বাংলাদেশের জ্বালানি নিরাপত্তা

আপডেট : ১৪ মার্চ ২০১৩, ২২:২০
বৈশ্বিক জ্বালানি সংকট কমিয়ে আনার লক্ষ্যে জাতিসংঘ বিগত ২০১২ সালকে “আন্তর্জাতিক টেকসই জ্বালানি বর্ষ” হিসেবে ঘোষণা করেছে। এর উদ্দেশ্য হলো আগামী ২০৩০ সালের মধ্যেই প্রধানত তিনটি লক্ষ্য পূরণ করা; যেমন: সার্বজনীন আধুনিক জ্বালানি সরবরাহ সহজলভ্যতা সুনিশ্চিত করা, জ্বালানি দক্ষতায় উন্নতি বিধানের হার দ্বিগুণ করা এবং বৈশ্বিক জ্বালানি মিশ্রণের ক্ষেত্রে নবায়নযোগ্য জ্বালানির হিস্যা দ্বিগুণ করা’। বৈশ্বিক জ্বালানি উত্পাদনের তুলনায় ব্যবহার ক্রমাগত হারে বেড়ে যাওয়ায় আজকের বিশ্বের জ্বালানি সংকট সকল আর্থ-সামাজিক উন্নয়নকে ব্যাপকভাবে বাধাগ্রস্ত করছে। যার ফলে উন্নত ও উন্নয়নশীল বিশ্বের দেশগুলোর জ্বালানি শক্তি নিয়ে ভূ-রাজনীতি আরো প্রকট আকার ধারণ করছে। সার্বজনীন উন্নয়ন আর্থ-সামাজিক আন্দোলনের এক গুরুত্বপূর্ণ শর্ত হলো দূষণমুক্ত পৃথিবী। আর দূষণমুক্ত পৃথিবী উন্নয়নে এক গুরুত্বপূর্ণ সূচক জ্বালানি নিরাপত্তা। এসব জ্বালানিই আবার থাকতে হবে পরিষ্কার, স্বয়ংসম্পূর্ণ ও নিরাপদ। ঐসব শর্তাবলীই পূরণ করবে যেসব জ্বালানি তার নাম ‘নবায়নযোগ্য জ্বালানি’। আজকাল জলবায়ুবান্ধব অর্থনীতি ও উন্নয়নে নতুন এক মডেলও বলা হয় ‘নবায়নযোগ্য জ্বালানি’কে। বৈশ্বিক জ্বালানি নিরাপত্তার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ চারটি উপায় হলো: জ্বালানি সহজলভ্যতা, সামর্থ্যতা, উপযোগিতা ও পরিবেশীয় নিরাপদ তথা পরিবেশবান্ধবতা। বৈশ্বিক জ্বালানির চ্যালেঞ্জ ও সম্ভাবনার ক্ষেত্রে মধ্য ও পশ্চিম এশিয়া, দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া এবং প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের দেশগুলোতে জনসংখ্যার শতকরা হারের যত অংশ বিদ্যুত্ সেবা পাচ্ছে তার সাথে মাথাপিছু জিডিপি’র সরাসরি সম্পর্ক বিদ্যমান। তবে বেশকিছু দেশ এই প্রক্রিয়ার সাথে ভিন্নমতও পোষণ করছে। ইতোমধ্যে প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে দেশগুলোতে বায়ুশক্তি, সামুদ্রিক ঢেউ ও ভূ-তাপ শক্তির বিশাল সম্ভাবনাকে কাজে লাগিয়ে বিদ্যুত্ উত্পাদন শুরু করেছে। যেহেতু জ্বালানি নিরাপত্তার অর্থ একই প্রকার জ্বালানির উপর নির্ভরশীলতা কমানো অর্থাত্ বৈচিত্র্যময় জ্বালানি মিশ্রণ গড়ে তোলা। তাই উন্নয়নশীল অথবা অনুন্নত বিশ্বের দেশগুলো জ্বালানি চাহিদা নিশ্চিতকরণে নবায়নযোগ্য জ্বালানি মিশ্রণের কোন বিকল্প নেই। এশিয়া-প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলটি এক বিশেষ জ্বালানি আমদানিকারক অঞ্চল। এ অঞ্চলের মধ্যে কেবলমাত্র মধ্য ও পশ্চিম এশিয়া প্রয়োজন মেটানোর পর যে পরিমাণ জ্বালানি রুপ্তানি করে, তার পরিমাণ খুবই সামান্য। এশিয়ার উন্নয়নশীল দেশগুলোর মধ্যে আন্তর্জাতিক জ্বালানি সংস্থার ওয়ার্ল্ড এনার্জি আউটলুক-২০১১ অনুসারে, সিঙ্গাপুরে জ্বালানি প্রাপ্তির হার শতকরা ১০০ ভাগ হলেও জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণে জ্বালানি সরবরাহে বৈচিত্র্য আনার ক্ষেত্রে বিশেষ উদ্যোগ গ্রহণ করেছে। বাংলাদেশে যেখানে জ্বালানি সুবিধা প্রাপ্তির হার শতকরা ৪১ ভাগ (এর মধ্যে শতকরা ৭৬ ভাগ শহর ও ২৮ ভাগ গ্রাম জ্বালানি সুবিধা পেয়ে থাকে)। অর্থাত্ মোট জনসংখ্যার ৯৫.৭ মিলিয়ন মানুষ জ্বালানি সুবিধা থেকে বঞ্চিত। অন্যদিকে দক্ষিণ এশিয়ার অন্যান্য দেশের জ্বালানি সুবিধা প্রাপ্তির হার ভারতে শতকরা ৭৫ ভাগ, শ্রীলংকায় শতকরা ৭৬.৬ ভাগ, পাকিস্তানে শতকরা ৬২.৪ ভাগ, নেপালে শতকরা ৪৩.৬ ভাগ, আফগানিস্তানে শতকরা ১৫.৫ ভাগ এবং মিয়ানমারে শতকরা ১৩ ভাগ । এ অবস্থার প্রেক্ষাপটে জ্বালানি মিশ্রণসহ নবায়নযোগ্য জ্বালানির সকল উেসর মাধ্যমে ব্যাপকভিত্তিক জ্বালানি নিরাপত্তামূলক কার্যক্রম বাস্তবায়নই একমাত্র পথ। আজকে বাংলাদেশে স্বাধীনতার চার দশক পরেও প্রত্যন্ত গ্রামাঞ্চলের শতকরা প্রায় ৭০ ভাগ মানুষ জ্বালানি সুবিধা থেকে বঞ্চিত রয়েছে। এসব প্রত্যন্ত গ্রামাঞ্চলে মানুষ শুকনো লতাপাতা, কাঠ, পশুবর্জ্য ও কেরোসিন প্রভৃতি ব্যবহারের মাধ্যমে জ্বালানি চাহিদা পূরণ করছে। আর এসব জ্বালানির ব্যবহার শ্রমসাপেক্ষ, স্বাস্থ্য ও পরিবেশের জন্যে মারাত্মক ক্ষতিকর। তবে আমাদের মতো বিশাল জনগোষ্ঠীর জন্যে জ্বালানি চাহিদা মেটানো স্বল্প মেয়াদে সম্ভব না হলেও দীর্ঘ মেয়াদী জ্বালানি নিরাপত্তামূলক কার্যক্রমে (যেমন: জ্বালানি মিশ্রণ ও নবায়নযোগ্য জ্বালানি উন্নয়ন কার্যক্রম) মাধ্যমে সম্ভব। নবায়নযোগ্য জ্বালানি উন্নয়নে মেয়াদী বিনিয়োগ কৌশল বাস্তবায়ন, ঝুঁকি পূরণে যথার্থ আর্থিক ব্যবস্থা রাখা। পর্যাপ্ত বাজারজাতকরণ ও প্রশিক্ষিত কিংবা দক্ষ লোকবল, প্রযুক্তি হস্তান্তরের ক্ষেত্রে বাস্তবভিত্তিক একটি বাজার থাকা ইত্যাদি গুরুত্বপূর্ণ। এসব বিনিয়োগের বিপরীতে ব্যবসায়িকভাবে লাভবান হতে চাইবেন। এ বিষয়টিও বিবেচনায় রাখা বাঞ্ছনীয়। লেখক : উদ্ভিদ তত্ত্ববিদ ও গবেষক

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন