[ রা জ নী তি ]

মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচার :একটি পর্যালোচনা

আপডেট : ১৪ মার্চ ২০১৩, ২২:১৯
গত চার সপ্তাহ ধরে জামায়াত নেতৃত্বাধীন সহিংস হরতাল-নৈরাজ্যে শুধু ঢাকা নয়, সারা দেশব্যাপীই লাগাতার অস্থিরতা বিদ্যমান। গত ২১ জানুয়ারি মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধ ও গণহত্যার দায়ে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল অব বাংলাদেশের (আইসিটি-বাংলাদেশ) আদালত-২ আবুল কালাম আযাদ বাচ্চুর মামলার রায় ঘোষণা করে। ঐ আদালত ‘মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধ ও গণহত্যার অভিযোগ আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল এ্যাক্ট ১৯৭৩ (আইসিটিএ) এর ২০/২) ধারা অনুযায়ী তাকে দোষী সাব্যস্ত করে মৃত্যুদন্ড দেয়। আদালত অপহরণ, আটক এবং নির্যাতন, হত্যা, ধর্ষণ ও গণহত্যার দায়ে তাকে অপরাধী সাব্যস্ত করে। ট্রাইব্যুনাল এই বলে আদেশ দেয় যে, পলাতক আযাদ গ্রেফতার হোন কিম্বা আত্মসমর্পণ করুন যেটাই আগে সম্পাদিত হবে তার মৃত্যুদন্ড কার্যকর করা হবে। আদালত এই সিদ্ধান্তেও উপনীত হয় যে, আযাদ দেশের বিচার প্রক্রিয়া এড়াতে উদ্দেশ্যমূলকভাবে দেশ ছেড়ে পালিয়েছেন। এই পলায়নে তার অপরাধ যে দন্ডযোগ্য তা প্রমাণ করে। আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল আরেক জামায়াত নেতা আবদুল কাদের মোল্লার বিরুদ্ধে গত ৫ ফেব্রুয়ারি রায় দিলে ইসলামী ছাত্র শিবির একই সাথে জামায়াত ঐ রায়ের বিরুদ্ধে বাড়াবাড়ি করে। ট্রাইব্যুনাল গণহত্যার মত দুষ্কর্মে সহযোগিতা এবং যুদ্ধকালীন সাম্প্রদায়িক অপরাধের জন্য তাকে যাবজ্জীবন কারাদন্ডে দন্ডিত করে। এবারে কাহিনীতে একটা পাক খাওয়ার ব্যাপার লক্ষণীয়। জামায়াত রায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করে বলে যে, আইনের সাথে ঐ রায় সংগতিপূর্ণ নয়। এদিকে দেশব্যাপী ঐ রায়ের বিরুদ্ধে মানুষ রাস্তায় নেমে আসে। দেশবাসী এই রায়কে তেমন কঠোর মনে না করে কিছুটা সদয় হওয়া বা করুণা করার মত মনে করেছে। দেশবাসী ঐ রায়ের বিরুদ্ধে উদ্বেগ প্রকাশে রাস্তায় নেমে আসে, ব্যস্ততম সড়ক শাহবাগ সংলগ্ন চত্বরে (যা মিসরের তাহরির স্কায়ারের সাথে তুলনীয়) সমবেত হয়ে কাদের মোল্লার ফাঁসি দাবি করে। দেশব্যাপী কাদের মোল্লার ফাঁসির দাবি ওঠে। সরকার প্রাথমিক পর্যায়ে অসন্তোষ প্রকাশ করলেও একথাও প্রতিষ্ঠিত করতে আগ্রহী হয় যে, ট্রাইব্যুনালের ভূমিকা যে স্বাধীন তা এর মাধ্যমে প্রতিভাত হয়েছে। পরিণামস্বরূপ সরকার রায়ের একটি ধারায় উচ্চতর আদালতে আপিলের সিদ্ধান্ত নেয়। আইন মন্ত্রণালয় ইংগিত দেয় যে, তারা আন্তর্জাতিক অপরাধ (ট্রাইব্যুনালস) এ্যাক্ট ৭৩ এর একটি ধারা সংশোধন করার উদ্যোগ নেবে এবং তা পরবর্তীতে সম্পন্ন করা হয়। এর মাধ্যমে উভয় বাদী ও বিবাদী দুই পক্ষই আইনগতভাবে আপিলের সম্ভাবনার সঙ্গে সম্পৃক্ত হয়। কতিপয় বিশ্লেষকের মতে, ট্রাইব্যুনালের নিরপেক্ষতা ও স্বাধীনতা নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে সরকার গৃহীত পদক্ষেপসমূহ এতদসত্ত্বেও আন্তর্জাতিক মানের নয়। বাংলাদেশের জেলখানায় সাধারণ কয়েদিদের জীবন যাপন এক কথায় দুর্বিষহ হলেও আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের আসামিদের ক্ষেত্রে এ কথা প্রযোজ্য নয়। তবে বিচার প্রক্রিয়া নিয়ে প্রশ্ন তোলা হয়েছে যে, একজন বিচারপতি দুর্ভাগ্যজনক স্কাইপি কথোপকথন করেছেন একজন অভিবাসী আইনজীবীর সাথে। যদিও ঐ বিচারপতি নিজ দায়িত্ব থেকে পরবর্তীতে পদত্যাগ করেন। এক্ষেত্রে আরও বলা হয় যে, বিচারকের নিরপেক্ষতা ‘মিসিং’ এবং সাক্ষী উপস্থিতির ক্ষেত্রে বিবাদীর অধিকারকে ট্রাইব্যুনাল সীমিত কিম্বা সংকুচিত করেছে। এই বিচারে সরকারের যে কোন উদ্দেশ্য বা মোটিভ নেই- সে কথারও প্রতিবাদ হয়েছে। একই সাথে এ অভিযোগও করা হয়েছে যে, আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের বিচারের ক্ষেত্রে জামায়াতের নেতাদের টার্গেট করা হয়েছে। একই সাথে অপরাধ সংঘটনকালে অভিযুক্তদের কেউ কেউ তখন জামায়াতের সদস্য কিম্বা জামায়াতের সাথে সংশ্লিষ্টও ছিলেন না। এই পেক্ষাপটে একথাও উল্লেখ করা হয় যে, জবাবদিহিতার ক্ষেত্রে সরকারকে পক্ষপাতদুষ্ট এবং একপেশে বলে অনুভূত হবে। গত তিন বছর ধরে সংঘটিত বিচার বহির্ভূত হত্যা ও গুমের ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য পদক্ষেপ নিতে সরকার কালক্ষেপণ করে থাকতে পারে। এই প্রেক্ষাপটে অনেকের মতে, সুষ্ঠু বিচার অবশ্যই নিশ্চিত করতে হবে এবং অপ্রয়োজনীয় চাপ প্রয়োগে সুষ্ঠু বিচারের ক্ষেত্রে ছায়া ফেলতে পারে। জাতিসংঘের বিচার বহির্ভূত সংক্ষিপ্ত অথবা অরবিট্রারি এক্সিকিউশন বিষয়ক বিশেষ র্যাপোটিয়ার ক্রিস্টক হাইনস এবং জাতিসংঘেরই আরেক র্যাপোটিয়ার, যার দায়িত্ব বিচারক ও আইনজীবীর স্বাধীনতা সংক্রান্ত, নাম গ্যাব্রিয়েলা কেনাওল, তাঁরা তাঁদের পর্যবেক্ষণ তুলে ধরেছেন। গ্যাব্রিয়েলা কেনাওল বিশেষভাবে বলেছেন যে, কতগুলো বিষয়ে অবশ্যই নিশ্চিত করতে হবে। এর মধ্যে রয়েছে একটি হল আইনজীবীদের সাথে সহজে কথা বলার সুযোগ যেন অভিযুক্তরা পান। আনীত অভিযোগ খন্ডনে অভিযুক্তদের যথেষ্ট সময়ও দিতে হবে। একই সাথে আসামিরা যেন তাদের সাক্ষীদের উপস্থিত করে তাদের অনুকূলে অভিমত তুলে ধরতে সমর্থ হন। এ পর্যন্ত উপরোক্ত দাবিগুলো ট্রাইব্যুনাল মেনে আসছে অর্থাত্ প্রতিটি ক্ষেত্রে সমকক্ষ হওয়ার নীতিমালাকে শ্রদ্ধা করার ব্যাপারে পদক্ষেপ গ্রহণ করা হচ্ছে। উল্লেখ্য, আন্তর্জাতিক উদ্বেগকে কেউ প্রশংসা করতে পারেন কিন্তু জুরিস্টদের দ্বন্দ্বের মুখোমুখি করা ঠিক নয়। ৭১’সালে গণহত্যা সংঘটিত হয়েছিল। তাতে লক্ষ লক্ষ লোক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল। যদিও গত ১০ বছরে অনেক অনিচ্ছাকৃত গুম ও বিচারবহির্ভূত হত্যাকান্ড সংঘটিত হয়েছে। কিন্তু কমলাকে আপেল বললে সেই একই ভুল বলা হবে। আমরা লক্ষ লক্ষ লোকের হত্যা ও হাজার হাজার নারীর ধর্ষণের কথা বলছি-নন জুডিশিয়াল প্রসেস এ ‘ক্যাংগারু’ কোর্ট। স্মরণ করা যেতে পারে ১৯৪৯ সালের জেনেভা কনভেনশনের আলোকে মানবাধিকতারের বিরুদ্ধে অপরাধ, হত্যা, ধর্ষণ, নির্যাতন, গণহত্যাসহ নানাবিধ অপরাধের বিচার সংঘটনে স্বাধীন, আইনানুগ, উন্মুক্ত এবং স্বচ্ছ প্রক্রিয়ায় ২০১০ সালে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল বাংলাদেশের প্রথম আদালতটি গঠিত হয়। দ্বিতীয় আদালত গঠন করা হয় ২০১২ সালের মার্চে। স্মরণে রাখা প্রয়োজন যে, সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ সম্পূর্ণ স্বচ্ছ, নিরপেক্ষ এবং আন্তর্জাতিক মানবাধিকারের মান বজায়ের লক্ষ্য নিয়ে বিচার সম্পন্ন করতে উদ্যোগ গ্রহণ করেছেন। একথাও বিশেষভাবে উল্লেখের দাবিদার যে, আইসিটিবিডি একটি দেশীয় ট্রাইব্যুনাল হলেও আন্তর্জাতিক অপরাধ হিসেবে স্বীকৃত, যা ৭১ সালে এদেশে সংগঠিত হয়েছে, যা গর্হিততম অপরাধ হিসেবে গণ্য ও ধর্তব্য, তা বিচারের আওতায় নিয়ে এসেছে। আন্তর্জাতিক অপরাধ আইনে যে সকল কর্মকান্ড অপরাধ হিসেবে সাব্যস্ত হয় এই বিচারে একমাত্র আন্তর্জাতিক উপাদান ও স্বরূপ হল তাই। যদিও ট্রাইব্যুনালকে সরকারের প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নের একটা উপায় হিসেবে বিবেচনা করা হয়। সরকার ‘ধর্মনিরপেক্ষ, গণতান্ত্রিক নানা ধর্ম বর্ণ নির্বিশেষে’ একটি সমাজ ব্যবস্থা গঠনে বদ্ধপরিকর বা প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। ট্রাইব্যুনালে স্বচ্ছতা বজায় রাখার বিষয়টিও প্রতিশ্রুত এবং এই বিচার আয়োজনে কোন রাজনৈতিক উদ্দেশ্য অনুপস্থিত। যুদ্ধাপরাধের বিচারের দাবি দীর্ঘদিনের। পাকবাহিনী এবং তাদের দোসররা ’৭১ সালে যে নৈরাজ্য ও ধ্বংসযজ্ঞ চালিয়েছে, যে ক্ষত লক্ষ লক্ষ ভিকটিমকে তাড়িত করছিল তার অবসান জরুরি। এটা কোন প্রতিশোধ নয়-প্রত্যাশা। জামায়াতে ইসলামীর ভারপ্রাপ্ত সেক্রেটারি জেনারেল রকিকুল ইসলাম খান কঠোর ভাষায় যুদ্ধাপরাধের বিচারের ব্যাপারে মন্তব্য করেছিলেন। তিনি এও হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করেছিলেন যে, আমাদের নেতাদের বিরুদ্ধে একপেশে রায় ঘোষণার মাধ্যমে দেশকে গৃহযুদ্ধের দিকে ঠেলে দেবেন না। কাদের মোল্লার যদি কিছু হয় ঘরে ঘরে অগ্নিসংযোগ করা হবে। জামায়াতের এহেন বক্তব্যে সারাদেশে ব্যাপক প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি হয়। শাহবাগ হয়ে ওঠে আন্দোলনের প্রাণকেন্দ্র। জামায়াত নেতার হুমকির প্রেক্ষিতে দেশব্যাপী স্বতঃস্ফূর্তভাবে প্রতিবাদ উঠেছিল। অপরাধের ভয়াবহতা সত্ত্বেও কাদের মোল্লার বিরুদ্ধে লঘু সাজা প্রদানে অসন্তুষ্টির সৃষ্টি হয়। ফলে যুদ্ধাপরাধের বিষয়টি আমাদের জাতীয় এজেন্ডা হিসেবে প্রথম কাতারে চলে আসে। ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলো সম্যক উপলব্ধি করেন যে, যুদ্ধাপরাধের ইস্যুতে জাতীয় ঐক্য সৃষ্টি হয়েছে। এই বার্তা আবার প্রমাণ করেছে যে, সর্বজনীন ক্রোধের যে বহিঃপ্রকাশ ঘটেছে দেশজুড়ে সেখানে রাজনীতির কিছুই করার নেই। পাশাপাশি কতিপয় রাজনীতিকের এটা উপলব্ধি করা উচিত যে, বিরোধী দলীয় নেতারা তত্ত্বাবধায়ক সরকার পুনঃপ্রবর্তনের যে আন্দোলন করছেন তা বন্ধে কোন বিতর্ক বা ধূম্রজাল সৃষ্টিতে সরকারের কোন প্রয়াস নেই। অতীতে সংঘটিত বড় ধরনের অপকর্মকে ট্রাইব্যুনালকে দেখতে হবে রাজনীতির ঊর্ধ্বে থেকে অথবা কোন রাজনৈতিক দলের এজেন্ডা বাস্তবায়নের নিরিখে নয়। পুরো বিষয়টি একটি বিচারিক ইস্যু।  লেখক : সাবেক রাষ্ট্রদূত, পররাষ্ট্র বিষয়ক তথ্য অধিকার ও সুশাসন সংক্রান্ত বিশ্লেষক অনুবাদ:কায়কোবাদ মিলন

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন