উত্তরাঞ্চলের নিভৃত পল্লীতে তৈরি হইতেছে পাপোষ। আর সেই পাপোষ রফতানি হইতেছে জার্মানিতে। স্থানীয় নারী কারিগরদের হাতে তৈরি এই পাপোষের চাহিদাও দিন দিন বাড়িতেছে। সর্বাপেক্ষা গুরুত্বপূর্ণ বিষয়টি হইল, ইহার বদৌলতে গ্রামের কর্মহীন হতদরিদ্র নারীরা শুধু যে বাঁচার একটি অবলম্বন খুঁজিয়া পাইয়াছেন তাহাই নহে, একই সাথে কিছুটা স্বস্তি এবং সচ্ছলতাও আসিয়াছে তাহাদের জীবনে। তাহারা আত্মবিশ্বাস ফিরিয়া পাইয়াছেন— যাহার মূল্য এককথায় অপরিসীম। গত বুধবারের ইত্তেফাকে প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী নীলফামারীর সৈয়দপুর উপজেলার বোতলাগাড়ী নামে যেই ইউনিয়নটিতে এই কর্মযজ্ঞ চলিতেছে, তাহা দারিদ্র্যপীড়িত উত্তরাঞ্চলের অবহেলিত জনপদগুলির অন্যতম। আশ্বিন-কার্তিক মাসে কোনো কাজ না থাকায় এই অঞ্চলের হতদরিদ্র পরিবারগুলিকে অনাহারে-অর্ধাহারে থাকিতে হইত। এখন সেই চিত্র অনেকখানিই বদলাইয়া গিয়াছে। স্থানীয় একটি বেসরকারি সংস্থার প্রদত্ত প্রশিক্ষণ গ্রহণ করিয়া স্থানীয় অভাবী নারীরা এখন দক্ষতার সাথে দৈনিক জনপ্রতি ১৫ হইতে ১৮টি পর্যন্ত পাপোষ তৈরি করিতেছেন। ঘরে বসিয়া আয় করিতেছেন দৈনিক গড়ে আড়াই শত টাকা। আমাদের সামগ্রিক বাস্তবতার নিরিখে খবরটি উত্সাহব্যঞ্জক শুধু নহে, অত্যন্ত তাত্পর্যপূর্ণও বটে।
কেন তাত্পর্যপূর্ণ সেই প্রশ্ন উঠিতে পারে। যন্ত্রসভ্যতার অভাবনীয় অগ্রগতি সত্ত্বেও বিশ্বব্যাপী হাতে তৈরি পণ্যের কদর যে ক্রমেই বাড়িয়া চলিয়াছে তাহা কোনো নূতন কথা নহে। ধনী দেশগুলিতে এই কদর তুলনামূলকভাবে বেশি। তাহার সঙ্গত কারণও রহিয়াছে। কী আভিজাত্যে, কী গুণগত মানে— হাতে তৈরি পণ্যের তুলনা মেলা ভার। ফলে এই ধরনের পণ্যের প্রতি রুচিশীল ও শৌখিন মানুষের আগ্রহ যেমন প্রবল, তেমনি এইসব বিশেষায়িত পণ্যের দামও অত্যন্ত চড়া। আমাদের জন্য ইহা একটি সুবর্ণ সুযোগই বটে। কারণ হাতে তৈরি পণ্যের জন্য সর্বাগ্রে যাহা প্রয়োজন সেই জনবল আমাদের এককথায় অঢেল। তুলনামূলকভাবে মজুরিও অনেক কম। ঐতিহ্যগতভাবে আমাদের গ্রামীণ জনগোষ্ঠীর কিছু কিছু বিষয়ে সুখ্যাতিও রহিয়াছে বিশ্বব্যাপী। উদাহরণ হিসাবে নকশিকাঁথা, টেরাকোটা ও পাটজাত পণ্যের কথা বলা যায়। বলা যায়, অধুনালুপ্ত মসলিনের কথাও। বিদেশে এইসব পণ্যের যথেষ্ট চাহিদাও রহিয়াছে। আমাদের ক্রমবিকাশমান রফতানি খাতের বদৌলতে ইতোমধ্যে দরিদ্র জনগোষ্ঠীর দক্ষতা ও অভিজ্ঞতার ক্ষেত্র আরও বিস্তৃত হইয়াছে। ব্যাপকভাবে না হইলেও হাতে তৈরি রফতানিসামগ্রীর তালিকায় যুক্ত হইয়াছে নূতন নূতন অনেক পণ্য। তন্মধ্যে কাগজ, শুভেচ্ছা কার্ড, র্যাপিং পেপার, ছবির অ্যালবাম, ছবির ফ্রেম, নানারকম তোয়ালে, ইট, টেরাকোটা ফ্লোর টাইলস, টেরাকোটা ওয়াল টাইলস, টেরাকোটা রুফ টাইলস, পাট ও চামড়াজাত বিভিন্ন সামগ্রী, সোয়েটার, মাফলার, টি শার্ট, বেডশিট, কম্বল ও কাঁথাসহ বস্ত্রসামগ্রী, বাঁশ ও কাঠের সামগ্রী, মৃিশল্প প্রভৃতি বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য।
ইহা স্পষ্ট যে, বিদেশে হাতে তৈরি পণ্যের চাহিদা আছে। অন্যদিকে, আমাদের সেই চাহিদা পূরণের মতো সামর্থ্য আছে। এই দুইয়ের সফল মেলবন্ধন ঘটাইতে পারিলে শুধু যে বিপুল সংখ্যক কর্মহীন মানুষের কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হইবে তাহাই নহে, আমাদের অর্থনীতিতেও যুক্ত হইবে নূতন মাত্রা। তবে ইহার জন্য শুধু সদিচ্ছাই যথেষ্ট নহে। মনে রাখিতে হইবে যে, বহির্বিশ্বে হাতে তৈরি পণ্যের বিপুল চাহিদা যেমন আছে, তেমনি রহিয়াছে তীব্র প্রতিযোগিতাও। এই প্রতিযোগিতায় টিকিয়া থাকিতে হইলে দক্ষতা ও উত্কর্ষের কোনো বিকল্প নাই। অতএব, আন্তর্জাতিক চাহিদার আলোকে দরিদ্র জনগোষ্ঠীকে উপযুক্ত প্রশিক্ষণ ও আনুষঙ্গিক সহায়তা প্রদান করিতে হইবে। সর্বোপরি, গ্রহণ করিতে হইবে বাস্তবসম্মত ও দূরদর্শী উদ্যোগ। আশার কথা হইল, বেসরকারি উদ্যোক্তারা ইতোমধ্যে এই ক্ষেত্রে অনেকদূর আগাইয়া গিয়াছেন। সরকারের কর্তব্য হইল, সর্বাত্মক সহায়তা ও সমর্থন প্রদানের মাধ্যমে তাহাদের হাতকে আরও শক্তিশালী করা।
