প্রতিটি ভোক্তার নিরাপদ ও ভেজালমুক্ত খাদ্য পাওয়ার অধিকার রয়েছে । কিন্তু আমরা এসব অধিকার থেকে বঞ্চিত। শিশুখাদ্য থেকে শুরু করে ফল-মূল, শাক-সবজি, মাছসহ প্রায় সব ধরনের খাবারে বিষাক্ত রাসায়নিক পদার্থ মেশানো হয়। বিভিন্ন সময় ভ্রাম্যমাণ আদালতের অভিযানে, জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ, পরিবেশ আন্দোলনকর্মী ও ভোক্তা অধিকার কর্মীদের বক্তব্যে বিষাক্ত খাদ্যের ব্যাপকতার যে চিত্র ফুটে ওঠে, তা রীতিমত আতঙ্কজনক। কিন্তু বাজারে প্রাকৃতিক, প্রক্রিয়াজাত, আমদানি করা সব ধরনের খাদ্যদ্রব্যের মান নিয়ন্ত্রণে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় ও সংস্থাগুলো :স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়, বাণিজ্য মন্ত্রণালয়, স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়, খাদ্য মন্ত্রণালয়, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়, মত্স্য মন্ত্রণালয়, জাতীয় রাজস্ব বোর্ড, বিএসটিআই, সিটি করপোরেশন, পৌরসভা, ভোক্তা সংরক্ষণ অধিকার অধিদফতর, পরিবেশ অধিদফতর—তাদের উপর অর্পিত দায়িত্ব পালনে ব্যর্থতার পরিচয় দিয়ে চলেছে। এমতাবস্থায় বিষাক্ত খাদ্যের ব্যাপকতা রোধে একটি শক্তিশালী স্বতন্ত্র সংস্থা গঠনের জন্য পরিবেশ বাঁচাও আন্দোলন দীর্ঘদিন ধরে দাবি করে আসছে।
বিষাক্ত রাসায়নিক মিশ্রিত খাবার ভয়াবহ স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি করে। নিরাপদ খাবার তৈরি, বিপণন ও বিক্রি এবং জনস্বাস্থ্যের সুরক্ষা নিশ্চিত করার জন্য বেশ কটি আইন রয়েছে:অত্যাবশ্যকীয় পণ্য নিয়ন্ত্রণ আইন-১৯৫৬, বিএসটিআই (সংশোধিত) আইন-২০০৩, পরিবেশ সংরক্ষণ আইন- ১৯৯৫, বিশুদ্ধ খাদ্য (সংশোধিত) আইন- ২০০৫, মোবাইল কোর্ট অর্ডিনেন্স- ২০০৯, ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ আইন-২০০৯। কিন্তু এসব আইনের যথাযথ ও সমন্বিত প্রয়োগ নেই।
বিষাক্ত খাদ্যের ক্ষতিকর প্রভাব ধনী-দরিদ্রভেদে ভিন্ন হয় না। তবে নিম্ন আয়ের মানুষের সংসার চালাতেই হিমশিম খেতে হয়। সেখানে তারা অনেক ক্ষেত্রেই পণ্যের বাছ-বিচার করে না। তাই কেবল সচেতনতা দিয়েই সমাজের এই অন্যায়কে ঠেকানো যাবে না, সরকারকেই নিশ্চিত করতে হবে বিষমুক্ত নিরাপদ খাদ্য। আর সেটা করতে হবে প্রয়োজনীয় প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলে, সময়োপযোগী আইন প্রণয়ন করে এবং আইনের সঠিক বাস্তবায়নের মাধ্যমে।
ক্ষতিকর ফরমালিন সম্পর্কে দরকার জনসচেতনতাও। পরীক্ষায় দেখা গেছে, পানিতে প্রায় ১ ঘণ্টা মাছ ভিজিয়ে রাখলে ফরমালিনের মাত্রা শতকরা ৬১ ভাগ কমে যায়। লবণাক্ত পানিতে ফরমালিন দেয়া মাছ ১ ঘণ্টা ভিজিয়ে রাখলে শতকরা প্রায় ৯০ ভাগ ফরমালিনের মাত্রা কমে যায়। প্রথমে চাল ধোয়া পানিতে ও পরে সাধারণ পানিতে ফরমালিনযুক্ত মাছ ধুলে শতকরা প্রায় ৭০ ভাগ ফরমালিন দূর হয়। সবচাইতে ভালো পদ্ধতি হলো ভিনেগার ও পানির মিশ্রণে (পানিতে ১০ % আয়তন অনুযায়ী) ১৫ মিনিট মাছ ভিজিয়ে রাখলে শতকরা প্রায় ১০০ ভাগ ফরমালিনই দূর হয়।
প্রস্তাবিত ফরমালিন নিয়ন্ত্রণ আইনে ফরমালিন নিয়ন্ত্রণের জন্য জেলা ও উপজেলা কমিটি গঠন, কমিটির দায়িত্ব ও কর্তব্য এবং লাইসেন্সিং কর্তৃপক্ষের বিধান রয়েছে। তবে আইনে জাতীয় কমিটি গঠন এবং দণ্ডের কোন বিধান নেই। অন্যদিকে প্রস্তাবিত নিরাপদ খাদ্য আইনের আওতায় জাতীয় নিরাপদ খাদ্য ব্যবস্থা উপদেষ্টা কাউন্সিল, বাংলাদেশ নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষ (৫ সদস্যবিশিষ্ট) এবং কর্তৃপক্ষের দায়িত্ব ও কার্যাবলী, কেন্দ্রীয় নিরাপদ খাদ্য ব্যবস্থাপনা সমন্বয় কমিটি, বৈজ্ঞানিক প্যানেল গঠন, খাদ্য দূষণ সম্পর্কিত সাধারণ শর্তাবলী, খাদ্যদ্রব্যের ব্যবসায়ীদের বিশেষ দায়িত্বসমূহ, খাদ্য বিশ্লেষণ ও পরীক্ষণ, পরিদর্শন ও খাদ্যদ্রব্য জব্দকরণ, অপরাধ ও দণ্ড এবং বিচারের বিধান রয়েছে। অনূর্ধ্ব তিন বত্সর কারাদণ্ড বা অনধিক দুই লক্ষ টাকা অর্থদণ্ড বা উভয় দণ্ডের বিধান রয়েছে। কিন্তু আইনে উপদেষ্টা কাউন্সিল ও ব্যবস্থাপনা সমন্বয় কমিটিতে সদস্য হিসাবে বেসরকারি সংস্থার প্রতিনিধি রাখা হয়নি। আইনটি চূড়ান্ত অনুমোদনের ক্ষেত্রে এসব ভেবে দেখতে হবে।
লেখক : চেয়ারম্যান, সচিব ও সহকারী সম্পাদক, পরিবেশ বাঁচাও আন্দোলন
