নেতারাই পারেন দেশে শান্তি আনতে

আপডেট : ১৭ মার্চ ২০১৩, ২০:৩৩
সবরকম অঘটনের দেশ বাংলাদেশ। সবরকম হুজুগ ও গুজবের দেশ বাংলাদেশ। অর্থ-বিত্ত, ক্ষমতা দখল ও আঁকড়ে রাখার সবরকম অপকৌশলের দেশ বাংলাদেশ। ৪২ বছর পূর্বে যারা দেশের স্বাধীনতার বিপক্ষে হানাদার পাকিদের বিশ্বস্ত ভৃত্য সেজে বাঙালি নিধন, নির্যাতন, ধর্ষণ, লুণ্ঠন, অগ্নিসংযোগ, ধর্মান্তরিতকরণ ইত্যাদি কুকর্মে লিপ্ত ছিল বিচারে তাদের একজনের ফাঁসির আদেশ হলো, অমনি জামায়াত শিবিরের সহিংসতা চরম আকার ধারণ করলো। রাস্তায় প্রতিবন্ধকতা, বাসে, ট্রেনে অগ্নিসংযোগ, রেললাইন উপড়ে ফেলাসহ বিধ্বংসী সবরকম কাজে জামায়াত কর্মী ও ধর্মান্ধ অনুসারীরা লিপ্ত হয়। গত কয়েক বছরে যা ঘটেনি কয়েকদিনের তাণ্ডবে প্রায় একশ’ মানুষ প্রাণ হারালো, সংখ্যালঘুদের ঘরবাড়িতে আগুন জ্বললো। ৪৮ ঘন্টার টানা হরতালে দেশের অর্থনীতির মেরুদণ্ড ভেঙে গেলো। অগ্নিতে ঘৃতাহুতির মতো ৪৮ ঘন্টার হরতালের সাথে বিএনপি আরও ১২ ঘন্টার হরতাল যোগ করে জনমানুষ ও দেশের চরম ক্ষতি সাধন করলো। সাঈদীকে চাঁদে দেখা গেছে, এ গুজব ছড়িয়ে ধর্মভীরু সরল মানুষকে উত্তেজিত করে বগুড়া শহরে ধ্বংসলীলা চালানো হলো। ৬০ ঘন্টার হরতালে জাতির মেরুদণ্ড কৃষকের অবিক্রিত ক্ষেতের ফসল ক্ষেতে পচে গেল, খেটে-খাওয়া মানুষেরা উপোস করলো, ব্যবসার কাজে বা বেড়াতে গিয়ে দূর-দূরান্তে মানুষ নিরুপায় হয়ে আটকা পড়লো। ৬০ ঘন্টার হরতালে আমদানি, রপ্তানি ও উত্পাদন থেমে গেলো, দেশের ক্ষতি হলো অন্তত ৬,০০০ কোটি টাকার। স্কুল, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়ের পরীক্ষা ও ক্লাসের যে ক্ষতি হয়েছে তা অপরিমেয়। পুলিশসহ নিরপরাধ যারা মারা গেলো সে ক্ষতি পূরণ করতে পারবে কেউ? দুর্ভাগ্যের বিষয় হলো ৪২ বছর পূর্বে সংঘটিত অপরাধ সবার জানা, এর বিচার হবে এটাও সবার জানা ছিল, তথাপি কেন এ বিদ্রোহ ? কারণ ৪২ বছর পূর্বে জন্ম নেয়া বিষবৃক্ষের চারাটি মাটির নিচে শক্তিশালী মূল গজিয়ে এবং মাটির ওপরে অসংখ্য শক্ত ডালপালা ছড়িয়ে বিরাট মহীরুহে পরিণত হয়েছে। এই বিরাটকার গাছটির মূলোত্পাটন করতে যেয়ে চতুর্মুখী বাধা ও বিপত্তি, প্রকাশ্যে, চোরাগোপ্তা পথে, লাঠিসোটা ও অস্ত্র নিয়ে আক্রমণ খুবই অপ্রত্যাশিত এবং দুঃখজনক। এরপরও ঝড়ের পূর্বাভাস শোনা যায়। ৬০ ঘন্টার হরতালের পরও বিরোধী দল বা জামায়াত হরতালের হুমকি দিচ্ছে। বাস্তবে অন্য কোন যুদ্ধাপরাধীর মৃত্যুদণ্ডের আদেশ শোনা মাত্র অনুরূপ হরতাল ও বিপর্যয় নেমে আসতে পারে। আওয়ামী লীগ ও স্বাধীনতার পক্ষের মানুষ বলছে তারা হরতাল প্রতিহত করবে, প্রজন্মের গণজাগরণ মঞ্চ বলছে তারা হরতাল প্রতিহত করবে। কিন্তু বাস্তবে গত ৬০ ঘন্টায় তারা কতটুক কৃতকার্য হয়েছে। সবকিছু বন্ধ ছিল, শুধু ট্রেন ও রাস্তায় কিছু যানবাহন চলাচল করলেই হরতালের ক্ষতি বন্ধ হয় না। হরতাল এমন একটি বস্তু যা সরকার কর্তৃক দমন করা যায় না। আহবানকারীরা মিডিয়ায় ঘোষণা ছড়িয়ে দেয় আর শীতাতপ কক্ষে বসে টিভির পর্দায় নাটক দেখে। মানুষ জান-মালের ক্ষতির ভয়ে বাড়ি থেকে বের হয় না। হরতালের মতো আরামদায়ক রাজনৈতিক কর্মসূচি দ্বিতীয়টি নেই। আওয়ামী লীগ, স্বাধীনতার পক্ষের মানুষ ও গণজাগরণ মঞ্চ এখন বলছে জামায়াতকে নিষিদ্ধ করতে। সরকারের পক্ষে কাজটি সহজ না হলেও কর্মটি সম্পন্ন করতে হবে। বিষবৃক্ষের মূলোত্পাটন সম্ভব না হলেও বেড়া দিয়ে এটাকে আটকিয়ে দিতে হবে। কিন্তু জামায়াতকে নিষিদ্ধ করলে আরও হরতাল, আরও সহিংসতার সম্ভাবনা রয়েছে। তাই দেশটাকে বাঁচাতে হলে সরকারের নিকট এ মুহূর্তে একটি বিকল্প রয়েছে, তা হলো প্রথমে হরতাল নিষিদ্ধ করা। প্রতিবাদের অন্যান্য সমস্ত কর্মসূচি বৈধ রেখে হরতালের সর্বনাশী ক্ষতি বিবেচনা করে হরতাল আহ্বান করাকে নিষিদ্ধ করলে সরকার সহিংসতা বন্ধ করতে পারবে বলে আমার বিশ্বাস। বর্তমান ক্ষমতাসীন জোট সরকারের হাতে নিরংকুশ ক্ষমতা আছে। দেশ ও জনগণের স্বার্থের কথা বিবেচনা করে তারা যদি আজ হরতাল নিষিদ্ধ করেন তাহলে বিরোধী দলগুলো ছাড়া সবাই সাধুবাদ ও কৃতজ্ঞতা জানাবে। বিরোধীদল ক্ষমতায় এসে তা আবার উল্টালে জনসমর্থন পাবে না। সুতরাং হরতাল প্রতিহত করা, দমন করা বা আটকানোর অবাস্তব এবং অকার্যকর পদক্ষেপ না নিয়ে হরতাল নিষিদ্ধ করার পদক্ষেপ নেয়াই সরকারের জন্য বুদ্ধিমানের কাজ হবে। দলের স্বার্থ ত্যাগ করে দেশের স্বার্থে হরতাল নিষিদ্ধ করলে সরকার জনমনে প্রশংসনীয় ও অমর হয়ে থাকবে এবং জনদাবি সমর্থনে বাকি কাজগুলো সম্পন্ন করতে সমর্থ হবে। হরতাল যে পদ্ধতিতেই বা যাদের দ্বারাই প্রতিহত বা দমন করা হোক না কেন, তাতে সহিংসতা ও প্রাণহানির সম্ভাবনা থাকে, এজন্য নিষিদ্ধ করাটাই সর্বোত্তম এবং এ ক্রান্তিলগ্নটি উপযুক্ত সময়। লেখক :এফসিএ ও কথাসাহিত্যিক

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন