আমাদের অস্তিত্বের শিকড়ে পানির প্রক্ষালন এখন অতীব জরুরি। জাতিসত্তায় যে ঘুণ ধরেছে তা সমূলে বিনাশ করাও জরুরি। একটি রাষ্ট্র, একটি ভাষা, একটি মুক্তিযুদ্ধ সবকিছুতেই এখন বিভাজন। অস্তিত্বের প্রশ্নে আমরা এখন একটি দেশের অস্তিত্বের কথা ভাবি না, একটি ভাষার অস্তিত্বের কথা ভাবি না, একটি মুক্তিযুদ্ধের অহংকারের কথা ভাবি না। আমরা এখন দলীয় অস্তিত্ব ভাবি, জোটের অস্তিত্ব ভাবি, সর্বোপরি ব্যক্তিগত অস্তিত্বের কথা ভাবি। ফলে আমাদের অস্তিত্বের মূল বৃক্ষটিকে সতেজ করার কথা বলছি। জানি এই ক্ষুদ্র একজন নাগরিকের কথায় কারো অন্তর আন্দোলিত করবে না, কারো চোখে নতুন কোন স্বপ্নের জন্ম দেবে না, কারো মস্তিষ্কে এর কোন ছায়াপাত পড়বে না বা ভাবনার আকাশে দেশপ্রেমের প্রভাব মুক্ত-পাখির মতো ছুটোছুটি করবে না। তারপরও, ভেতরের দেশাত্মবোধ থেকে, হূদয়ের তাড়না থেকে কথাগুলো বলা। যদি দায়িত্বশীল কেউ কখনো তার নিজস্ব জায়গা থেকে এর মর্ম উপলব্ধি করেন সেই প্রত্যাশাটা বড় ক্ষীণ হলেও বিশ্বাস থেকে সরে দাঁড়াতে পারি না। বিশ্বাসে বিশ্বস্ত থাকাও কষ্টসাধ্য, তবু আবেগকে কখনো-কখনো প্রশ্রয় দিতেই হয়।
বিভক্তিটা কবে থেকে শুরু জানা নেই। তবে যতদিন যাচ্ছে ততই এই বিভক্তির জোরালো ভূমিকা আরো প্রকটভাবে দৃশ্যমান হচ্ছে। আওয়ামী লীগের পক্ষ থেকে ঘোষণা করা হয়েছে সন্ত্রাস প্রতিরোধ কমিটি গঠন করার এবং বিএনপির পক্ষ থেকে পাল্টা কমিটি গঠন করার ঘোষণা দেওয়া হয়েছে, যা হবে সেফটি কমিটি। সন্ত্রাস প্রতিরোধ কমিটি এবং সেফটি কমিটির কার্যপরিধি কী হবে তা নিশ্চিত নই, কিন্তু বলা হয়েছে জননিরাপত্তা নিশ্চিত করা হবে। জননিরাপত্তা নিশ্চিত করার জন্য যদি সরকারকে কমিটি গঠন করার দরকার হয় তা হলে পুলিশ, র্যাব বা অন্যান্য বাহিনীর কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন উঠা স্বাভাবিক। এ সকল বাহিনীর প্রয়োজনীয়তা নিয়েও প্রশ্ন উঠতে পারে। অন্যদিকে বিএনপি সেফটি কমিটি দিয়ে কাদেরকে কিভাবে সেফ করবেন সে প্রশ্ন অবান্তর নয়। বরং আমরা আপাতদৃষ্টিতে বুঝে নিতে পারি, এই দুই কমিটিকে মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে সংঘর্ষে লিপ্ত হতে সহায়তা করা হচ্ছে। জনসাধারণের মধ্যে ভীতি সৃষ্টি করা হচ্ছে। ঠিক একই রকম, যেমন জোট আর মহাজোট, যেমন আওয়ামী লীগ আর বিএনপি। পক্ষ আর বিক্ষপ। এরকম পক্ষ-বিপক্ষ সৃষ্টি করে উভয় দলই ফায়দা হাসিলের চেষ্টায় নিমগ্ন তা বলার অপেক্ষা রাখে না। সংঘর্ষ হলে তখন আওয়ামী লীগ বলবে সন্ত্রাস প্রতিরোধ কমিটির উপর সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড চালিয়েছে ঐ বিএনপি-জামাত-শিবির। অপরদিকে বিএনপি বলবে সরকারের গুণ্ডাবাহিনী লেলিয়ে দিয়ে নিরীহ নিরপরাধ দলীয় নেতা-কর্মীর উপর হামলা চালিয়েছে এই ফ্যাসিবাদী সরকার, তাদেরকে এখনই উত্খাত করতে হবে। এসব কথার পিঠে চলে আসতে পারে হরতালের ডাক। সাধারণ জনগণের নামেই সবকিছু। কিন্তু এই সাধারণ জনগণ যে যাঁতাকলে পিষ্ট হতে হতে কোথায়ও দাঁড়াবার জায়গাটি পাচ্ছে না সে কথা কে বুঝবে? বিএনপির কমিটি প্রসঙ্গে আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক জনাব মাহবুবুল আলম হানিফ বলেছেন, একাত্তরেও তারা শান্তি কমিটি গঠন করেছিল। জনাব হানিফকে বলতে চাই, এই সেফটি কমিটি গঠন করার ইন্ধনটা কে যুগিয়েছে? সন্ত্রাস প্রতিরোধের জন্য কেন কমিটি গঠন হবে? আপনাদের কথাই প্রমাণ করে প্রশাসন ব্যর্থ। প্রশাসন ব্যর্থ সহিংসতা ঠেকাতে, প্রশাসন ব্যর্থ দুর্নীতি ঠেকাতে, প্রশাসনের জোরালো ভূমিকা পরিলক্ষিত হচ্ছে না। এর দায়ভার অবশ্যই সরকারকে নিতে হবে। কিন্তু সরকারের হয়ে মাননীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বললেন, হরতালের সহিংস ঘটনায় মৃত ব্যক্তিদের দায় সরকার নিবে না। এর চেয়ে বড় ব্যর্থতা আর হয় না। আমরা জানি দেশের মানুষের নিরাপত্তার প্রশ্নে সকল দায় সরকারকেই বহন করতে হয়।
বিভক্তির জায়গাটি এত পরিষ্কার হয়ে গেছে যে, এক দল পাতাল-রেল বানাতে চাইলে অন্য দল আকাশ-রেল বানাতে বলবেন। গণজাগরণ মঞ্চ নিয়েও এমন বিভক্তি। এক দল বলছেন এর প্রয়োজনীয়তা নেই, অন্য দল বলছেন আছে। জামাত-শিবির নিষিদ্ধ করার প্রশ্নেও একই কথা। অবশ্য জামাতের রাজনীতি নিষিদ্ধ করতে বৃহত্তর বেঞ্চ গঠন করা হয়েছে। এখন অপেক্ষার পালা। আমরা যা ভাবতে পারি না, এই মুহূর্তে সেটাই আশা করতে চাই মনেপ্রাণে- তা হলো এই দুটি বৃহত্ দলের মধ্যে সংলাপ এবং রাষ্ট্রীয় স্বার্থে একতা ও সমঝোতা। তত্ত্বাবধায়ক সরকার প্রশ্নে সংলাপের বিকল্প নেই। এরকমটি না হলে যেভাবে তাজা প্রাণ ঝরতে শুরু করেছে আরো কত প্রাণ বলি হবে কে জানে। শুধু শিবিরই নয়, সাধারণ মানুষ মরছে, পুলিশ মরছে, শিশু মরছে। ব্লগার রাজীব হত্যার পরে আবার নারায়ণগঞ্জে হত্যা করা হয়েছে মেধাবী ছাত্র ত্বকীকে। এই মৃত্যুর শোক কাটিয়ে উঠার আগেই সুরকার আহমেদ ইমতিয়াজ বুলবুলের ভাই আহমেদ মিরাজ উদ্দিনকে হত্যা করা হল। এতসব হত্যার ভেতর দিয়ে একটি দেশ এগোতে পারে না। এই হত্যার জন্য কেউ না কেউ দায়ী। সরকাকেই নিতে হবে দায়িত্ব, যেন নির্বিচারে এমন হত্যার ঘটনা না ঘটে। হরতালের ব্যাপারেও সরকারকে একটি বড় ভূমিকা নিতে হবে। হরতাল যাতে না হয় অথবা হরতালের বিকল্প কী হতে পারে তার সিদ্ধান্ত নেয়াটা জরুরি। এত ক্ষতি মেনে নেয়া কষ্টকর।
আমাদের অন্তর কাঁদে। আমরা সুন্দর, স্বচ্ছ, নির্ভেজাল একটি দেশ চাই। দেশের মানুষের নিরাপত্তা চাই। প্রতিটি নাগরিকের ব্যক্তিস্বাধীনতা চাই। কতিপয় সন্ত্রাসী আর দুর্নীতিবাজের কারণে একটি দেশের অধঃপতন মেনে নেয়া যায় না। যখন যে সরকারই ক্ষমতায় থাকুক না কেন তাদের কাছে আমাদের প্রত্যাশা অনেক। যারা চাপাতি দিয়ে কুপিয়ে মানুষ হত্যা করে, যারা গুলি ছুঁড়ে পুলিশ হত্যা করে, যারা অফিস-আদালতে, গাড়িতে-বাড়িতে, মন্দিরে-গীর্জায় অগ্নিসংযোগ করে তাদেরকে কে প্রশ্রয় দেয়? হলমার্ক, ডেসটিনি, বিসমিল্লাহ গ্রুপের মতো দুর্নীতিবাজদের কে প্রশ্রয় দেয়? প্রশ্রয়ের ভিতটা ভেঙে ফেলার দায়িত্ব সরকারেরই। সুখ-শান্তি আর সমৃদ্ধশালী একটি দেশ গড়ার প্রত্যয়ে আমাদের একতাবদ্ধ হওয়া জরুরি। এখনই জরুরি। দলীয় দৃষ্টিভঙ্গি আলাদা থাকতে পারে, মতের পার্থক্য থাকতে পারে। কিন্তু দেশের প্রশ্নে, মানুষের প্রশ্নে কোন দ্বিমত থাকতে পারে না। আওয়ামী লীগের আ-কমিটি বা জাতীয়তাবাদী দলের জা-কমিটি—কোন কমিটিরই প্রযোজন নেই। দেশের প্রচলিত আইনেই সন্ত্রাস দমন করা সম্ভব। আমাদের ভাববার সময় হয়েছে। আমরা এখন কী করতে পারি। যে বিয়াল্লিশটি বছর অবহেলা-অনাদরে কেটেছে, আর নয়—আগামী দিনগুলো আমাদের জন্য সুখময় হোক। আমাদের সন্তানেরা বেড়ে উঠুক আপন আলোয় উদ্ভাসিত হয়ে। তাদের জন্য আরো প্রশস্ত হয়ে উঠুক হূদয়ের মাঠ, বিস্তৃত হয়ে উঠুক স্বপ্নের আকাশ। সুনির্মল বায়ু বয়ে বেড়াক সারা বাংলাদেশের বুকটি জুড়ে।
লেখক : শিশুসাহিত্যিক
[email protected]
