দেশে আইন-শৃংখলা পরিস্থিতির ক্রমাবনতিতে সর্বমহলেই উদ্বেগ-উত্কণ্ঠা বৃদ্ধি পাইতেছে। বিগত কয়েক সপ্তাহ ধরিয়া দেশের বিভিন্ন এলাকা হইতে নানান লোমহর্ষক ও নির্মম নৃশংস হামলা, হত্যা, ধর্ষণ, অগ্নিসংযোগ ও লুটপাটের খবর আসিতেছে। স্থানীয়ভাবে রাজনৈতিক ব্যক্তি বা প্রভাবশালী ব্যক্তিরাও এই ধরনের হামলা হইতে রেহাই পাইতেছে না। মোদ্দাকথা, এক ধরনের নৈরাজ্যকর পরিস্থিতি সৃষ্টির সকল আলামতই যেন ফুটিয়া উঠিতেছে। এই জাতীয় সহিংস আক্রমণ এবং তত্পরতার কাছে অনেক ক্ষেত্রে আবার পুলিশ বা আইন-শৃংখলা রক্ষা বাহিনীকে অনেকটা অসহায় বোধ করিতে দেখা যাইতেছে। যাহা জনমনে স্বাভাবিকভাবেই আতংক সৃষ্টিতে ভূমিকা রাখিতেছে বৈকি! সমাজে এই ধরনের হিংসাশ্রয়ী ঘটনাবলী অবাধে চলিতে থাকিলে দেশ যে নৈরাজ্যের দিকেই অগ্রসর হইবে সে কথাতো বলাই বাহুল্য! বিগত কয়েক সপ্তাহ জুড়িয়া সংবাদপত্রের পৃষ্ঠায় কিংবা ইলেকট্রনিক মিডিয়ায় যে বীভত্স হানাহানি, হত্যা, লুণ্ঠন, অগ্নিসংযোগ ইত্যাদির চিত্র ফুটিয়া উঠিয়াছে উহা সর্ববিচারেই অত্যন্ত অশুভ সংকেত। আইনের কঠোর প্রয়োগ বা আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা করিতে না পারিলে সমাজে নৈরাজ্য এড়ানো সম্ভব নহে। আইন প্রয়োগ যদি একদেশদর্শী হয় বা একটি পক্ষকে খুশী রাখিতে ব্যতিব্যস্ত থাকে তাহা হইলে উহার পরিণাম যে ভাল হয় না সে ব্যাপারে কোন সন্দেহ আছে কী। সরকারের কর্তব্য জনগণের জানমালের হেফাজত করা। কিন্তু যদি সরকারকে বৃদ্ধাঙ্গুষ্ঠ প্রদর্শনপূর্বক কোন গোষ্ঠী সমাজে কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠার পাঁয়তারায় লিপ্ত হয় এবং সরকার উহা দেখিয়াও না দেখার ভান করে তাহা হইলে সকলের জন্যইতো সমূহ বিপদ। গণতান্ত্রিক সমাজে সহিষ্ণুতা, ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা এবং জনস্বার্থের বিষয়গুলিতে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার প্রদান অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু আমাদের দেশে শুধু নির্বাচনকেই আমরা গণতন্ত্র ঠাওরাই। ফলে গণতন্ত্রকে সুসংহত করিতে হইলে উহার সহিত সম্পর্কিত যেসকল প্রতিষ্ঠানকে শক্তিশালী করা প্রয়োজন সেদিকে আদৌ মনোনিবেশ করি না, আর ইহার দরুন ‘যাহা বাহান্ন তাহাই তেপ্পান্ন’ অবস্থায় থাকিয়া যায়।
আমরা বিগত কয়েক সপ্তাহে সংঘটিত হিংসাশ্রয়ী ঘটনাবলীর মধ্যে একটি অভিন্ন রূপ লক্ষ্য করিতেছি। উহা হইল আইন হাতে তুলিয়া লইবার প্রবণতা। কে না জানে আইন অমান্য করার ক্ষেত্র প্রস্তুত থাকিলে লোকে আইন অমান্যের সুযোগ পায়। দেশে আইনের অপপ্রয়োগ এবং আইনকে ক্ষমতাবানদের হাতের পুতুলে পরিণত করা হইয়াছে। ফলে কেবল প্রতিপক্ষকে ঘায়েল করার উদ্দেশ্যেই উহার যথেচ্ছ অপব্যবহার লক্ষণীয়। প্রকৃত দোষী ব্যক্তিরা আইনের ফাঁক-ফোকর গলাইয়া পার পাইয়া যাইতেছে। এমতাবস্থায় মুখে গণতন্ত্রের বুলি কপচাইয়া কিংবা গায়ে গণতন্ত্রের নামাবলী চাপাইয়া দেশের মানুষের জন্য মায়াকান্না করিয়া কি লাভ! আমরা ক্ষমতাবানদেরকে এই জাতীয় মায়াকান্নায় অত্যন্ত পারঙ্গম দেখিতে পাই যাহা কি না কোনভাবেই অভিপ্রেত নহে। প্রতিপক্ষকে ধৈর্য ও সহিষ্ণুতার সহিত এবং সর্বোপরি যুক্তির ভাষায় মোকাবিলা করাটাই যেখানে গণতন্ত্রের শিক্ষা সেখানে যদি শক্তি প্রয়োগের মাধ্যমে উহা করা হয় তাহা হইলে এক পর্যায়ে প্রতিপক্ষও আত্মরক্ষার স্বার্থে সহিংস হইয়া উঠিবে নিশ্চয়ই। সমাজ ও রাষ্ট্র চলে সংবিধান ও সুনির্দিষ্ট কতিপয় নীতিমালার দ্বারা। কিন্তু ঐ নীতিমালার তোয়াক্কা না করিয়া যাহার যাহা ইচ্ছা সেই মোতাবেক কেহ দিকনির্দেশনা দিতে উদ্যোগী হইলে উহা সমাজের জন্য অনিষ্ট ডাকিয়া আনে। মত প্রকাশের স্বাধীনতা গণতন্ত্রের অন্যতম প্রধান উপজীব্য বিষয়। কিন্তু মত প্রকাশের নামে কোনপ্রকার উস্কানি কিংবা অপরকে হেয় করা বা বিদ্বেষ ছড়ানো কিছুতেই মানিয়া লওয়া যায় না।
আমাদের সমাজে বর্তমানে এমন ধারারই দিকনির্দেশনা প্রদানের চেষ্টা দেখিতে পাওয়া যায়। কোন সংঘ বা সংগঠন সরকারের প্যারালেল হইয়া উঠিলে এবং অনিয়মতান্ত্রিক পথে উহা অগ্রসর হইবার মওকা পাইলে ভয়াবহ নৈরাজ্য নামিয়া আসা অসম্ভব নহে। আর তেমন ক্ষেত্রে জনগণের নিরাপত্তা, দেশের ভবিষ্যত্ ইত্যাদি সবকিছুই বিপদাপন্ন হইয়া পড়িতে বাধ্য।
