শান্তির জটিল সমীকরণ আফগানিস্তানে

আপডেট : ১৭ মার্চ ২০১৩, ২০:২২
শেষ কবে আফগানিস্তানের মানুষ শান্তিতে ছিল তা হয়তো অনেকেই মনে করতে পারবেন না। বিরাজমান অশান্ত পরিস্থিতি থেকে মুক্তি পেতে তালেবানের সঙ্গে আলোচনার চেষ্টা চালাচ্ছে আফগান সরকার। এ লক্ষ্যে গঠন করা হয়েছে ‘হাই পিস কাউন্সিল’। তাদের কাজ তালেবানের সঙ্গে কথাবার্তা বলা। কিন্তু তালেবানরা বলেছে তারা প্রেসিডেন্ট হামিদ কারজাইয়ের সরকারের সঙ্গে কথা বলবে না। কেননা কারজাই সরকার হলো যুক্তরাষ্ট্রের তৈরি ‘পুতুল প্রশাসন’। অথচ তালেবানের পাশাপাশি দেশে মোতায়েন থাকা মার্কিন সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে প্রতিবাদী হয়ে উঠছেন তালেবান-কথিত ‘পুতুল’ আফগান প্রেসিডেন্ট হামিদ কারজাই স্বয়ং। গত সপ্তায় তিনি যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে ক্ষোভ জানিয়েছেন, তালেবান ও মার্কিন সেনারা ষড়যন্ত্র করে প্রমাণ করার চেষ্টা করছে যে, মার্কিন সেনারা আফগানিস্তান থেকে চলে গেলে সেখানে আবার সহিংসতা ছড়াবে। পরিস্থিতি হয়ে উঠবে আরও খারাপ। তবে সম্প্রতি অবস্থা যা দাঁড়িয়েছে তাতে কোনো জায়গায় আঘাত হানা কট্টরপন্থিদের কাছে বাঁ হাতের খেলা। চলতি বছরেই আফগান প্রশাসনের অন্তত পাঁচ জন মন্ত্রী বা দুঁদে আমলার মৃত্যু হয়েছে তালেবান হামলায়। সাবেক এক তালেবান সদস্য দল ছেড়ে সমাজকল্যাণমূলক কাজে যোগ দিয়েছিলেন। খুন হয়েছেন তিনিও। ন্যাটো থাকতেই এই অবস্থা, চলে গেলে যে পরিস্থিতি আরও সঙ্গীন হবে তা বুঝতে যে বেশি পরিশ্রম করতে হচ্ছে না পাঠানদের তা বলাই বাহুল্য। তাই প্রশাসনের ওপর বেশি ভরসা না করে নিজেদের নিরাপত্তার ব্যবস্থা নিজেরাই করে নিতে শুরু করেছেন তারা। আঞ্চলিক জঙ্গি নেতারা তো বটেই, অতীতে যারা হাতে অস্ত্র নিয়েছিলেন তারাও ফিরতে শুরু করেছেন নিজেদের পরিচিত পথেই। বন্দুক বেচেই বহু টাকা আয় করা যাচ্ছে কাবুলে। ক্ষমতায় থাকার সময় তালেবানরা শরিয়াহিভত্তিক কট্টর শাসন প্রতিষ্ঠা করেছিল। নারীদের প্রতি বিরূপ আচরণের জন্য তারা আন্তর্জাতিক মহলে নিন্দিতও হয়েছিল। নারীদের শুধু বোরকা পরতেই বাধ্য করা হতো না, আট বছর বয়সের পর তাদেরকে চাকরি বা শিক্ষা লাভ করার পথ বন্ধ করে দেয়া হতো। ২০০১ সালে ১১ সেপ্টেম্বর যুক্তরাষ্ট্রে টুইন টাওয়ার ধ্বংসের পর ৭ অক্টোবর মার্কিন নেতৃত্বাধীন যৌথবাহিনী আফগানিস্তানে আগ্রাসন চালায় এবং একই বছরের ডিসেম্বরে তালেবান সরকারকে ক্ষমতাচ্যুত করে। সে সময় তাদের নেতা মোল্লা মুহাম্মদ ওমর ও সিনিয়র তালেবান নেতারা এবং ওসামা বিন লাদেন ও তার আল-কায়েদা সহযোগীরা বিশ্বের বিভিন্ন দেশে আত্মগোপন করে। তবে এই মুহূর্তে আফগান রাষ্ট্রনায়কের সঙ্গে মার্কিন প্রশাসনের সম্পর্ক মোটেই ভালো নয়। দিনকয়েক আগেই আফগানিস্তানে মোতায়েন মার্কিন বাহিনীর বিরুদ্ধে অকারণ অত্যাচার ও হত্যার অভিযোগ এনে তাদের ওয়ারডাক অঞ্চল ছেড়ে চলে যাওয়ার হুঁশিয়ারি দিয়েছিলেন কারজাই। বেঁধে দিয়েছিলেন সময়সীমাও। যদিও মার্কিন সেনা এর মধ্যেই ওই অঞ্চল ছেড়ে যাচ্ছে কি না, পেন্টাগনের পক্ষ থেকে এখনও পর্যন্ত তা স্পষ্ট করা হয়নি। পাশাপাশি কারজাইয়ের যাবতীয় অভিযোগও অস্বীকার করেছে মার্কিন প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়। এদিকে তালেবান ইস্যুতে আফগান প্রেসিডেন্ট কারজাই মার্কিন সরকারের দ্বৈতনীতির সমালোচনা করছেন কঠোরভাবে। কারজাই অভিযোগ করে বলেন, ‘তালেবান ও মার্কিন কর্মকর্তারা একসঙ্গে চা-চকলেট খায় আর তারাই এসে একসঙ্গে আফগান বেসামরিক নাগরিকদের ওপর হামলা চালায়।’ কারজাইয়ের মতে, কথিত সন্ত্রাসবাদ বিরোধী মার্কিন লড়াইয়ের আড়ালে অন্য সত্য লুকিয়ে আছে। তিনি মনে করেন, আফগানিস্তানের মাটির নিচে লুকিয়ে থাকা প্রাকৃতিক সম্পদ হাতিয়ে নেয়ার উদ্দেশ্যেই মার্কিন বাহিনী আফগানিস্তানের ওপর হামলা চালিয়েছে। অথচ তারা সে সময় নাম দিয়েছিল সন্ত্রাসবাদ বিরোধী লড়াই। শুধু তাই নয়— তালেবানদের উত্খাতের নামে মার্কিন সরকার আফগানিস্তান দখল করে নিয়েছে। আফগানিস্তানের হেলমান্দ প্রদেশে গত মঙ্গলবার এক সফরে গিয়ে হামিদ কারজাই এ ব্যাপারে আরো স্পষ্ট করে কিছু কথা বলেন। তিনি বলেন, ‘আমেরিকানরা খনির চুক্তিগুলো তাদেরকে দেয়ার জন্য আফগানদেরকে বলছে। হেলমান্দে বহু খনি রয়েছে এবং প্রথম থেকেই তারা খনি অনুসন্ধানের কাজ চালিয়ে যাচ্ছে। তারা ফটোগ্রাফির কাজ শেষও করে ফেলেছে। কিন্তু এখন তারা বুঝতে পেরেছে যে, আমরা তাদের উদ্দেশ্যে জেনে গেছি।’ ২০১৪-তে ন্যাটো বাহিনীর বিদায়, কিংবা অন্য কোনো ভাবে থেকে যাওয়া, অথবা অন্য কোনো দুরভিসন্ধি— সব মিলিয়ে সম্ভবত আরো অস্থির সময়ের দিকেই এগিয়ে যাচ্ছে আফগানিস্তান। শান্তি বা স্বস্তির জীবন আফগানদের ভাগ্যে নিকট ভবিষ্যতেও সহজে মিলবে না বলেই মনে করছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা।