১৯৪৭ সালে পকিস্তান স্বাধীন হওয়ার পর এই প্রথম দেশটির কোন পার্লামেন্ট পাঁচ বত্সর মেয়াদ পূর্ণ করিতে সক্ষম হইল। গত বৃহস্পতিবার এই মেয়াদ পূর্ণ হইয়াছে এবং ঐ দিনই পাকিস্তান পিপলস পার্টির (পিপিপি) নেতৃত্বাধীন ১৩তম জাতীয় পরিষদ বা পার্লামেন্ট বিলুপ্ত করা হইয়াছে। পাকিস্তানে গণতন্ত্রের জন্য এই খবরটি খুবই ইতিবাচক যেখানে সামরিকতন্ত্র বরাবরই শক্তিশালী। তবে তাহার চাইতেও বড় কথা হইল, দেশটিতে পার্লামেন্ট বিলুপ্তির পর আগামী সাধারণ নির্বাচন পরিচালনার জন্য একটি নির্দলীয় তত্তাবধায়ক সরকার দায়িত্ব গ্রহণ করিতে যাইতেছে। তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান কে হইবেন ইহা লইয়াই এখন আলোচনা চলিতেছে।
উল্লেখ্য, ২০১২ সালের ১৪ ফেব্রুয়ারি সংবিধানের ২০তম সংশোধনীর মাধ্যমে জাতীয় নির্বাচন পরিচালনার জন্য পাকিস্তানে তত্ত্বাবধায়ক সরকার পদ্ধতি প্রতিষ্ঠার পথ সুগম করা হয়। নিয়ম অনুযায়ী পার্লামেন্ট বিলুপ্তির তিন দিনের মধ্যে সরকারি ও প্রধান বিরোধী দল তত্ত্বাবধায়ক প্রধানমন্ত্রী পদের জন্য তিন জন করিয়া ব্যক্তির নাম প্রস্তাব করিবেন। তাহাদের কোন একজনও প্রার্থীর ব্যাপারে একমত না হইতে পারিলে আট সদস্যের একটি সর্বদলীয় সংসদীয় কমিটি গঠন করা হইবে। এই কমিটিও ব্যর্থ হইলে নির্বাচন কমিশন প্রার্থী চূড়ান্ত করিবে। এখন দেখিবার বিষয়, পাকিস্তান সর্বসম্মতভাবে ও কত সহজে প্রথম তত্ত্বাবধায়ক সরকার গঠন করিতে সক্ষম হয়।
পাকিস্তানে যখন তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠিত হইতে যাইতেছে তখন বাংলাদেশে তত্ত্বাবধায়ক সরকারকে ইস্যু করিয়াই রাজনৈতিক অঙ্গন উত্তপ্ত হইয়া উঠিয়াছে। বিরাজ করিতেছে ভয়াবহ অস্থিরতা ও অস্থিতিশীলতা। বাংলাদেশে ১৯৯৬ সালে সাংবিধানিকভাবে তত্ত্বাবধায়ক সরকার প্রতিষ্ঠিত হয়। এই সরকারের অধীনে কয়েক দফা নির্বাচনও হয় সুষ্ঠুভাবে। তবে ২০০৭ সালের পর যে তত্ত্বাবধায়ক সরকার প্রতিষ্ঠিত হয় তাহাকে বলা হয় সামরিক সমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকার। এই সরকার নিয়া বিতর্ক ওঠে এবং তাহার পরিণতিতে ২০১২ সালে বর্তমান সরকার সুপ্রিম কোর্টের এক রায়ের সূত্র ধরিয়া বাতিল করে। কিন্তু বিরোধী দলগুলি ইহা মানিয়া লয় নাই। যাহারা এক সময় এই সরকারের ধারণার বিরোধিতা করিয়াছিল তাহারাই এখন ইহার শক্ত সমর্থক। আবার যাহারা এই সরকার ব্যবস্থা আনিতে গিয়া দেশব্যাপী সহিংস আন্দোলন করিয়াছিল তাহারাই এখন ইহার ঘোর বিপক্ষে।
উপরোক্ত সংকট হইতে আমরা আজও বাহির হইয়া আসিতে পারিতেছি না। অথচ তত্ত্বাবধায়ক সরকারের ধারণা আজ বিশ্বের দেশে দেশে ছড়াইয়া পড়িতেছে। শুধু পকিস্তানেই নহে, সার্কের অন্যতম দেশ নেপালেও এই ধরনের সরকার প্রতিষ্ঠিত হইয়াছে। কয়েক দিন আগে ইউরোপের দেশ বুলগেরিয়ায়ও একটি তত্ত্বাবধায়ক সরকার প্রতিষ্ঠিত হইয়াছে। এই সরকারের লক্ষ্য হইবে অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করা। অর্থনৈতিক দুরবস্থা ও তাহা হইতে জনবিক্ষোভের মুখে সেখানে মধ্য ডানপন্থি সরকারের পতন হয়। অস্ট্রেলিয়া ও নিউজিল্যান্ডেও এই ধরনের সরকারের অস্তিত্ব রহিয়াছে। সাধারণত এই ধরনের সরকার অস্থায়ী ভিত্তিতে গঠিত হয় যাহার প্রধান উদ্দেশ্য রাজনৈতিক অস্থিরতার নিরসন ও একটি সুষ্ঠু নির্বাচনের মাধ্যমে পরবর্তী সরকারের হাতে ক্ষমতা হস্তান্তর। তাহারা নির্বাচিত সরকার না আসা পর্যন্ত রাষ্ট্রের স্বাভাবিক ও দৈনন্দিন কার্যাবলী সম্পাদন করিয়া থাকেন। যাহা হউক, অন্য দেশে যখন তত্ত্বাবধায়ক সরকারের ধারণা সম্প্রসারিত হইতেছে, তখন বাংলাদেশে ইহা লইয়া কেন সংকটের সৃষ্টি হইয়াছে তাহা লইয়া গভীরভাবে ভাবিয়া দেখিতে হইবে। আমরা মে মাসে অনুষ্ঠিতব্য পাকিস্তানের সাধারণ নির্বাচন অনুষ্ঠান ও অব্যাহত গণতন্ত্র চর্চার সাফল্য কামনা করি।
