উত্তর কোরিয়ার তৃতীয় দফা পারমাণবিক অস্ত্রের পরীক্ষা চালনায় জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদ ৭ মার্চ দেশটির ওপর নতুন করে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছে। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় থেকে বিচ্ছিন্ন রাষ্ট্র উত্তর কোরিয়ার অভিযোগ, তাদের ওপর হামলা করাই দক্ষিণ কোরিয়ার মার্কিন সামরিক কার্যক্রমের লক্ষ্য। তবে যুক্তরাষ্ট্র যদি উত্তর কোরিয়ার ওপর নতুন অবরোধ আরোপের জন্য জাতিসংঘকে প্ররোচিত করে, তাহলে পিয়ংইয়ং আরো পারমাণবিক পরীক্ষা চালাবে। উত্তর কোরিয়া যুক্তরাষ্ট্রের মদদপুষ্ট যে কোন আগ্রাসী শক্তির বিরুদ্ধে আগাম পরমাণু অস্ত্রের হামলা চালানোর হুমকি দিয়েছে। দেশটির ওপর কঠোর নিষেধাজ্ঞা আরোপের কয়েক ঘন্টা আগে ৭ মার্চ হুমকি দিল পিয়ংইয়ং। উত্তর কোরিয়া এর আগেও দক্ষিণ কোরিয়া ও মার্কিন সৈন্যদের ওপর হামলা চালানোর হুমকি দিলেও দেশটি এই প্রথম যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে আঘাত হানার সরাসরি হুমকি দিল। পিয়ংইয়ংয়ের আহবানে সাড়া দিয়ে আমেরিকা ও দক্ষিণ কোরিয়া দুই দেশের মধ্যে বিশাল সামরিক মহড়া বাতিল করেনি।
উত্তর কোরিয়ার পররাষ্ট্র দপ্তরের মুখপাত্র বলেন, ‘মার্কিন যখন একটি পরমাণু যুদ্ধ বাধানোর পাঁয়তারা করছে তখন আগ্রাসীদের দম্ভ চূর্ণ করে দেয়ার জন্য উত্তর কোরীয় শক্তি প্রয়োগ করবে।’ এর আগে উত্তর কোরিয়া দক্ষিণ কোরিয়ায় মোতায়েনকৃত মার্কিন বাহিনীর ওপর হামলা চালানোর হুমকি দেয়ার পাশাপাশি দাবি করেছে, তার কাছে পরমাণু অস্ত্র বহনে সক্ষম আন্ত:মহাদেশীয় ক্ষেপণাস্ত্র রয়েছে। গত ৫ মার্চ উত্তর কোরিয়া ১৯৫৩ সালে দক্ষিণ কোরিয়ার সঙ্গে স্বাক্ষরিত অস্ত্রবিরতি চুক্তি থেকে বেরিয়ে যাওয়ার হুমকি দিয়েছিল এবং বেরিয়ে গেল। এছাড়া সিউলের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগের হটলাইন এবং দুই দেশের অভিন্ন সীমান্ত বন্ধরও হুমকি দিয়েছে। এই চুক্তির মাধ্যমে ৬০ বছর আগের কোরীয় যুদ্ধ শেষ হয়েছিলো। পিয়ংইয়ং ঐ চুক্তি থেকে বেরিয়ে গেলে দুই কোরিয়ার মধ্যে আবার যুদ্ধ বেধে যেতে পারে। ১৯৫০-১৯৫৩ কোরিয়া যুদ্ধ পর্যন্ত দুই কোরিয়া একই দেশ ছিল। তাদের ভাষা একই, সংস্কৃতি একই। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর কোরিয়ায় জাপানের ৩৫ বছরের কোরীয় শাসনের অবসান হয়। সোভিয়েত ইউনিয়ন ও ইউনাইটেড স্টেটস দেশটি দখল করে ট্রাস্টিশীপ জোন গঠন করতে রাজি হয়, যদিও কোরীয়বাসী তাতে সায় দেয়নি। তাদের উদ্দেশ্য ছিল কোরিয়ান প্রাদেশিক সরকার গঠন করা, পরে সময় মত স্বাধীন দেশে রুপান্তরিত করা। তারপর যদিও নির্বাচনের তারিখ ঘোষণা করা হয়, সোভিয়েত ইউনিয়ন তাতে সহযোগিতা করতে চায়নি। ফলে সোভিয়েতের নেতৃত্বে উত্তর কোরিয়া এবং পশ্চিমা দুই বৃহত্ শক্তির সহযোগিতায় দক্ষিন কোরিয়া গঠিত হয়। উত্তর কোরিয়া যদিও কমিউনিস্ট রাষ্ট্র কিন্তু ২০০৯ সালে সংবিধান থেকে কমিউনিজম কথাটি বাদ দেয়া হয়। কমিউনিজমের ধারায় উত্তর কোরিয়া পরিচালিত হলেও দেশটির অর্থনীতি ভালই আগাচ্ছিল, যদিও দক্ষিণ কোরিয়ার মত অত দ্রুত গতিতে নয়, কিন্তু নব্বইয়ের দশকে দেশটি ভয়াবহ প্রাকৃতিক বিপর্যয় এবং রাজনৈতিক বিপর্যয়ের কবলে পড়ে। কিম ইল সাং আনুষ্ঠানিকভাবে ১৯৮০ সালে তার পুত্রকে উত্তরাধিকার নিয়োগ করেছিলেন। তাকে পলিটব্যুরো, সামরিক কমিশন এবং পার্টির সেক্রেটারিয়েটে উচ্চ পদে বসিয়েছিলেন। ১৯৯১ সালে কিম জং উত্তর কোরিয়ার শক্তিশালী সেনাবাহিনীর কমান্ডার ইন চীফ নিযুক্ত হন। তার তিন বছর পর ৮২ বছর বয়সে যখন হঠাত্ করে তার বাবা মারা যান তখন বাইরের লোকজন পূর্বাভাস দিয়েছিলো যে, উত্তর কোরিয়ার পতন আসন্ন। কারণ দেশটি তার প্রতিষ্ঠাতাকে হারিয়েছে। তার কয়েক বছরের মধ্যে সোভিয়েতের পতন, চীনের বাজার-অর্থনীতির দিকে ঝুঁকে পড়া, পরপর কয়েকটি পরিবেশ বিপর্যয়, রাষ্ট্রীয় কৃষি পদ্ধতিতে ভুল এবং অপর্যাপ্ত ব্যবস্থা দেশটিতে খাদ্যাভাব এবং গণদুর্ভিক্ষ ডেকে আনে।
এদিকে দক্ষিণ কোরীয় বলেছে, সে আক্রান্ত হলে পাল্টা জবাব দেবে। হামলার লক্ষ্য হবে পিয়ংইয়ং-এর শীর্ষ নেতারা। দক্ষিণ কোরিয়ার সামরিক বাহিনীর মেজর জেনারেল কিম ইয়ংহায়ুন সাংবাদিক সম্মেলনে বলেন, ‘কঠোর ও চরম শাস্তি দেয়ার সব প্রস্ততি আছে। আগ্রাসী শক্তিসহ এর সহযোগী বাহিনী এমনকি নেতৃস্থানীয়দের ওপরও আঘাত হানতে আমরা প্রস্তুত।
এদিকে অস্ট্রেলিয়ার রাজধানী ক্যানবেরায় উত্তর কোরিয়ার একটি নতুন দূতাবাস চালুর উদ্যোগ স্থগিত রেখেছে অস্ট্রেলিয়া। নিষেধাজ্ঞা সত্ত্বেও ১২ ফেব্রুয়ারি উত্তর কোরিয়া আবারও পারমাণবিক পরীক্ষা চালায়, ফলে জাতিসংঘ নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে, মজার ব্যাপার হলো উত্তর কোরিয়ার মিত্র চীন তাতে ভোট দেয়। আলোচনার মাধ্যমে সংকট মোকাবিলার আহবান জানায় চীন। চীন সাধারণত তার মিত্রদের সমালোচনা করে না, কিন্তু সম্প্রতি উত্তর কোরিয়ার পারমাণবিক অস্ত্রের পরীক্ষার সমালোচনা করে এবং দেশটির ওপর অবরোধ আরোপে জাতিসংঘকে সমর্থন জানায়। চীন বিশ্ববাজার হারাতে চায় না । সে জানে উত্তর কোরিয়ার দৌড় কতদূর। উত্তর কোরিয়া আসলেই আক্রান্ত হলে দক্ষিণ কোরিয়া এবং তার মিত্র মার্কিনের সাথে কোনভাবেই কুলাবে না তখন চীনকেই এগিয়ে আসতে হবে। চীনের এগিয়ে আসা মানে মহাযুদ্ধ শুরু হয়ে যাওয়া যা চীন চাচ্ছে না তাই সে উত্তর কোরিয়াকে শান্তি প্রস্তাবের কথা বলছে। বর্তমানে নিরাপত্তা পরিস্থিতি গুরুতর মন্তব্য করে দক্ষিণ কোরিয়ার প্রেসিডেন্ট পার্ক গেউন-হাই বলেছেন, উত্তর কোরিয়ার হুমকি-ধামকি শক্ত হাতে মোকাবিলা করা হবে। তবে পিয়ংইয়ংয়ের সাথে আলোচনায় বসতে তার আপত্তি নেই।
উত্তর কোরিয়া দুই দেশের পানমুনজোম সীমান্তে তাদের দিকের পথ বন্ধ করে দিয়েছে। পিয়ংইয়ংয়ের এই প্রস্তুতি থেকে আশা করা যায় যে কোন মুহূর্তে ২০১০ সালের মতো দুই দেশের মধ্যে স্থল কিংবা জলযুদ্ধ শুরু হতে পারে। সামরিক সংঘাত এড়াতে ও মতবিরোধ দূর করতে ১৯৯১ সালে দুই দেশ চুক্তি সই করে। এছাড়া গত কয়েক বছরে এ ধরনের আরো কয়েকটি চুক্তি সম্পাদন করা হয়। শান্তি চুক্তি বাতিলের ঘোষণা দিয়ে পিয়ংইয়ং বলেছে, সিউল বিশ্বাস ঘাতকদের হাতের পুতুল। তাই তাদের সাথে আলোচনার কিছু নেই।
এদিকে উত্তর কোরিয়ার প্রেসিডেন্ট কিম জং উন ৮ মার্চ সামরিক বাহিনীর একটি অগ্রবর্তী ইউনিট পরিদর্শন করেছেন। এই ইউনিট ২০১০ সালে দক্ষিণ কোরিয়ার ওপর হামলা চালায় ।
উত্তর কোরিয়ার প্রধান বৈদেশিক লেনদেনকারী প্রতিষ্ঠান ফরেন ট্রেড ব্যাংকের ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছে যুক্তরাষ্ট্রের অর্থ মন্ত্রণালয়। উত্তর কোরিয়ার পারমাণবিক কর্মসূচিতে সহযোগিতা করার অভিযোগে এ নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হয় বলে জানান ওবামার জাতীয় নিরাপত্তাবিষয়ক উপদেষ্টা টম ডানিলন। তিনি বলেন, ‘পিয়ংইয়ং যখন প্রতিবেশী দেশগুলোর জন্য হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে, তখন উত্তর কোরিয়ার সঙ্গে চীনের স্বাভাবিক বাণিজ্য চালিয়ে যাওয়া উচিত নয়। তিনি আরো বলেন, যুক্তরাষ্ট্র উত্তর কোরিয়াকে পারমাণবিক শক্তিধর দেশ হিসেবে মেনে নেবে না। উত্তর কোরিয়া পারমাণবিক ক্ষেপণাস্ত্র তৈরি করছে, যার লক্ষ্য যুক্তরাষ্ট্রও হতে পারে। এ ক্ষেত্রে আমরা দাঁড়িয়ে থাকব না। ওয়াশিংটন উত্তর কোরিয়ার সঙ্গে আলোচনা করতে আগ্রহী তবে পিয়ংইয়ংকেই প্রথম তাত্পর্যপূর্ণ পদক্ষেপ নিতে হবে। উত্তর কোরিয়ার কূটনীতিক জন ইয়ং রিওং বলেন,
"As the saying goes, a new-born puppy knows no fear of a tiger. South Korea's erratic behaviour would only herald its final destruction," অর্থাত্ দ্বিতীয় কোরীয় যুদ্ধ সমাগত বলেই ভাবছেন আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষক এবং বিশ্লেষকগণ।
লেখক : আন্তর্জাতিক বিশ্লেষক
