জন্মদিনে জনকের প্রতি জাতির গভীর কৃতজ্ঞতা

আপডেট : ১৬ মার্চ ২০১৩, ২১:২৭
আজ জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ৯৪তম জন্মদিন। বাংলাদেশের জন্মের সাথে অবিচ্ছেদ্যভাবে জড়াইয়া আছে তাঁহার নাম। তিনিই বাংলাদেশের স্থপতি ও প্রতিষ্ঠাতা। ফলে জাতি তাঁহাকে ভালোবাসিয়া বিভিন্ন সময়ে জাতির জনক ও বঙ্গবন্ধু প্রভৃতি অভিধায় ভূষিত করিয়াছে সত্য, তবে তাঁহার জাদুকরী নেতৃত্ব ও ব্যক্তিত্বের বিশালতার তুলনায় সবই তুচ্ছ বলিয়া মনে হয়। সকল বিচারেই তিনি ছিলেন অনন্য এক বাঙালি। সহজ-সরল, সাদামাটা এক মানুষ। চলনে-বলনে আপাদমস্তক নিখাদ বাঙালি—কিন্তু কী সাহসে, কী আত্মত্যাগে, কী চরিত্রমাধুর্যে, কী দূরদর্শিতায়—তাঁহার তুলনা মেলা ভার। এমনকী দেহসৌষ্ঠবেও দীর্ঘদেহী মাধুর্য্যমণ্ডিত এই মানুষটিকে সহজেই আলাদাভাবে চেনা যাইত। আর তাঁহার বজ্রকণ্ঠের বিস্ময়কর সম্মোহনী শক্তির কথা তো সর্বজনবিদিত। সব মিলাইয়া, সমহিমায় তিনি স্থান করিয়া লইয়াছিলেন এই দেশের আপামর জনগণের হূদয়ে। সেই প্রভা ছড়াইয়া পড়িয়াছিল বহির্বিশ্বেও। বিশ্বের মুক্তিকামী মানুষও নেতা হিসাবে সাদরে বরণ করিয়া লইয়াছিল তাঁহাকে। বিশ্ববরেণ্য নেতাদের সাথে একই পঙক্তিতে উচ্চারিত হইয়াছিল তাঁহার নাম। লক্ষণীয় যে, স্বাধীনতার আগেই যুক্তরাষ্ট্রের ‘নিউজ উইক’ বঙ্গবন্ধুকে ‘রাজনীতির কবি’ বলিয়া আখ্যায়িত করিয়াছিল। ইতিমধ্যে বহু ঝড়ঝঞ্ঝা বহিয়া গিয়াছে দেশে-বিদেশে। কিন্তু অতীতে যেমন কোনো বৈরিতা বা প্রতিকূলতাই বঙ্গবন্ধুর সেই বিশালতাকে এতোটুকু খর্ব করিতে পারে নাই, তেমনি ভবিষ্যতেও যে পারিবে না—তাহাতে সন্দেহের অবকাশ নাই বলিলেই চলে। বিশিষ্ট সাহিত্যিক ও কবি অন্নদাশঙ্কর রায়ের ভাষায় বলা যায়: ‘যতদিন রবে পদ্মা যমুনা গৌরী মেঘনা বহমান/ততদিন রবে কীর্তি তোমার শেখ মুজিবুর রহমান’। বঙ্গবন্ধু ১৯২০ সালের ১৭ মার্চ তত্কালীন ফরিদপুর জেলার গোপালগঞ্জ মহকুমার টুঙ্গিপাড়া গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। পিতা শেখ লুত্ফর রহমান ও মাতা শেখ সাহারা খাতুনের চার কন্যা ও দুই পুত্রের মধ্যে তিনি ছিলেন তৃতীয়। ছাত্রাবস্থাতেই রাজনীতির সাথে জড়াইয়া পড়িয়াছিলেন। তত্কালীন অবিভক্ত বাংলার মুসলিম লীগের নিবেদিতপ্রাণ কর্মী হিসাবে হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দীর ঘনিষ্ঠ সান্নিধ্যে আসার সুযোগও পাইয়াছিলেন তিনি। সোহরাওয়ার্দীর প্রগাঢ় ব্যক্তিত্বের ছায়ায় বাড়িয়া উঠিলেও বঙ্গবন্ধুর রাজনীতির শিকড় প্রোথিত ছিল অতি সাধারণ জনগণের মধ্যে। তিনি জনগণের হাঁড়ি ও নাড়ির খবর অন্য যে-কাহারো চাইতে ভালো জানিতেন। তাহাদের ভালোবাসিতেন অকৃত্রিমভাবে। জনস্বার্থকেই সবার উপরে স্থান দিতেন। জনগণের অধিকার প্রতিষ্ঠার জন্য সারাজীবন সংগ্রাম করিয়াছেন। জীবনের সিংহভাগ সময়ই কাটাইয়া দিয়াছেন কারার অন্তরালে। বিভাগোত্তরকালে পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠীর একচোখা নীতির প্রতিবাদ করিতে গিয়া তাঁহাকে কী অপরিসীম দুর্ভোগ মাথা পাতিয়া লইতে হইয়াছিল—তাহা আজকের বাস্তবতায় অবিশ্বাস্যই মনে হইতে পারে। কিন্তু কোনো বাধাই তাঁহাকে দমাইতে পারে নাই। তিনি একদিকে ছাত্রলীগ ও আওয়ামী লীগের মতো সংগঠন গড়িয়া তুলিয়াছেন। অন্যদিকে, ধাপে ধাপে জনগণকে তৈরি করিয়াছেন, উজ্জীবিত করিয়া তুলিয়াছেন স্বাধীনতার মন্ত্রে। লক্ষণীয় যে, বায়ান্নো হইতে একাত্তর পর্যন্ত আমাদের স্বাধীনতা সংগ্রামের প্রতিটি পর্যায়ে তিনি ছিলেন সংগ্রামী জনতার পুরোভাগে। মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে বঙ্গবন্ধু পাকিস্তানের কারাগারে বন্দী থাকিলেও তাঁহার নামেই পরিচালিত হইয়াছে সবকিছু। তিনিই হইয়া উঠিয়াছিলেন জাতির শক্তি, সাহস, আশা ও সংগ্রামের অপরাজেয় এক প্রতীক। গবেষক-পণ্ডিতদের অনেকেই বঙ্গবন্ধুকে সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ বাঙালি হিসাবে অভিহিত করিয়াছেন। ইহা অনস্বীকার্য যে, তাঁহার মতো নেতা বাঙালির ইতিহাসে আর দ্বিতীয়টি নাই, নিকট ভবিষ্যতে জন্মগ্রহণ করিবে কিনা—বলা মুশকিল। মানুষ হিসাবে তাঁহার ত্রুটি-বিচ্যুতি কিংবা সীমাবদ্ধতা থাকিতেই পারে। তবে তিনি এখন সকল আলোচনা-সমালোচনার ঊর্ধ্বে। বঙ্গবন্ধু আর কী কী দিতে পারিতেন তাহা বিবেচ্য নহে। বরং মাত্র ৫৫ বত্সরের সংক্ষিপ্ত জীবনকালে বাংলাদেশ নামের যেই অনন্য উপহারটি তিনি আমাদের দিয়া গিয়াছেন—সেই ঋণ কখনোই শোধ হইবার নহে। এই মহান নেতার জন্মদিনে জাতি কৃতজ্ঞচিত্তে তাঁহাকে স্মরণ করিবে ইহাই স্বাভাবিক। তবে তিনি যে সোনার বাংলার স্বপ্ন দেখিতেন—তাহাকে বাস্তবে রূপায়িত করিবার মাধ্যমেই কেবল আমরা তাঁহার প্রতি যথোচিত সম্মান দেখাইতে পারি।

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন