‘পালামৌ’ ভ্রমণ কাহিনির শ্রেণিশিক্ষা

আপডেট : ১৫ মার্চ ২০১৩, ১৬:১৩
নবম শ্রেণির শিক্ষার্থীদের জন্য সঞ্জীবচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় রচিত ‘পালামৌ ভ্রমণ কাহিনির বুঝানোর জন্য শিক্ষক শ্রেণিকক্ষে যেভাবে বক্তব্য দিতে পারেন এবং ছাত্রছাত্রীরা প্রবন্ধের মূলভাব অনুধাবন করতে পারে সেভাবেই তোমাদের জন্য শ্রেণিশিক্ষা পর্বে প্রবন্ধটির মর্মকথা তুলে ধরেছেন বাংলা বিষয়ের রোমানা আফরোজ। লেখক পরিচিতি: সঞ্জীবচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় ১৮৩৪ খ্রি: চব্বিশ পরগনার কাঁঠালপাড়া গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। তিনি সাহিত্যসম্রাট বঙ্কিমচন্দ্রের সহোদর ছিলেন। সঞ্জীবচন্দ্র মেদিনীপুর জেলা স্কুল ও হুগলী কলেজে শিক্ষালাভ করেন। নিজের চেষ্টায় ইংরেজি সাহিত্য, বিজ্ঞান ও ইতিহাসে জ্ঞান অর্জন করেন। কর্মজীবনে তিনি বর্ধমান কমিশনার অফিসের কেরানি এবং ডেপুটি ম্যাজিস্ট্রেট হিসেবে বাংলার বিভিন্ন অঞ্চল ও বিহারের পালামৌতে অবস্থান করেন। বেশ কিছুদিন ‘বঙ্গদর্শন’ ও ‘ভ্রমর’ পত্রিকার সম্পাদক হিসেবেও কাজ করেছেন। তিনি কথাসাহিত্যিক হিসেবে খ্যাতি অর্জন করেন। তাঁর সাহিত্যকর্মের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হচ্ছে— উপন্যাস: কণ্ঠমালা, মাধবীলতা, জলপ্রতাপ, চাঁদ; গল্প: রামেশ্বরের অদৃষ্ট, দামিনী; প্রবন্ধ: যাত্রা, সত্কার ও বাল্যবিবাহ; ভ্রমনকাহিনী: পালামৌ প্রভৃতি । তিনি ১৮৮৯ খ্রিস্টাব্দে মৃত্যুবরণ করেন। পাঠ পরিচিতি: “পালামৌ” রচনাটি সঞ্জীবচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের “পালামৌ” নামক ভ্রমণ উপন্যাসের অংশ বিশেষ। “পালামৌ” লেখকের যুবক বয়সের “পালামৌ” ভ্রমণের স্মৃতিচারণমূলক রচনা। এ রচনায় ঐ স্থানের মানুষের জীবনাচরণ, প্রাকৃতিক পরিবেশ, পাহাড়-পর্বত, নদী-বন, পাথর, গাছ-পালা প্রভৃতির বর্ণনা সরল ও সাবলীলভাবে করা হয়েছে। রচনাটিতে লেখক মূলত কোল সমপ্রদায়ভুক্ত মানুষের জীবনবোধ অত্যন্ত সহজ সরল ভাষায় রসাত্মক রূপে আমাদের সামনে উপস্থাপন করেছেন। “পালামৌ”তে যাওয়ার পথে লেখক এক বাঙালি পরিবারে আতিথ্য গ্রহণ করেন। তাদের পারিবারিক জীবনের এক শৈল্পিক বর্ণনাও আছে এ রচনায়। “পালামৌ” গল্পটিতে বাঙালির আতিথেয়তা, কোল সমপ্রদায়ের নৃত্য-গান উপভোগ করে লেখক খুশি হয়েছেন এবং অপার আনন্দ পেয়েছেন। এছাড়াও এ গল্পটিতে লেখক সমাজের ব্রাহ্মণ সন্তানের দায়বদ্ধতা ও রীতি সম্পর্কে মতামত প্রকাশ করেছেন। “পালামৌ” একটি পাহাড়-পর্বত, বন-নদীবেষ্টিত প্রাকৃতিক সৌন্দর্যমণ্ডিত অঞ্চল। এটি কোন বড় শহর নয়, একটি বড় পরগনামাত্র। লেখক যুবক বয়সে এ স্থানটি ভ্রমণে গিয়েছিলেন। লেখকের সমস্ত গল্প, কথা ,বিষয় বর্ণনা সবকিছু এই পালামৌকে কেন্দ্র করেই আবর্তিত হয়েছে। এই অঞ্চলে প্রধানত কোল সমপ্রদায়ের বাস। কোলেরা বন্য জাতি, খর্বাকৃতি, কৃষ্ণবর্ণ। এরা তেমন রূপবান না হলেও স্বদেশে এরাই অনুপম। এজন্য এদের উদ্দেশ্য করে লেখক বলেছিলেন— ‘বন্যেরা বনে সুন্দর; শিশুরা মাতৃক্রোড়ে।’ এখানকার কোল সম্প্রদায়ের মানুষের সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান সিনেম্যাটিক ঢঙে উপস্থাপিত হয়ে এ রচনায়। কোল জাতির নারী-পুরুষ পালামৌতে স্বাচ্ছন্দ্যে চলাচল করে, এরা একজন অন্যজনের প্রতি সহানুভূতিশীল। এ অঞ্চলে যুবতিই বেশি দেখা যায়, বৃদ্ধা অতি অল্প। কোল যুবতিরা আবলুসের মতো কালো, এরা এদের কটিদেশে একটি ক্ষুদ্র কাপড় জড়ায়, মাথায় ও কানে বনফুল পরে। এরা অনেক পরিশ্রমি বলেই গৃহের সমস্ত কাজ করে, এদের দেহ সমবয়সি পুরুষের চেয়েও মজবুত। আর পুরুষরা তুলনামূলকভাবে বেশি অলস বলে চাটাই বুনে, স্ত্রীলোকদের মতো সন্তান পালন করে। তাই এখানকার পুরুষরা দ্রুত বৃদ্ধ হয়ে যায়, কিন্তু নারীরা অধিকবয়সী হলেও চির যৌবনা। কোল জাতির এ যুবতিরা যত হাসতে ও নাচতে পারে, পৃথিবীর অন্য কোন জাতের মেয়েরা তা পারে না বলে লেখকের ধারণা। পালামৌতে কোল নারীদের স্বাধীন জীবন-যাপনের চেতনাটি ফুটে ওঠেছে। এছাড়া “পালামৌ” রচনায় লেখক ছাত্র-শিক্ষকের মধুর সম্পর্ক নিয়েও আলোকপাত করেছেন। লেখক যে পরিবারে অতিথি হয়েছিলেন সেখানে তিনি বালকদের শয়নকক্ষে যা দেখেছিলেন তা থেকেই বিষয়টি স্পষ্ট হয়। । বালকদের শয়নকক্ষে চার কোণায় চারটি বিছানা এবং ঘরের মাঝখানে একটি বিছানা দেখে প্রথমে লেখক অবাক হন। কিন্তু যখন জানতে পারলেন মাঝখানের বিছানাটি একজন শিক্ষকের তখন তিনি খুব পরিতৃপ্ত হলেন এবং ভাবলেন ব্যাপারটি সত্যিই অভিনব । এ অংশটির মধ্য দিয়ে লেখক শিক্ষার্থীর শিক্ষাগ্রহণে সার্বক্ষনিক শিক্ষকের তদারকি এবং বন্ধুসুলভ আচরণের উপর জোর দিয়েছেন। কারণ শিক্ষাদান ও শিক্ষাগ্রহণের ক্ষেত্রে এ তদারকি খুবই গুরুত্বপূর্ণ। শিক্ষার্থীরা যদি শিক্ষককে ভয়ের চোখে দেখে, তাঁর আচরণে যদি তাদের ভয় হয় তাহলে তারা শিক্ষা গ্রহণে বিব্রত বোধ করে।