স্মরণীয় যাঁরা বরণীয় যাঁরা

লোককবি :শাহ আবদুল করিম

আপডেট : ১৭ মার্চ ২০১৩, ১৯:১৯
গাড়ি চলে না , চলে না, চলে না রে.....কিম্বা ‘বসন্ত বাতাসে সইগো বসন্ত বাতাসে ’ ; ‘কোন মিস্তিরি নাও বানাইছে’ ; ‘আগে কি সুন্দর দিন কাটাইতাম ’ এমন প্রায় দেড় শতাধিক গানের রচয়িতার নাম শাহ আবদুল করিম । যে গানগুলো প্রাণ ছুঁয়ে যায় সঙ্গীতপ্রেমী মানুষের। বাংলার চিরায়ত সুরের মাধুর্য এবং গানের কথার সারল্য সহজেই যে-কোন বয়সের কণ্ঠে প্রাণবন্ত হয়ে ওঠে। সুনামগঞ্জের কালনী নদীর কূলে উজানধল গ্রামের সবুজ প্রান্তরে তিনি বেড়ে উঠেছেন। জন্ম ১৯১৬ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারি। শিশু বয়স থেকেই দেখেছেন দারিদ্র্যের রুদ্র রূপ। কিন্তু অন্তরে বেজে ওঠতো বাংলার মানুষ আর প্রকৃতির নানান ভাব-রূপ-রসের সুর। গানের কথা অত্যন্ত সাদাসিধে হলেও এর মধ্যে রয়েছে ভাটি অঞ্চলের মানুষের দিনযাপন আর অসাম্প্রদায়িক চেতনা। ‘আগে কি সুন্দর দিন কাটাইতাম ’ গানটিতে বাংলার মানুষের চিরন্তন সম্প্রীতির যে চালচিত্র তুলে ধরেছেন , তা আজ সত্যিই শিথিল হয়ে গেছে। ভাববাদী কবির হূদয়ে তা বেদনার সৃষ্টি করেছে। স্বল্পশিক্ষিত হলেও শাহ আবদুল করিমের গানের বাণী ও সুর সংস্কৃত,হূদয়গ্রাহী।ঘরের ছেলে ঘরে সমাদৃত হয় অনেক পরে। এমনটাই যেন স্বভাবিক। শাহ আবদুল করিমের গান এদেশের মানুষের প্রাণে দোলা দিলেও তাঁর যথার্থ কদর বুঝতে অনেক সময় লেগেছে। লন্ডনের বাঙালি পাড়ায় তাঁর গান সাড়া জাগালো। মৌলভীবাজারের স্টুডিওতে আঞ্চলিক শিল্পীদের কণ্ঠে ধারণ করা আবদুল করিমের গান বৃটেনের টিভি চ্যানেল এসএ তে প্রচার হওয়ার পর অনেকেই আগ্রহী হলেন এই মরমী কবির প্রতি। ৫০ এর দশক থেকে তিনি জাতীয় পর্যায়ে গণসঙ্গীত পরিবেশন করতে থাকেন। প্রয়াত ড. মৃদুল কান্তি চক্রবর্তী তাঁকে গণসঙ্গীত শিল্পী হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন। গীতিকবি রফিকুজ্জামানের ভাষ্য— শাহ আবদুল করিম শ্রেষ্ঠ লোককবি এবং লোকসঙ্গীত স্রষ্টা। লোকগীতি,শরিয়তি,মারফতি,নবুয়ত,মরমী প্রভৃতি বিভিন্ন ধরণের গান তিনি রচনা করতেন এবং গাইতেন। ২০০০ সালে সাহিত্যিক আবদুর রউফ চৌধুরী পদক , ২০০১ সালে একুশে পদক, দ্বিতীয় সিটিসেল চ্যানেল আই মিউজিক অ্যাওয়ার্ডে আজীবন সম্মাননা দিয়ে তাঁকে সম্মান জানানো হয় এই নিভৃতচারী সুরস্রষ্টাকে। এঁরা খ্যাতির প্রলোভনে প্রলুব্ধ নন বরং প্রাণের তাগিদেই এঁদের সৃজনী-প্রতিভা বিকশিত হয়। আজও আমাদের প্রণোদিত করে এসব লোকসঙ্গীত। আমরা উজ্জীবিত হই সেই গানে —‘ আগে কি সুন্দর দিন কাটাইতাম’। ২০০৯ সালের ১২ সেপ্টেম্বর বাংলার এই মরমী কবির জীবনাবসান ঘটে। আত্মপ্রচারবিমুখ এসব মানুষ স্মরণীয় হবার মানসে কিছুই করেন নি, কিন্তু বাংলা গানের জগতে তাঁরা চিরদিন স্মরণীয় বরণীয় হয়ে থাকবেন এ কথা অনস্বীকার্য।