শ্রদ্ধাঞ্জলি

আরে আবার কবিদের বয়স হয় নাকি

আপডেট : ১৮ মার্চ ২০১৩, ২১:১৬
বেশ তো চলছিল আমাদের। নিরবচ্ছিন্ন পানাহার, হাসি, গান, রঙ্গ, তামাশা, আড্ডার মাঝখানে কাব্যচর্চা আর বিতর্কের ঝড়। এসবই ছিল যখন দেশে থাকতেন। শামসুর রাহমান, সাইয়িদ আতীকুল্লাহ, ফয়েজ আহ্মদ, সৈয়দ শামসুল হক, রফিক আজাদ, রবিউল হুসাইনসহ আরও কত শত বন্ধু, অনুরক্তজন তাঁর। আজ বেঁচে থাকলে অশীতিপর যাঁর বয়স হতো। আরে, কবিদের আবার বয়স হয় নাকি! সব বয়সের মানুষের সঙ্গে যাঁর সম্পর্ক গড়ে ওঠার সাঁকো ছিল এক শলা সিগারেট। প্যাকেটটা সবসময় বাড়িয়ে রাখতেন। মাঝে মাঝে নিজের ওপর এমন রাগ হয় যে, এমন একটা কৃতকর্মা ও ক্ষণজন্মা পুরুষকে সহজ-সরলভাবে বুঝতে ভুল করি। আসলে আমাদের কূপমণ্ডুক সমাজের ভেতরে ঘ্যাঙর ঘ্যাং প্যাঁচগোচ এতোই যে—আমরা আমাদের শঠতা নিয়ে, আমাদের রাজ্যের ক্ষুদ্রতা দিয়ে আমাদের নিজেদেরই আমরা ছোট করে ফেলি। না হলে এই অত বড় মাপের কবি কি কখনও লিখতে পারেন— “আমার প্রবাল দ্বীপে বাতি নিভে যায় এবং প্রস্তরখণ্ড কুসুমিত অথবা পোশাকি তিমিরের মতো প্রত্যুষে ঝরে পড়ে আমার চোখের তারা ভিজে যায় শুধু ভিজে যায়।” পঙক্তি দুটি পড়তে নিজের ভেতরে নিজেরই অজান্তে এমন একটা জ্বলুনিপুড়নি শুরু হয়ে যায় যে, নিজেকে সামাল দেয়া কঠিন হয়ে পড়ে। কেন, সেন্টু ভাই, কেন এমন অকালে বিরতিহীন উত্সব থেকে অমনভাবে বিদায় নিয়ে চলে গেলেন! আমাদের ভাষার নায়ক,— আপনার কলমের কালি তো প্রবহমানই ছিল। শুধু কালির রঙটাই যা পালটে যাচ্ছিল। এক হিসেবে ভেবে দেখলে মনে হয় ঠিকই করেছেন। কাদের নিয়ে থাকতেন আপনি! এখনকার এই আকালের দিনে। মানুষ কি আর মানুষ আছে? যত নীচতা, যত ক্ষুদ্রতা সবই যেন আজ সর্বগ্রাসী আগুনে লেলিহান হয়ে উঠতে চাইছে। আর ক’দিন পরেই তো আপনি সত্তরে পড়তেন। অবশ্য রবীন্দ্রনাথ তো বলেছিলেন পঞ্চাশ পেরোলেই বানপ্রস্থে যেতে। সত্তুরে বুড়ো হাবড়া হিসেবে আপনাকে যে কখনোই মানাত না সে কথা তো আমরা সবাই জানি। এক বছরের অধিককাল আপনার সদাজাগ্রত চোখজোড়া হয়তো সে কারণেই বার বার অশ্রুসজল হয়ে থাকত। সেসব মূঢ়মতি শিয়ালদের নিশ্চয় আপনি ক্ষমাসুন্দর দৃষ্টিতে বলতেন, “কী কেমন আছো, কবিতা লেখা হচ্ছে তো! নতুন কী লিখলে? আর আপনার প্রাণাধিকা কন্যা কাকাতুয়া, পরম সহনশীলা সর্বরূপে রূপান্বিতা, সর্বকলায় কলান্বিতা, সর্বগুণে গুণান্বিত, সচিব, সখা, সহচরী মণি যিনি আপনার আস্কারা দেয়া বেয়াড়া কবিকোলাহলকে সহাস্যমুখে সমুচিত সামাল দিয়েছেন তাদের ফেলে কোথায়— এমন কোন্ স্বর্গ আছে যেখানে আপনি সুখ-শান্তিতে বসবাস করতে পারবেন! সেন্টু ভাই আপনার রচিত সেই অমোঘ পঙক্তিই তার উত্তর হতে পারে— “চোখের আড়াল মানে মৃত্যু নয়।” লেখক :কবি ও সম্পাদক

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন