[ রা জ নী তি ]

গণহত্যা এবং জবাবদিহিতা

আপডেট : ১৩ মার্চ ২০১৩, ২০:৫২
অতি সম্প্রতি দেশে অসংখ্য মৃত্যু সম্পর্কে সাবেক প্রধানমন্ত্রী, সংসদে বিরোধী দলীয় নেতা বেগম খালেদা জিয়া যখন ‘গণহত্যা’ শব্দটি ব্যবহার করেন তখন তা নিয়ে ব্যাপক বিতর্কের সৃষ্টি হয়। তাই প্রথমেই দেখতে চাই আসলে গণহত্যা বলতে কি বোঝায়। গণহত্যা প্রত্যয়টির সূত্রপাত করেন ব্যাফেল ল্যামাকিন। তিনি গণহত্যা বলতে বোঝেন:‘নির্দিষ্ট কোনও জাতি, বর্ণ, ধর্ম, কুল অথবা রাজনৈতিক গোষ্ঠী অথবা দলের অন্তর্গত সর্বজনকে নিধন করার প্রয়াস।’ Marces T. Funk গণহত্যার সংজ্ঞা প্রদান করেন এভাবে; Genocide is ‘the deliberate and systematic destruction of, in whole or in part, of an ethnic, racial, religious, or national group.’ (Victims Rights and Advocacy at the International Criminal Court. Oxford, 2010, England: Oxford University Press.p.1)-এর লক্ষ্য হচ্ছে একদল জনগোষ্ঠী কর্তৃক অপর জনগোষ্ঠীকে সমূলে নির্মূল করা। ১৯৪৮ সালে জাতিসংঘ গৃহীত সর্বসম্মত সিদ্ধান্ত অনুযায়ী গণহত্যা (Genocide) আন্তর্জাতিক আইনে একটি বড় ধরনের অপরাধ বলে গণ্য করা হয়। এরই ধারাবাহিকতায় হিটলার কর্তৃক ইহুদি নির্মূল এবং অন্যান্য হত্যার জন্য ন্যুরেমবার্গ ট্রায়ালের আয়োজন করা হয়। পরবর্তীকালে পৃথিবীর যেকোন রাষ্ট্রে যেকোন সময় এ রকম গণহত্যা হয়ে থাকলে তার বিচার হয়ে আসছে। এই সময়ে বাংলাদেশে ব্যাপক সহিংসতা চলছে। বিগত সপ্তাহে নিহতের সংখ্যা সরকারি মতে ৬৭। আর বেসরকারি মতে ১৫৫। হত্যার উত্স ১৯৭১ সালে বাংলাদেশে গণহত্যার অভিযোগে অভিযুক্ত ব্যক্তিদের বিচার। বাংলাদেশের মানুষ দীর্ঘদিন ধরে গণহত্যাকারীদের বিচার দাবি করে আসছে। ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধের ৯ মাসে লক্ষ লক্ষ মানুষ মৃত্যুবরণ করে। ধর্ষিত হয় লক্ষ লক্ষ নারী। অগ্নিসংযোগ করা হয় লক্ষ গৃহে। লুটপাট করে লক্ষ লক্ষ বাড়িঘরে। পৃথিবীর ইতিহাসে এ ধরনের গণহত্যা আর কখনো ঘটেনি। এ হত্যাযজ্ঞের জন্য প্রথমত দায়ী পাকিস্তান সরকার অর্থাত্ ইয়াহিয়া এবং তার ক্যাবিনেট। দ্বিতীয়ত পূর্ব পাকিস্তানে স্থাপিত দালাল প্রাদেশিক সরকার, যার প্রধান ছিল আব্দুল মোত্তালিব মালেক নামের একজন সাবেক মুসলিম লীগার। তৃতীয়ত একশ্রেণির দালাল রাজনীতিক। ঐ সময় জামায়াতে ইসলামী, নেজামে ইসলাম, মুসলিম লীগ, পাকিস্তান ডেমোক্র্যাটিক লীগ (পিডিপি) গণবিরোধী ভূমিকা পালন করে। তারা স্বাধীনতার বিপক্ষে অবস্থান নেয়। মুক্তিযুদ্ধের বিরুদ্ধে নানা ধরনের প্রচারণা, সাংগঠনিক তত্পরতা এবং নানাবিধ কার্যকলাপে লিপ্ত হয়। এই তিন বেসামরিক স্তরের বাইরে মূল যুদ্ধ পরিচালনা বা গণহত্যার জন্য সরাসরি দু’টি বাহিনী— পাকিস্তান সেনাবাহিনী এবং এদেশীয় সাহায্যকারী বা স্বেচ্ছাসেবক বাহিনী রাজাকার, আলবদর, আলশামস ইত্যাদি ঘাতক বাহিনী। এসব স্বেচ্ছাসেবক দল তথাকথিত পূর্ব পাকিস্তান সরকারের প্রশাসনিক সহায়তায় দায়িত্ব পালন করে। লক্ষ প্রাণের বিনিময়ে যখন স্বাধীনতা অর্জিত হয় তখন যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের দাবি জোরালো হয়ে ওঠে। যুদ্ধ অপরাধের জন্য সকল পাকিস্তানি সৈন্যকে দায়ী করা হয় না। জেনেভা কনভেনশন অনুযায়ী যুদ্ধ পরিচালনারও কিছু নিয়ম আছে। যেমন:নারী-শিশুকে হত্যা করা যাবে না, হাসপাতালে আক্রমণ পরিচালনা করা যাবে না, মালের বা খাদ্যগুদাম ধ্বংস করা যাবে না ইত্যাদি। যেসব সৈন্য জেনেভা আইনের অগ্রাহ্য করে হত্যা, ধর্ষণ, অগ্নিসংযোগ, লুটপাট করেছে তাদের আইন আমলে আনার সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়। গঠিত তদন্ত কমিটির প্রতিবেদন অনুযায়ী ১৯৫ জন যুদ্ধাপরাধী চিহ্নিত করা হয়। কিন্তু ১৯৭৩ সালে ত্রিপক্ষীয় চুক্তি (ভারত, পাকিস্তান এবং বাংলাদেশ)-এর অধীনে বঙ্গবন্ধুর মহানুভবতায় তারা মুক্তি পায়। অপরাধী সহযোগী দালালদের বিচারের জন্য ১৯৭২ সালে দালাল আইন প্রণীত হয়। এ আইনের আওতায় অনেকে দণ্ডপ্রাপ্ত হয়। ১৯৭৩ যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশের জাতীয় পুনর্গঠন, জাতীয় ঐক্য এবং সমঝোতার স্বার্থে বঙ্গবন্ধু দালালদের প্রতি সাধারণ ক্ষমা ঘোষণা করেন। তবে, যেসব দালাল হত্যা, ধর্ষণ, অগ্নিসংযোগ করেছে তাদের তিনি ক্ষমা করেননি। ১৯৭৮ সালে প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান অধিকতর জাতীয় ঐক্যের প্রয়োজনে দালাল আইন প্রত্যাহার করেন। ১৯৭৫ সালে মধ্য-আগস্টের মর্মান্তিক ঘটনাবলীর পর রাষ্ট্রীয় কাঠামো এবং জাতীয় আদর্শের ক্ষেত্রে ব্যাপক পরিবর্তন সূচিত হয়। প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান সংখ্যাগরিষ্ঠ মুসলিম মানসের কথা চিন্তা করে ইসলাম ও মুসলমানদের অনুকূলে কতিপয় কার্যব্যবস্থা গ্রহণ করেন। প্রতিষ্ঠাকালীন সময়ের বড় একটা আদর্শ ধর্মনিরপেক্ষতা পরিত্যক্ত হয়। এতে ঐ আদর্শে বিশ্বাসী জনগোষ্ঠী বিশেষত শিক্ষিত, প্রগতিশীল, মুক্তমনা অংশ রুষ্ট হয়। তারা ঐ সংশোধনকে স্বাধীনতার চেতনার বিপরীত বলে অভিহিত করে। যাহোক, ১৯৯৬ সালে ২১ বছর পর ধর্মনিরপেক্ষতার ধারক এবং স্বাধীনতার চেতনার বাহক হিসেবে দাবিদার আওয়ামী লীগ ক্ষমতাসীন হওয়া পর্যন্ত ঐ বুদ্ধিজীবীদের অপেক্ষা করতে হয়। ঐ সময় পর্যন্ত সংখ্যাগরিষ্ঠতা না থাকায় আওয়ামী লীগ সাংবিধানিক পরিবর্তনে ব্যর্থ হয়। কিন্তু ২০০৭ সালে পরোক্ষ সামরিক সরকার পরিবর্তিত বিশ্ব পরিস্থিতি, সাম্রাজ্যবাদবিরোধী যুদ্ধে মার্কিন আনুকূল্য লাভের আশায় ধর্মনিরপেক্ষ তথা ‘রাজনৈতিক ইসলাম’ বিরোধী অবস্থান গ্রহণ করে। প্রতিবেশী ভারত সঙ্গত কারণেই তাদের সমর্থন দেয়। ধর্মনিরপেক্ষ আদর্শের অনুসারী আওয়ামী লীগ স্বাভাবিকভাবেই তাদের আনুকূল্য লাভ করে। ইতোমধ্যে পরোক্ষ সামরিক শাসন আমলেই ৭১-এর ঘাতকদের বিচারের দাবি জোরদার হয়ে ওঠে। ঐ সরকার বিচার অনুষ্ঠানের পরিকল্পনা নিলেও তা আর বাস্তবায়িত হয়নি। আওয়ামী লীগ ৭১-এর ঘাতক দালালদের বিচারের দাবি মেনিফেস্টোতে সংযোজন করে। জয়লাভ করার পর প্রাথমিক দ্বিধাদ্বন্দ্ব কাটিয়ে দেশি-বিদেশি চাপের ফলে দালালদের বিচারের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে। প্রাথমিকভাবে আন্তর্জাতিক যুদ্ধ অপরাধ ট্রাইব্যুনাল গঠনের চিন্তা করা হলেও দালালরা বেসামরিক লোক হওয়ায় বাধ্য হয়ে মানবতাবিরোধী অপরাধ ট্রাইব্যুনাল গঠন করতে হয়। ট্রাইব্যুনালে প্রধানত জামায়াতে ইসলামীর নেতৃবৃন্দকেই দায়ী করা হয়। এর অন্য কারণও রয়েছে। ৭১-এর মুক্তিযুদ্ধে জামায়াত স্বাধীনতার বিরোধিতা সত্ত্বেও ২০০১ সালের নির্বাচন পরবর্তীকালে জাতীয়তাবাদী সরকারের কোয়ালিশনে যোগদান করে। দেশের মুক্তিযুদ্ধের সপক্ষশক্তি, ধর্মনিরপেক্ষ আদর্শে বিশ্বাসী শক্তি এবং বাম ধারার শক্তি দালালদের ঐ ক্ষমতায় আরোহণকে সহজে গ্রহণ করতে পারেনি। তাদের ভাষায়:‘জাতীয় পতাকা খামছে ধরেছে পুরোনো শকুন।’ এছাড়া বিশ্ব পরাশক্তি, জামায়াতে ইসলামীর উত্থানে জঙ্গি ইসলামের পুনরুত্থান আশঙ্কা করে। প্রতিবেশী শক্তি আদর্শ এবং জাতীয় স্বার্থ নির্ণয় করে নিশ্চয়ই তাদের ভাবাদর্শ বিরোধীদের এখানে ক্ষমতাসীন দেখতে চাইবে না। গোটা জাতি তিক্ততর সত্যের সম্মুখীন হয়। ১৯৭৩ সালের আন্তর্জাতিক ট্রাইব্যুনাল আদেশ বেশ কয়েকবার সংশোধন করে প্রয়োগ উপযোগী করা হয়েছে। যার বিচার করা হয় তিনি হলেন আল্লামা দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদী। তিনি জামায়াতের সিনিয়র নায়েবে আমীর এবং জনপ্রিয় ব্যক্তিত্ব হওয়ায় প্রবল আন্দোলনের সৃষ্টি হয়। বাংলাদেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলেও আন্দোলন ছড়িয়ে পড়ে। এ রক্তক্ষয়ী আন্দোলনে সরকারি মতে ৬৭ জন এবং বেসরকারি মতে ১৫৫ জন প্রাণ হারায়। সরকার অত্যন্ত নিষ্ঠুর শক্তি প্রয়োগের মাধ্যমে এ আন্দোলন দমন করে। সাধারণ মানুষের মনে এর বিরূপ প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি হয়। আলেম ওলামা পীর মাশায়েখরা রাস্তায় নেমে আসে। বিরোধী দলীয় নেতা বেগম খালেদা জিয়া ঐ নিষ্ঠুরতাকে গণহত্যা বলে অভিহিত করেন। দেরিতে হলেও প্রধানমন্ত্রী এ বিষয়ে সংসদে একটি জবাবদিহিতামূলক বিবৃতি দেন। গণতান্ত্রিক শাসন ব্যবস্থার একটি বৈশিষ্ট্য হল জনজবাবদিহিতা। সরকার জনগণের থেকে, জনগণের দ্বারা, জনগণের জন্য । সুতরাং জবাবদিহিতা নিশ্চিতকরণের বিষয়ে তাবত্ তাত্ত্বিকরা একমত। যারা যখন শাসন করেন তখন তারা জনগণের শাসনে যেকোন বিষয়ে কৈফিয়ত দিতে বাধ্য। জনগণের প্রতিনিধিত্বশীল পার্লামেন্ট বা সংসদ হচ্ছে এ জবাবদিহিতার সর্বোচ্চ প্রতিষ্ঠান। রাষ্ট্রবিজ্ঞানীরা মনে করেন:যারা শাসিত তাদের কাছে অংশগ্রহণমূলক বিধি ব্যবস্থার মাধ্যমে জবাবদিহিতার ওপর সরকারের বৈধতা নির্ভর করে। রাষ্ট্রবিজ্ঞানী বিলনে (১৯৫৪:১৬) জন জবাবদিহিতাকে সুশাসনের অপরিহার্য অংশ বলে মন্তব্য করেন। সংসদীয় বিধি-ব্যবস্থায় প্রশ্নোত্তর পর্ব, বিতর্ক, আলোচনা, বাজেট অনুমোদন, কমিটি ব্যবস্থা ইত্যাদির মাধ্যমে জনজবাবদিহিতা নিশ্চিত করা হয়। নির্বাহী বিভাগ জনগণের নির্বাচিত প্রতিনিধিদের মাধ্যমে গোটা দেশের মানুষের কাছে তাদের জবাবদিহিতা, কৈফিয়ত পৌঁছে দেন। এ ব্যবস্থার মাধ্যমে শাসক নেতৃত্বের পিতৃতান্ত্রিকতা, নিষ্ক্রিয়তা, উদাসীনতা এবং অবজ্ঞা দূরীভূত হয়ে নাগরিক সাধারণের কাছে দায়বোধ সূচিত হয়। প্রধানমন্ত্রী, মন্ত্রী বা এমপিরা যে আমাদের জমিদার বা মালিক মোখতার নয় এটাই জবাবদিহিতার মাধ্যমে প্রতিফলিত হয়। জনজবাবদিহিতার প্রধান কেন্দ্র বিন্দু জাতীয় সংসদ। আগেই বলেছি এখানে স্বইচ্ছাপ্রণোদিত হয়ে অথবা বিধিমোতাবেক জিজ্ঞাসিত হয়ে প্রধানমন্ত্রী বা মন্ত্রীরা জবাবদিহিতা নিশ্চিত করেন। গেল সপ্তাহের সংঘাতপূর্ণ পরিস্থিতির সময় সংসদের অধিবেশন চলছিল। কিন্তু সংসদে এ নিয়ে কোন আলোচনা হয়নি। আর সমালোচনার জন্য বিরোধী দল সংসদে উপস্থিত ছিল না। অবশেষে ৬ মার্চ ২০১৩ যখন সংসদ অধিবেশনের সমাপ্তি ঘটে তখন প্রধানমন্ত্রী সমাপনী বক্তব্য দেন। তার বক্তৃতায় কতিপয় জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ বিষয় স্থান পায়। বিশেষত জনজবাবদিহিতার প্রাসঙ্গিকতায় এটি আমাদের কাছে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। প্রধানমন্ত্রী তার এ বক্তৃতায় হত্যাকাণ্ডের দায় নিরূপণ, সন্ত্রাস প্রতিরোধ কমিটি গঠন, সংখ্যালঘু নির্যাতন, হরতালের যৌক্তিকতা, বিরোধী দলীয় নেতার সিঙ্গাপুর সফর, ভারতের রাষ্ট্রপতির সাথে বিরোধী দলীয় নেতার সাক্ষাত্ না করা ইত্যাদি বিষয়ের অবতারণা করেন। রাষ্ট্রপতির ভাষণ সম্পর্কে আনীত ধন্যবাদ প্রস্তাবের আলোচনা ও অধিবেশনের সমাপনী বক্তব্যে সাম্প্রতিক রাজনৈতিক সহিংসতার জন্য বিরোধী দলীয় নেতা বেগম খালেদা জিয়াকে দায়ী করেন। তিনি বলেন, দেশের এতগুলো সাধারণ মানুষের জীবন গেল, পুলিশ হত্যা করা হলো, রক্তপাত ঘটানো হলো-এসব ধ্বংসাত্মক কর্মকাণ্ডের দায়-দায়িত্ব বিরোধী দলীয় নেতাকে নিতে হবে। তিনি বেগম খালেদা জিয়ার উদ্দেশে বলেন:যতই চেষ্টা করেন যেটা চাচ্ছেন, যুদ্ধাপরাধীদের বিচার বন্ধ করা, তা করতে পারবেন না। আমি যখন বিচার শুরু করেছি শেষ করার ক্ষেত্রেও ব্যর্থ হব না। আল্লাহর উপর আমার ভরসা রয়েছে। সংসদীয় রাষ্ট্রব্যবস্থায় সংসদ নেতা অর্থাত্ প্রধানমন্ত্রী আইনত সকল ব্যর্থতা ও সফলতার জন্য দায়ী। যাদের নৈতিক অবস্থান যত উর্ধ্বে তাদের দায়বোধ তত তীব্র। বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাস বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, আওয়ামী লীগ বিরোধী দল হিসেবেই পারঙ্গমতা ভাল দেখায়। সংসদীয় সরকার ব্যবস্থায় বিরোধী দলীয় নেতা অবশ্যই সরকারের অঙ্গ। এমন কি হয়েছে যে, প্রধানমন্ত্রী তাঁর কোন সহায়তা চেয়ে ব্যর্থ হয়েছেন? যদি জোটের বিবেচনায় জামায়াতের দায়-দায়িত্ব বেগম খালেদা জিয়ার ওপর চাপান হয়, তাহলেও কি প্রমাণিত হবে যে ঐ হত্যাযজ্ঞের জন্য ঐ সংগঠনটি দায়ী? উচিত ছিল একটি বিচার বিভাগীয় তদন্ত কমিটি গঠন। তাহলেই দায় নিরূপিত হত। অন্যের ঘাড়ে দায় চাপানো আসলে দায়িত্বহীনতা বা দায় এড়ানোরই শামিল। শুরু করেছিলাম গণহত্যা শব্দ দিয়ে। আশা করি গণহত্যার সংজ্ঞা ও পটভূমি নির্ধারণের পর এটা সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণিত হয়েছে যে, সাম্প্রতিক হত্যাযজ্ঞ গণহত্যারই নামান্তর। অবশ্য এ বিষয় নিরর্থক বিতর্ক করে লাভ নেই। অসংখ্য মৃতুই সত্য। রক্তাক্ত জনপদই সত্যের সাক্ষ্য। গণহত্যা যাদের নিয়ে বা যাদের দ্বারা সংগঠিত হয়েছে সেটাই আমাদের প্রতিপাদ্য ছিল। বেগম খালেদা জিয়া গণহত্যা দ্বারা অসংখ্য মানুষের মৃত্যুকেই বুঝিয়েছেন। ১৯৭১ সালে মহান মুক্তিযুদ্ধের গণহত্যাকে খাটো করার জন্য নিশ্চয়ই তিনি গণহত্যা শব্দ ব্যবহার করেননি। দুঃখজনক হলেও সত্য বাংলাদেশ সমাজের অতিমাত্রিক রাজনীতিকরণের কারণে আমাদের বুদ্ধিজীবীরা রাজনৈতিক বিভাজন দ্বারাই সবকিছু বিবেচনা করেন। যত অপ্রিয়ই হোক না কেন সাম্প্রতিক গণহত্যার দায়-দায়িত্ব সরকার প্রধান হিসেবে ক্ষমতাসীন প্রধানমন্ত্রীর উপরই বর্তায়। তিনি জাতিকে ঐ হত্যার বিষয় আস্থায় নিতে ব্যর্থ হয়েছেন। গণতন্ত্রের সার্থকতা এখানেই যে, শাসনের সম্মতির জন্য একটা নির্দিষ্ট সময়ান্তে জবাবদিহিতার জন্য জনগণের কাছে ফিরে যেতে হয়। শাসক শেখ হাসিনা এবং বিরোধী নেতা বেগম খালেদা জিয়াকেও সময়ান্তরে হাজির হতে হবে। স্ব-স্ব অবস্থান থেকে সফলতা-ব্যর্থতার খতিয়ান, কৈফিয়ত, হিসেব-নিকেশ দিতে হবে। সেই জনতার পার্লামেন্টে তাদের জবাবদিহিতা দেখার জন্য অপেক্ষমাণ দেশের মানুষ। জনতার সম্মতি অথবা অসম্মতির ভিত্তিতে আস্থা এবং বৈধতার ভিত্তি নির্মিত হবে। বিশেষজ্ঞদের মতে; ‘Legitimacy of government which on the existence of participatory process and consent of those are governed.’ (Development Assistence Committee, 1993)  লেখক : অধ্যাপক, সরকার ও রাজনীতি বিজ্ঞান বিভাগ, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন