। একবিংশ শতাব্দীর এই বিশ্ব যে অবস্থানে আজ দাঁড়িয়ে রয়েছে, সেখানে তথ্যপ্রযুক্তিকে পাশ কাটিয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই। আরও স্পষ্ট করে বললে বিশেষভাবে কম্পিউটার আর ইন্টারনেটকে ছাড়া আজকের এই বিশ্ব বাস্তবতা কোনোভাবেই উপলব্ধি করা সম্ভব নয়। নব্বইয়ের দশকের শুরুতেই ইন্টারনেটের আগমন ঘটলেও এর বিশ্ববাস্তবতার অপরিহার্য অঙ্গ হয়ে ওঠা আরও পরের কথা। চলতি শতকের গোড়া থেকে কম্পিউটার ছাড়িয়ে পড়তে থাকে ঘরে ঘরে। আরও পরে বাজারে আসে স্মার্টফোন। গত দুয়েক বছরে সেই স্থানটিতে ট্যাবলেট পিসিও শক্ত অবস্থান গড়ে তুলেছে। কম্পিউটিং ডিভাইসগুলো এভাবে মানুষের হাতে হাতে পৌঁছে যাওয়ার সাথে সাথেই পৌঁছে গেছে ইন্টারনেট সংযোগ। আমাদের বাংলাদেশেও ব্রডব্যান্ড ইন্টারনেট সংযোগের খরচ ক্রমান্বয়ে কমতে থাকায় রাজধানী ঢাকার বাইরেও বড় বড় শহরগুলোতে ছড়িয়ে পড়তে থাকে ইন্টারনেট। মোবাইল ইন্টারনেট এই স্রোতে যুক্ত করতে থাকে প্রায় সব ধরনের মানুষকেই। ঠিক একই রকম চিত্র দেখা যায় বিশ্বজুড়েই। তারই ফলশ্রুতিতে বিশ্ব রাজনীতি অর্থনীতি, ক্ষমতা, সামাজিক পরিবর্তন—এক কথা সব কিছুরই অন্যতম নিয়ামক অবস্থানে পৌঁছে যায় ইন্টারনেট। পৃথিবীর চেহারাটা বদলে দিতে এখনও প্রতিনিয়ত কাজ করে যাচ্ছে এই ইন্টারনেট। ইন্টারনেট :বিশ্ব বদলের হাতিয়ার একদিকে হ্যাকার দল, অন্যদিকে অনলাইন বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে অনলাইন ক্লাসরুম—দুইটি চিত্র ইন্টারনেটের ব্যবহারের বিস্তৃতি ফুটিয়ে তুলছে। একদিকে আবার রয়েছে উইকিলিকস কর্তৃক ফাঁস করে দেওয়া গোপন সব নথিপত্র, অন্যদিকে রয়েছে সামাজিক যোগাযোগগুলোর মাধ্যমে গড়ে ওঠা আন্দোলন, যা মধ্যপ্রাচ্যে সূচনা করেছে আরব বসন্তের। সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যমগুলোর শক্তি উপলব্ধি করেই মিশরে সরকার ইন্টারনেট বন্ধ করে দিলেও সাধারণ মোবাইল এসএমএস-এর মাধ্যমে চালু থাকে টুইটার, ফেসবুকের সেবা। এদিকে ফেসবুক পেরিয়ে যায় ১০০ কোটি ব্যবহারকারীর ল্যান্ডমার্ক। ইন্সটাগ্রামের মতো অ্যাপ্লিকেশনও লাভ করে তুমুল জনপ্রিয়তা। দেখতে দেখতে বিশ্বব্যাপী ইন্টারনেটের ব্যবহারকারীর সংখ্যা পেরিয়ে যায় ২০০ কোটি। ২০০০ সালের তুলনায় যা প্রায় সাড়ে ছয় গুণ। বিশ্বের প্রায় এক-তৃতীয়াংশ মানুষ এখন সেই হিসেবে সংযুক্ত ইন্টারনেটের সাথে। বিশ্ব বদলে দেওয়া ইন্টারনেটের কিছু ঘটনাবলীর বিশ্লেষণ তুলে ধরা হলো এখানে। বিশ্ব জনসংখ্যার এক-তৃতীয়াংশের বেশি ইন্টরনেট গ্লোবাল ভিলেজ বা বিশ্বায়নের ধারণা নতুন নয়। দীর্ঘদিন ধরেই এই শব্দগুলো ব্যবহার করে আসছি সবাই। তবে সত্যিকারের গ্লোবাল ভিলেজ বা বিশ্বগ্রাম বোধহয় বলা যায় ইন্টারনেটের ভার্চুয়াল জগতটাকেই। দেশ, জাতি, ধর্ম, বর্ণ, বয়স নির্বিশেষে ইন্টারনেটের ভার্চুয়াল প্ল্যাটফর্মে যুক্ত এখন বিশ্বের এক-তৃতীয়াংশেরও বেশি মানুষ। গত বছরের মাঝামাঝি সময়ে ইন্টারনেটের ব্যবহারকারীর সংখ্যা পেরিয়ে যায় ২০০ কোটি। এই সংখ্যা এখন প্রায় ২৫০ কোটি। ইন্টারনেটের ভার্চুয়াল প্ল্যাটফর্মকে একটি একক দেশ হিসেবে কল্পনা করলে এর জনসংখ্যা চীনেরও প্রায় দ্বিগুণ হয়। অন্যদিকে এরই মধ্যে আবার কেবল ফেসবুকেরই ব্যবহারকারীর সংখ্যা ১০০ কোটির উপরে। এই বিপুল পরিমাণ মানুষের উপস্থিতি ইন্টারনেটকে ক্রমেই আরও বেশি শক্তিশালী প্ল্যাটফর্মে পরিণত করছে। আমাদের দৈনন্দিন জীবন-যাপনের অপরিহার্য অংশেই পরিণত হচ্ছে ইন্টারনেট। যেকোনো সময় সর্বশেষ খবরের জন্য রয়েছে অনলাইন পত্রিকা, খবর ছড়িয়ে দিতে রয়েছে ফেসবুক, টুইটার। যেকোনো তথ্যের জন্য রয়েছে গুগল। কেনাকাটা করতেও ই-কমার্সে অভ্যস্ত হয়ে উঠছে বিশ্বব্যাপী মানুষেরা। শিক্ষার জন্যও রয়েছে ইন্টারনেট, স্বাস্থ্যের জন্যও রয়েছে ইন্টারনেট। সব মিলিয়ে ইন্টারনেট এখন জীবনের অন্যতম প্রধান অনুষঙ্গ। সামাজিক যোগাযোগের সাইট সামাজিক যোগাযোগের ওয়েবসাইটগুলোর কল্যাণে গোটা বিশ্ব এখন অনেক বেশি কাছাকাছি চলে এসেছে। ফেসবুক, টুইটার, ফ্লিকার, ইন্সটাগ্রাম, পিনটারেস্ট, টাম্বলার, সাউন্ড ক্লাউড আর ইউটিউবের কল্যাণে গোটা বিশ্ব এখন পরিণত হয়েছে শেয়ারিংয়ের স্থানে। বিশেষ করে তরুণদের মধ্যে এসব সামাজিক যোগাযোগের ওয়েবসাইট এবং সার্ভিস পেয়েছে অসামান্য জনপ্রিয়তা। যুক্তরাষ্ট্রের গবেষণা প্রতিষ্ঠান পিউ রিসার্চ জানাচ্ছে, তরুণদের বড় অংশটিই এখন অনলাইনে সাইট ও সেবার সাথে সম্পর্কযুক্ত। তারা জানাচ্ছে দুই-তৃতীয়ংাশেরও বেশি তরুণ-তরুণী ব্যবহার করছে ফেসবুক। মেয়েদের ১৮ থেকে ৬৫ বছর পর্যন্ত বয়সীদের মধ্যে এই জনপ্রিয়তায় খুব একটা কমতি নেই। একইসাথে ছবি শেয়ারিংয়ের জন্য ইন্সটাগ্রাম কিংবা মাইক্রোব্লগিংয়ের জন্য টুইটারের ব্যবহারও বেড়েই চলেছে। আরব বসন্ত মধ্য প্রাচ্যের দেশগুলোতে রাজনৈতিক পট পরিবর্তনের ফলে নতুন যে সামাজিক-রাজনৈতিক পরিস্থিতির উদ্ভব ঘটেছে, তাকেই বলা হচ্ছে আরব বসন্ত। দীর্ঘদিন ধরে মিশর, তিউনিসিয়ার মতো দেশগুলোতে ছিল একক রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব বা দলের শাষণ হতে যে গণআন্দোলন গড়ে ওঠে, তাই জন্ম দেয় আরব বসন্তের। তবে এই অভািবিত আন্দোলনের পেছনে অন্যতম চালিকা শক্তি ছিল সামাজিক যোগাযোগের ওয়েবসাইটগুলো। ফেসবুকের মতো প্ল্যাটফর্মই এসব আন্দোলন গড়ে উঠতে এবং বিস্তৃত করতে রেখেছে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা। এর ফলশ্রুতিতে বর্তমানেও সামাজিক যোগাযোগের সাইটগুলো মিশর, তিউনিসিয়ার অত্যন্ত জনপ্রিয়। এসব দেশে যারা সামাজিক যোগাযোগের ওয়েবসাইট ব্যবহার করে থাক,ে তাদের সিংহভাগ অনলাইনেই তাদের রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গি শেয়ার করতে অভ্যস্ত। মিশর বা তিউনিসিয়ায় আন্দোলন চলাকালে একাধিকবার সরকার কর্তৃক ইন্টারনেট থেকে দেশগুলোকে বিচ্ছিন্ন করা হলেও বিকল্প মাধ্যমগুলো ব্যবহার করে ইন্টারনেট সক্রিয় করে তারা। বিশ্বের অন্যান্য দেশগুলোতে অনলাইনে রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গি শেয়ার করার প্রবণতা যেখানে মাত্র ৩৪ শতাংশ, সেখানে মধ্যপ্রাচ্যের অন্যান্য ইস্যুতে এই প্রবণতা আরও বেশি প্রায় ৭০ শতাংশ। এই প্রবণতাই আরব বসন্ত সংগঠনে গরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে বলেই মন্তব্য ইন্টারনেট বিশেষজ্ঞ এবং সমাজবিজ্ঞানীদের। উইকিলিকস অনলাইন বিশ্বকে যে ওয়েবসাইটটি এক কথায় তোলপাড় সৃষ্টি করতে সক্ষম হয়, তার নাম উইকিলিকস। যুক্তরাষ্ট্র থেকে শুরু করে বিভিন্ন দেশের ‘টপ সিক্রেট’ সব নথিপত্র ফাঁস করে গোটা বিশ্বকেই নাড়িয়ে দেন উইকিলিকস প্রতিষ্ঠাতা জুলিয়ান অ্যাসাঞ্জ। বিভিন্ন দেশের রাষ্ট্রিয় গুরুত্বপূর্ণ ও গোপনীয় সব চুক্তির খবর এবং নথিপত্র হস্তগত করেন জুলিয়ান অ্যাসাঞ্জ ও তার সহযোগীরা। সাধারণ মানুষের এ সকল তথ্য জানার অধিকার রয়েছে বিবেচনা করেই এগুলো অনলাইনে প্রকাশিত করে দেয় অ্যাসাঞ্জবাহিনী। আর তাতে করেই নিজেদের গোপন তথ্য প্রকাশে শংকিত হয়ে পড়ে বিভিন্ন দেশের সরকার। এমনকি আর বসন্তের আন্দোলনের পেছনেও এসব ফাঁস হওয়া নথিপত্রের ভূমিকা রয়েছে। উইকিলিকসে ফাঁস হওয়া আড়াই লক্ষাধিক নথিপত্র বিশ্ব রাজনীতিক পটপরিবর্তনে ভূমিকা রেখেছে অনেকটা। বাংলাদেশ ও ইন্টারনেট বিশ্বের অন্যান্য দেশের সাথে তাল মিলিয়ে বাংলাদেশেও ইন্টারনেট ব্যবহারকারী যেমন বাড়ছে, তেমনি বাড়ছে ফেসবুকের ব্যবহারও। সোস্যাল বেকারস-এর তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে দেশে ৩২ লক্ষাধিক ফেসবুক ব্যবহকারী রয়েছে। সেই সাথে ব্লগও ব্যবহার করে থাকেন বিপুল পরিমাণ ইন্টারনেট ব্যবাহরকারী। সম্প্রতি যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের ইস্যুতে দেশব্যাপী যে আন্দোলন গড়ে উঠেছে, তাতেও রয়েছে ইন্টারনেটের বিশাল ভূমিকা। ফেসবুক এবং ব্লগগুলো এই আন্দোলন গড়ে উঠতে এবং একে ছড়িয়ে দিতে ভূমিকা রাখছে।