বাংলাদেশ থেকে সস্তায় শ্রমশক্তি আমদানি করতে চায় পৃথিবীর অনেক রাষ্ট্র। এ দেশের শ্রমিকদের মেধা, দক্ষতা, শ্রমযোগ, কর্মস্পৃহা, সততা, প্রত্যুত্পন্নমতি ভিন দেশের শ্রমবাজারকে আকৃষ্ট করে সহজে। ২০১২ সালের ডিসেম্বর মাসেই জি টু জি’র আওতায় মালয়েশিয়ায় কৃষি শ্রমিক যাবার কথা ছিল ১০ হাজার। সরকারের নিজস্ব ব্যবস্থাপনায় সারাদেশের ইউনিয়নগুলো হতে ওয়েবসাইটে রেজিস্ট্রেশনের মাধ্যমে একটি তালিকা করা হয়। ডিপারচার কার্যক্রম শুরুর লক্ষ্যে মেডিক্যাল, প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণ, টিকেট সংগ্রহ, ভিসা পাওয়ার কাজগুলো পরিকল্পনামাফিক বাস্তবায়িত হবার কথা। কিন্তু বাংলাদেশ সরকারের প্রতিষ্ঠানভিত্তিক জনবল প্রেরণের বিষয়টি দীর্ঘদিন যাবত্ প্রবাসী কল্যাণ মন্ত্রণালয় ও রফতানিকারক প্রতিষ্ঠান এবং এদের সংগঠন বায়রার মধ্যে দড়ি টানাটানি হচ্ছে, যা দেশের মানুষ ভিন্নভাবে দেখছে। তারা বলছে, রফতানিকারক প্রতিষ্ঠানগুলো বাংলাদেশ স্বাধীন হবার পর থেকে এ পর্যন্ত প্রায় ৮০ লাখ লোক বিদেশে পাঠিয়েছে। যে কারণে রেমিটেন্স আসা এত উচ্চ হয়েছে। ২০১২ সালে এ খাতে অর্জিত রেমিটেন্সের পরিমাণ ছিল প্রায় ১৪.১৭ বিলিয়ন মার্কিন ডলার। রফতানিকারক প্রতিষ্ঠানগুলো চিরাচরিত আচরণের কারণে সরকারের কাছে পক্ষপাতদুষ্ট হয়ে যায়।
সঠিক তথ্য পূরণকারীদের মধ্য হতে অগ্রাধিকারভিত্তিতে ছয় হাজার প্লানটেশন শ্রমিক মার্চের মধ্যে যাবার কথা মালয়েশিয়ায়। তাদের পাসপোর্ট, মেডিক্যাল রিপোর্ট ইত্যাদি মালয়েশিয়ান হাইকমিশনে পাঠানো হয়েছে ভিসার জন্য। ভিসা প্রসেসিং-এ বিলম্ব, দেশে চলমান রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতার জন্য আটকে যেতে পারে মালয়েশিয়ায় শ্রমিক প্রেরণের বিষয়টি।
ব্যুরো অব ম্যানপাওয়ার এ্যামপ্লয়মেন্ট এন্ড ট্রেনিং (BMET) সূত্রে জানা গেছে, বাংলাদেশ থেকে শ্রমিক নিয়ে প্রথম ফ্লাইটটি মার্চের ২৭ তারিখ মালয়েশিয়ার উদ্দেশে যাত্রা করার কথা। কিন্তু এ জাতীয় যাত্রার তারিখ কয়েকবার পিছিয়েছে। দুই দেশের সরকার আলোচনা করে সিদ্ধান্ত নিয়েছে যে, সর্বমোট চল্লিশ হাজার টাকার মধ্যে তারা মালয়েশিয়ায় গিয়ে পৌঁছাবে। প্রতি মাসে একজন শ্রমিক সর্বনিম্ন বেতন পাবেন বাংলাদেশি মুদ্রায় প্রায় পঁচিশ হাজার টাকা। অবশ্য গত সপ্তাহে মালয়েশিয়ার একটি জাতীয় দৈনিক পত্রিকায় খবর বেরিয়েছে এই বেতনের পরিমাণ বেশি হতে পারে। তাছাড়াও শ্রমিকদের থাকার সুবিধা থাকছে বিনে পয়সায়। শুধু খাবার বিষয়টি খেতে হবে নিজের টাকায়।
এ সময়টাতে দেশের অভ্যন্তরে বিভিন্ন জায়গায় সৃষ্টি হয়েছে নৈরাজ্য, তাণ্ডব, পুলিশি কাঠামোতে গুলি আর গুলি, গণহত্যা, হরতাল, ডরতাল, মসজিদ, মন্দির, গীর্জা, প্যাগোডা, সরকারি অফিস, থানা ইত্যাদি ভাংচুর ও জ্বালাও- পোড়াও কাজ। মালয়েশিয়া যেতে ইউনিয়ন পর্যায়ে কিছু তথ্যও নষ্ট হয়েছে। BMET সূত্রে জানা গেছে, যারা মালয়েশিয়া যেতে মনোনীত হয়েছিলেন তাদের মধ্যে দুইজন শ্রমিক মৃত্যুবরণ করেছেন । উল্লেখিত অনাকাঙ্ক্ষিত বিষয়গুলো শুধু দেশবাসীকে আতংকগ্রস্ত করে নাই, করেছে বিশ্ববাসীকেও। বাংলাদেশর সমসাময়িক বিষয় নিয়ে সৃষ্ট অস্থিরতা ও অরাজকতার জন্য ব্রিটিশ পার্লামেন্টেও ব্যাপক আলোচনা-সমালোচনা হয়েছে। কমনওয়েলথভুক্ত সদস্য রাষ্ট্র হওয়াতে তাদের রয়েছে নজরদারি ক্ষমতা। পরাশক্তির দেশ বিশ্বের কর্তৃত্বকারী আমেরিকাও জানিয়েছে গণহত্যা ও নির্যাতন করে কোন বিষয়ের সুরাহা হয় না। জাতিসংঘ ধৈর্যসহকারে সরকার পরিচালনা ও সকল দলের অংশগ্রহণের ব্যবস্থা নিয়ে আগামী দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠানের কথা বলেছে। সরকারের মেয়াদ পূর্ণ শেষ বছরে দেশের রাজনৈতিক সহিংসতা ও অস্থিরতা বৃদ্ধি পেতেই পারে। পরবর্তী সাত মাসের মধ্যে তত্ত্বাবধায়ক সরকার পূনঃপ্রবর্তন করে দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচন কাঠামো সাজানো, নির্বাচন বোর্ড পরিচালনা, মনোনয়ন, সিলেকশন, জেলা প্রশাসক, পুলিশ সুপার, ইউএনও বসানো কাজেই মন্ত্রণালয়গুলো ব্যস্ত থাকবে বেশি। তাছাড়াও অনেক মন্ত্রী-এমপির বিরুদ্ধে বিরোধী দল মানবতাবিরোধী অপরাধের দাবি উত্থাপন করেছেন। সত্য-মিথ্যা যাই হোক, এ বিষয়ে একটি মহল অনেক স্থানে ভয়-আতংক সৃষ্টি করেছে। অনেক মন্ত্রী-এমপি নিজস্ব নির্বাচনী এলাকাতেও এ সময়টাতে কর্মসূচি দিয়ে স্থগিত করেছেন, ইত্যাদি জটিল বিষয় মোকাবিলা করেই দেশের গুরুত্বপূর্ণ স্বার্থরক্ষা করতে মালয়েশিয়ায় পর্যায়ক্রমে লক্ষাদিক শ্রমিক পাঠানোর প্রস্তাবটি হাতছাড়া করা যাবে না। দ্রুত ব্যবস্থা নিয়ে বায়রাকে সম্পৃক্ত করে সমন্বিত প্রচেষ্টায় মালয়েশিয়াসহ পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে জনশক্তি রফতানি এখনই আরম্ভ করা প্রয়োজন। তাছাড়াও বাংলাদেশ জাতিসংঘের মানব উন্নয়ন সূচকে এক ধাপ এগুনোর কারণে এদেশের শ্রমবাজারের চাহিদা বিশ্বে আরো বেড়ে যেতে পারে বলে মত দিয়েছেন অর্থনীতিবিদরা।
লেখক : সাবেক ট্রেজারার, শেরে বাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়
