খাদ্য

মঙ্গা নিয়ন্ত্রণে শস্য বৈচিত্র্য

আপডেট : ১৯ মার্চ ২০১৩, ২১:৫৫
মৌসুমী খাদ্য নিরাপত্তাহীনতা (সাধারণত মঙ্গা নামে পরিচিত) পরিবেশগতভাবে বিপর্যস্ত ও অর্থনৈতিকভাবে দরিদ্র বাংলাদেশের উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলে প্রকৃতি ও মানব সৃষ্ট একটি কঠিন অবস্থা। মঙ্গা অধিকতর দরিদ্র লোকদের আরো শোচনীয় করে এবং অর্থনৈতিক স্তরের আরো নীচে নামিয়ে দেয়। সনাতন কৃষি উত্পাদন ব্যবস্থা পরিবর্তন করে অতি দরিদ্রদের জন্য কর্মসংস্থান ও অধিক আয় নিশ্চিতকরণের মাধ্যমে এই খাদ্য নিরাপত্তাহীনতা সমাধানের একটি উপায় হতে পারে। আমন-২ শস্য সংগ্রহের পূর্বে (সাধারণত সেপ্টেম্বর, অক্টোবর এবং নভেম্বর মাসে) কর্মসংস্থান এবং আয়ের ঘাটতি নিলফামারী, কুড়িগ্রাম, লালমনিরহাট এবং গাইবান্ধা জেলায় মৌসুমী খাদ্য নিরাপত্তাহীনাতার (মঙ্গা) প্রাথমিক কারণ। এটি প্রধানত গ্রামের যেসব দরিদ্র লোকদের উপার্জন প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে কৃষিনির্ভর তাদের প্রভাবিত করে। মৌসুমী পীড়ায় আক্রান্ত অনেক পরিবার টিকে থাকার নানা কৌশল অবলম্বন করে খাদ্য নিরাপত্তাহীনতা প্রতিরোধ করার চেষ্টা করে। মঙ্গা প্রতিরোধের সবচেয়ে কার্যকর কৌশল হলো নতুন আয়ের উত্স বের করা এবং বছরের সাধারণ সময়ে আয় বৃদ্ধি করা। কিন্তু তা অতি দরিদ্রের জন্য অনেকটাই অসম্ভব— কারণ তাদের সঞ্চয় করার জন্য বাড়তি আয় যদি থেকে থাকে তা খুবই সামান্য। অধিক দরিদ্র পরিবারগুলো অত্যন্ত দুর্দশাগ্রস্ত অবস্থার দিকে ধাবিত হয় এবং বেঁচে থাকার জন্য তাদের সম্পদ বিক্রি করতে বাধ্য হয়। গর্ভবতী মহিলা, শিশু, স্তন্যদানকারী মা এবং বয়স্ক মানুষেরা অপুষ্টিতে ভোগে। শারীরিক সামর্থ্যবান বালক এবং পুরুষেরা শহরে এবং দেশের অধিক সম্পদসমৃদ্ধ গ্রাম অঞ্চলের দিকে স্থানান্তরিত হয়। শোষণ করা ঋণ এবং অগ্রীম শ্রম বিক্রয় ব্যবস্থা বৃদ্ধি পায়। এ সময়ে অনেক আঞ্চলিক অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড ক্ষীণ হয়ে আসে, অতি দরিদ্রদের ছাড়াও অনেক বাসিন্দাদের জীবন যাপনে বিরূপ প্রভাব ফেলে। খাদ্য নিরাপত্তাহীনতার সময় জনসাধারণ প্রায়ই সরকার ও এন.জি.ও প্রদত্ত নিয়মিত স্বল্পমেয়াদী সেবাসমূহ গ্রহণ করার চেষ্টা করে। কিন্তু সরকারি ত্রাণ ব্যবস্থায় প্রচুর দুর্নীতি হয়। ভি.জি.ডি কার্ডের মাধ্যমে সংকটপূর্ণ মাসে মাসিক ভাতা হিসাবে চাল সরবরাহ করা হয়, বাড়তি আয়ের সময় ঘুষ দিয়ে এটা সংগ্রহ করা মূল্যবান বিনিয়োগ হিসাবে গণ্য হয়, যা সকলে একটি প্রতিরোধমূলক কৌশল বলে মনে করে। সারা বছর নির্ভরযোগ্য আয়ের ক্ষেত্র তৈরি করা, আমাদের সমাজের সর্বাপেক্ষা শোচনীয় জনগোষ্ঠীকে রক্ষা করার জন্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ। কৃষিকাজে নিয়োজিতদের উত্পাদন ব্যবস্থায় বৈচিত্র্যকরণ এ লক্ষ্যে অবদান রাখতে পারে। ২০০৯ সাল থেকে একটি এন.জি.ও নীলফামারী জেলায় অন্য আরেকটি এন.জি.ও এর সহযোগিতায় ১২০০ অতিদরিদ্র সুবিধাভোগী পরিবার নিয়ে একটি প্রকল্প বাস্তবায়ন করছে যা জীববৈচিত্র্য কেন্দ্র ব্যবহার করে অতি দরিদ্রদের জন্য অধিক আয় ও কর্মসংস্থান নিশ্চিত করেছে। এ প্রকল্পের অতি দরিদ্র সুবিধাভোগীদের প্রায় ৪৫ শতাংশ আবাদযোগ্য জমি দু’বছরের জন্য ইজারা দেয় এবং একইসাথে প্রয়োজনীয় প্রাথমিক বিষয়াদি ও সরঞ্জাম সরবরাহ করে। প্রকল্প অংশগ্রহণকারীরা বাজার চাহিদা, জমির ধরন, কৃষি-পরিবশগত অবস্থা ও পুষ্টিগুণ বিবেচনা করে উপযুক্ত বহুরূপী শস্য বাছাই করে। তারা স্বল্পকালীন, মধ্যকালীন এবং বাত্সরিক নানা ধরনের শস্য উত্পাদন করে যা সারা বছর বিভিন্ন সময়ে আয় ও কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করে থাকে। সুবিধাভোগী পরিবারগুলোকে মৌসুমী অভাব মোকাবেলা করে টিকে থাকার জন্য সহায়তা করতে এই ধারাবাহিকতা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। অতি দরিদ্রদের নতুন কৃষি উত্পাদন ব্যবস্থায় কাজের সামর্থ্য বৃদ্ধি, স্থানীয় সরকারি সংস্থার সাথে যৌথ মঙ্গা নিরাময় কৌশল সৃষ্টি, প্রতিবন্ধী-বৃদ্ধ, নারীপ্রধান পরিবারসহ প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর শোষণমুক্ত কর্মসংস্থানের সুযোগ প্রদান এবং নিরাপদ খাবার পানি ও স্বাস্থ্যসম্মত পায়খানা নিশ্চিত করে স্বাস্থ্য সমস্যা নিরাময় করে ইত্যাদি এই কঠিন সময়ে অতি দরিদ্রদের সহায়তা করার গুরুত্বপূর্ণ কৌশল এবং এগুলো প্রকল্পের দ্বারা প্রবর্তিত হচ্ছে। এটি দুঃখজনক যে এখনও দেশের একটি অংশের মানুষ মৌসুমী ক্ষুধাদ্বারা আক্রান্ত। কিন্তু সনাতন কৃষি ব্যবস্থা পরিবর্তনের মাধ্যমে আমাদের সামাজের অনেক দরিদ্র জনগোষ্ঠীর জীবন উন্নয়নের সম্ভাবনা রয়েছে। ++লেখক এবং লেখিকা অ্যাকশন এইড নামক একটি উন্নয়ন সহযোগী সংস্থায় কর্মরত

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন