‘জয়দেবপুরের পথ ধরো বাংলাদেশ স্বাধীন করো’

আপডেট : ১৮ মার্চ ২০১৩, ২০:০৫
ঢাকা থেকে ময়মনসিংহ অথবা টাঙ্গাইল কিংবা উত্তরাঞ্চলের জেলাগুলোতে যাবার পথে গাজীপুর (তত্কালীন জয়দেবপুর) চৌরাস্তায় অস্ত্র হাতে বিশালাকৃতির একজন মুক্তিযোদ্ধার প্রতিকৃতি সহজেই সকলের দৃষ্টি কাড়ে। চলতি পথে অনেকেই জানতে চান এটা কিসের স্মৃতিস্তম্ভ বা কার প্রতিকৃতি। অনেকে না জানলেও গাজীপুরের মানুষের কাছে এ স্মৃতিস্তম্ভ তাদের অহঙ্কার আর গর্বের ধন, তাদের পরিচয়ের ঠিকানা। ১৯৭১ সালের ঐতিহাসিক ১৯ মার্চ পাক হানাদারদের বিরুদ্ধে জয়দেবপুরের মানুষ প্রথম সশস্ত্র প্রতিরোধ গড়ে তুলেছিল। এখানেই প্রথম গর্জে উঠে বাঙালির অস্ত্র। সেসময় জয়দেবপুরের ঐতিহাসিক ভাওয়াল রাজবাড়ীতে (বর্তমান জেলা প্রশাসকের কার্যালয়) অবস্থান ছিল দ্বিতীয় ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের। এ রেজিমেন্টের ২৫/৩০ জন জওয়ান অফিসার ছাড়া সকলেই ছিলেন বাঙালি। এদের সকলেই ছিলেন মনে-প্রাণে মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে। তখন এ রেজিমেন্টের অধিনায়ক (সিও) ছিলেন লে: কর্নেল মাসুদ হাসান খান এবং সহ-অধিনায়ক ছিলেন মেজর কে এম শফিউল্লাহ। বাঙালি সংখ্যাগরিষ্ঠ এ ক্যান্টনমেন্টের অবস্থানরত বাঙালি কর্মকর্তাদের স্বাভাবিকভাবে নিতে পারেনি পাক হানাদার বাহিনী। আর তাই বাঙালি কর্মকর্তাদের দমিয়ে রাখার জন্য তাদের নিরস্ত্র করার ষড়যন্ত্র করা হয়। আর এ ষড়যন্ত্রের অংশ হিসেবেই ঢাকার ব্রিগেড সদর দফতর থেকে নির্দেশ আসে ১৫ মার্চের মধ্যে ৩০৩ ক্যালিবার রাইফেল ও গোলাবারুদ সদর দফতরে জমা দেবার জন্য। কিন্তু সেনানিবাসের বাঙালি কর্মকর্তারা অস্ত্র জমা দিতে রাজী নন। কারণ ইতিমধ্যেই তারা স্বাধীনতা সংগ্রামে যোগ দেবার জন্য সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলেছেন। এজন্য স্থানীয় আওয়ামী লীগ এবং সংগ্রাম পরিষদের নেতাদের সঙ্গে তারা সার্বক্ষণিক যোগাযোগ রেখে চলছেন। সদর দফতরে অস্ত্র জমা না দেবার কৌশল হিসেবে অস্ত্র নিয়ে গাজীপুর থেকে ঢাকায় যাওয়া নিরাপদ নয় বলে জানিয়ে দেন রেজিমেন্টের অধিনায়ক। কিন্তু সে অজুহাতে সন্তুষ্ট হলো না পাক সামরিক জান্তা। এবার নির্দেশ এলো ব্রিগেড কমান্ডার পাঞ্জাবী ব্রিগেডিয়ার জাহানজেব নিজেই ১৯ মার্চ এক কোম্পানী সৈন্যসহ জয়দেবপুর ক্যান্টনমেন্টে আসবেন। অস্ত্র জমা নিতেই ব্রিগেডিয়ার জাহানজেবের এ কৌশল তা বুঝতে বাকী রইল না কারো। আশঙ্কা দানা বেঁধে উঠল গোটা ক্যান্টনমেন্ট জুড়ে। রেজিমেন্টের কয়েকজন কর্মকর্তা বিষয়টি স্থানীয় রাজনৈতিক নেতাদের জানিয়ে দেন। এরপর এল সেই ১৯ মার্চ। ব্রিগেডিয়ার জাহানজেবের নেতৃত্বে ১৮ পাঞ্জাব রেজিমেন্টের এক কোম্পানী সৈন্যসহ জয়দেবপুর সেনানিবাসে এসে উপস্থিত হন। সেনানিবাস এলাকায় তার উপস্থিতির পর দাবানলের মতো গোটা জয়দেবপুরে খবর ছড়িয়ে পরে যে, বাঙালি সৈন্যদের নিরস্ত্র করতে ঢাকা থেকে পাঞ্জাবী সৈন্য এসেছে। সারা শহর থেকে হাজার হাজার উত্তেজিত জনতা এসে ভীড় জমাতে থাকে জয়দেবপুর বাজারে। সমরাস্ত্র কারখানা এবং বাংলাদেশ মেশিনটুলস ফ্যাক্টরির শত শত শ্রমিক-কর্মচারীও এসে যোগ দেয় উত্তেজিত জনতার সঙ্গে। সকলের হাতে লাঠি, তীর, বল্লমসহ নানা ধরনের দেশিয় অস্ত্রশস্ত্র নিয়ে জনতা ক্রমশ জঙ্গি রূপ ধারণ করল। রাস্তার বিভিন্ন স্থানে ইট, কাঠ, পাথর দিয়ে ব্যারিকেড দেয়া হলো। রেলস্টেশন থেকে একটি মালগাড়ীর ওয়াগন ঠেলে এনে রেলক্রসিংয়ে রাস্তা বন্ধ করে দেয়া হলো। এদিকে ব্রিগেডিয়ার জাহানজেব ঢাকায় ফিরে যাবার রাস্তা অবরোধের খবর পেয়ে এবং সেনানিবাসে বাঙালি কর্মকর্তা ও সৈন্যদের সতর্কাবস্থা দেখে তাদের নিরস্ত্র করার পরিকল্পনা বাদ দেন। কিন্তু ঢাকায় ফেরার মুখে জয়দেবপুর রেলস্টেশনের কাছে তিনি বাধার মুখে পড়েন। বিকেল ৩টার দিকে তিনি ব্যারিকেড তুলে ফেলার জন্য দ্বিতীয় বেঙ্গল রেজিমেন্টের প্রধান লে: কর্নেল মাসুদকে নির্দেশ দেন। তার নির্দেশে মেজর মইনুল ব্যারিকেড তুলে ফেলতে স্থানীয় জনগণকে অনুরোধ জানালেও এতে কেউ সায় দেয়নি। ব্যর্থ হয়ে মেজর মইনুল ফিরে আসার ঘটনায় খুবই ক্ষুব্ধ হয়ে উঠেন ব্রিগেডিয়ার জাহানজেব। তিনি এসময় ব্যারিকেড অপসারণ করতে না পারলে নিজেই অ্যাকশনে যাবেন বলে হুমকি দেন। এরপর ব্রিগেডিয়ার জাহানজেব জনতাকে লক্ষ্য করে গুলি করে রাস্তা ফাঁকা করার নির্দেশ দেন। বাধ্য হয়ে বাঙালি সেনারা আকাশের দিক লক্ষ্য করে ফাঁকা গুলি বর্ষণ করে। আর এদিকে গুলির শব্দ শুনে উত্তেজিত জনতা সেনাবাহিনীকে লক্ষ্য করে বৃষ্টির মতো ইট-পাথর নিক্ষেপ শুরু করে। এমনকি উত্তেজিত বাঙালিদের মধ্যে কাজী আজিমউদ্দিন আহমেদসহ আরো দু’জন তাদের লাইসেন্স করা বন্দুক থেকে পাল্টা গুলি বর্ষণ শুরু করেন। ফাঁকা গুলি বর্ষণেও জনতা স্তব্ধ না হওয়ায় জাহানজেব আরো ক্রুদ্ধ হয়ে উঠেন। দুই পক্ষের এই উত্তেজনার সময় ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের একটি ট্রাক টাঙ্গাইলে রেশন দিয়ে জয়দেবপুরে ফিরছিল। এতে হাবিলদার সিদ্দিকুর রহমানের নেতৃত্বে ৫ জন বাঙালি সৈন্য ছিল। তাদের কাছে ছিল ৪টি চাইনিজ রাইফেল ও একটি এসএমজি। ট্রাকটি জয়দেবপুর মসজিদের কাছে পৌঁছলে জনতা ট্রাকটি আটকে ফেলে। বাঙালি সৈন্যদের থেকে অস্ত্র নিয়ে পাঞ্জাবীদের লক্ষ্য করে গুলি বর্ষণ শুরু করে। ট্রাকের বাঙালি সৈন্যরাও জনতার সঙ্গে যোগ দেয়। পাকিস্তানী সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে এটাই ছিল বাঙালিদের প্রথম গুলি বর্ষণের ঘটনা। জয়দেবপুরের প্রতিরোধ সামাল দিয়ে পাক হানাদার বাহিনী কোন মতে ঢাকার পথে রওনা হয়। ইতিমধ্যে জয়দেবপুরে এ সংঘর্ষের খবর পেয়ে ওখান থেকে ৩ কিলোমিটার দূরে চান্দনা চৌরাস্তায় স্থানীয় জনগণ জড়ো হয়ে প্রতিরোধ গড়ে তোলে। আশেপাশের এলাকা কড্ডা, নাওজোর, চান্দনা, ইটাহাটা, সালনাসহ আশেপাশের গ্রাম থেকে হাজার হাজার মানুষ লাঠিসোঁটাসহ যার হাতে যা ছিল তাই নিয়ে রাস্তায় নামে। এ প্রতিরোধ দেখে ভড়কে যায় পাক সৈন্যরা। স্থানীয় যুবক হুরমত হাতের লাঠি দিয়ে একজন পাক সেনাকে আঘাত করে তার হাতের অস্ত্র কেড়ে নিয়ে পাল্টা গুলি বর্ষণের চেষ্টা করে। কিন্তু এসময় পেছন থেকে আরেক পাকসেনার গুলিতে প্রাণ হারান প্রত্যয়ী যুবক হুরমত। এসময় আরেক সেনার বন্দুক কেড়ে নিতে গিয়ে গুরুতর আহত হন কড্ডার কানু মিয়া। ঘটনাস্থলে তিনি কোন মতে বেঁচে গেলেও ঐ গুলির ক্ষতের কারণেই কয়েক বছর পর মারা যান তিনি। পাকসেনাদের বিরুদ্ধে এ বীরত্বপূর্ণ আবদানের জন্য এলাকার মানুষ তাকে বীর কানু নামে ডাকে। এর আগে জয়দেবপুরে পাকবাহিনীর সঙ্গে সংঘর্ষে নিহত হন নিয়ামত, মনুখলিফা। আহত হন ইউসুফ, সন্তোষসহ আরো অনেকে। এরপর কারফিউ জারী করে অনেক কষ্টে ব্রিগেডিয়ার জাহানজেবের নেতৃত্বে পাকিস্তানী সেনাবাহিনীর সদস্যরা কোন মতে ঢাকায় ফিরে যান। জয়দেবপুরে সশস্ত্র এ প্রতিরোধের খবর দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে সারা দেশে। উদ্দীপ্ত করে তোলে সারা দেশের মুক্তিযোদ্ধাদের। ওইদিন বিবিসিসহ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক প্রচার মাধ্যমে তা গুরুত্বসহকারে প্রচারিত হয়। ইয়াহিয়ার সঙ্গে আলোচনার সময়ও বিষয়টি তুলে ধরেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব। পাকিস্তানী সেনাবাহিনীকে প্রথম প্রতিরোধ করার এ ঘটনা মুক্তিযোদ্ধাদের অনুপ্রাণিত করার ক্ষেত্রে বিরাট অবদান রেখেছিল। যা পরবর্তীতে স্বাধীনতা যুদ্ধে বিরাট অনুপ্রেরণা যুগিয়েছে। আর সে কারণেই ঢাকাসহ সারাদেশে সেদিন শ্লোগান উঠেছিল “জয়দেবপুরের পথ ধরো বাংলাদেশ স্বাধীন করো।” প্রথম সশস্ত্র যুদ্ধের সেই স্মৃতিকে ধরে রাখতে যুদ্ধের পর পরই জয়দেবপুর চৌরাস্তায় জাগ্রত চৌরঙ্গী স্থাপন করা হয়। এ স্মৃতিস্তম্ভ এ এলাকার মানুষের কাছে গৌরব আর সম্মানের প্রতিকৃতি। প্রতিবছর স্থানীয়ভাবে দিবসটি পালিত হলেও স্বাধীনতার ৪২ বছর পরও প্রথম সশস্ত্র প্রতিরোধের দিনটি রাষ্ট্রীয়ভাবে স্বীকৃতি পায়নি। লেখক :সাংবাদিক

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন