অতীতে আজকের মতো গাড়ি, জাহাজ, বিমান অথবা রেডিও, টিভি, টেলিফোন, ইন্টারনেট, স্কাইপি, ফেসবুক কিংবা মিডিয়ার দাপট ছিল না। তখন দেশে-দেশে, মানুষে-মানুষে যোগাযোগ হতো পর্যটকদের মাধ্যমে, ব্যবসায়-বাণিজ্যের মাধ্যমে। বণিকদল মাসের পর মাস জল বা স্থলপথে ভ্রমণ করে এক দেশ থেকে অন্য দেশে পণ্যের সাথে বিভিন্ন তথ্যও আদান-প্রদান করতো। পরিব্রাজকদের মুখে শোনা গল্প কিংবা বহন করে আনা দ্রব্যাদি দেখে একেকটি দেশ ও তার মানুষ সম্পর্কে অন্য দেশের মানুষ একটি সাধারণ ধারণা লাভ করতো। এভাবেই দেশের বা মহাদেশের ভাবমূর্তি গড়ে উঠতো।
একাদশ-দ্বাদশ শতাব্দীতেও পৃথিবীর অনেক দেশ সম্পর্কে মানুষের বিশেষ একটা ধারণা ছিল না। আজকের দুনিয়ায় মানুষ যেমন ভিন্নগ্রহে অভিযান পরিচালনা করছে ঠিক তেমনি অতীতে মানুষ পৃথিবীর অভ্যন্তরে অনেক অজানা ভৌগোলিক অঞ্চলে অভিযান পরিচালনা করেছে। আবিষ্কার করেছে তারা নতুন নতুন দেশ ও মানুষের পরিচয় । এই ধরনের দু:সাহসিক ভ্রমণ অভিযানের ফলেই তখন বিশ্বের মানুষে-মানুষে আদান-প্রদান, ব্যবসায়-বাণিজ্য ও কূটনৈতিক সম্পর্ক স্থাপিত হয়েছিল। ঐসকল লেনদেনের ধারাবাহিকতায় প্রতিষ্ঠা পেয়েছে আজকের এ্যাম্বেসি বা দূতাবাস। তবে, এখনকার রাষ্ট্রদূতগণের জীবন সেই তুলনায় অনেক সহজ-সরল ও ঝুঁকিমুক্ত এবং কিছু কূটনীতিক নিজের দেশের নিরপেক্ষ ভাবমূর্তির চেয়ে বিশেষ ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর ভাবমূর্তি নির্মাণে অনেক বেশি সক্রিয় থাকেন।
প্রায় সকল রাষ্ট্রই নিজের স্বার্থে নিজের দেশের পরিচয় তুলে ধরে অন্যান্য দেশের মানুষের কাছে। বর্তমানে আন্ত:দেশীয় সম্পর্কের ক্ষেত্রে প্রধান বিষয় হিসাবে প্রাধান্য পেয়ে থাকে বাণিজ্যিক লেনদেন। নিজের দেশের উত্পাদিত রফতানিযোগ্য যতকিছু রয়েছে সেগুলো যোগ্য প্রতিনিধির মাধ্যমে বিভিন্ন দেশের কাছে তুলে ধরা হয়। এর মাধ্যমে উত্পাদনকারী দেশের ভাবমূর্তি উজ্জ্বল হয়। যেমন, তৈরি পোশাক শিল্পের কথা উঠলেই বাংলাদেশের নাম উঠে আসে। জাতিসংঘে শান্তিরক্ষী মিশন, প্রাকৃতিক দুর্যোগ মোকাবিলা ও জনশক্তি রফতানির কথা উঠলে কোন না কোনভাবে বাংলাদেশের নাম আলোচনায় এসে পড়ে। আবার গ্রামীণ ব্যাংক এবং ব্র্যাক এর মতো প্রতিষ্ঠানের জন্যেও বাংলাদেশ আলোচনায় চলে আসে। ঠিক একইভাবে আমাদের সহিংস রাজনৈতিক মতপার্থক্য ও সংক্ষুব্ধ দলের আর্তি দেশে-বিদেশের মিডিয়াতে সমানভাবে স্থান পেয়ে যায়। তাই, দেখা যায় কোন দেশের ভাবমূর্তির সাথে সেদেশের জনগণের কার্যকলাপ অঙ্গাঙ্গীভাবে জড়িত। আসলে জনগণের মাধ্যমেই কোন একটি দেশের ভাবমূর্তি নির্মিত হয়ে থাকে। তবে, বর্তমান বিশ্বে ভাবমূর্তি নির্মাণ ও ধ্বংসের ক্ষেত্রে সকল ধরনের মিডিয়ার রয়েছে এক সুদূরপ্রসারী ভূমিকা। এছাড়া একটি দেশের মানুষের আচার-আচরণ, বেশভূষা, ব্যবহার, আতিথেয়তা, কর্মদক্ষতা ইত্যাদি থেকেও ভাবমূর্তির ধারণা পাওয়া যায়। অর্থাত্, মানুষের গমনাগমন, পারস্পরিক যোগাযোগ ও মিডিয়ার মাধ্যমে বিভিন্ন দেশের ভাবমূর্তি তৈরি হয়ে থাকে।
বাঙালি বা বাংলাদেশিরা কেমন ? অনেক পূর্ব থেকেই বাঙালিরা সহজ-সরল জীবন যাপনে অভ্যস্ত। তারা শান্তিপ্রিয় এবং যুদ্ধবিগ্রহ পছন্দ করে না। তাদের রয়েছে সুন্দর-সুখী পারিবারিক ঐতিহ্য। আতিথেয়তার সুনাম বজায় রয়েছে আবহমান কাল থেকে। এই অঞ্চলের ধর্মপ্রাণ অসাম্প্রদায়িক মানুষগুলো বৃটিশ শাসনের পূর্ব পর্যন্ত মোটামুটি শান্তিপূর্ণ পরিবেশেই বাস করতো। বিশ্ববাস্তবতার আলোকে বলা যায় বর্তমানে বিশ্বের ধনী এবং প্রভাবশালী রাষ্ট্রসমূহ তাদের নিজেদের পছন্দ-অপছন্দ অনুযায়ী বিশ্বরাজনীতি পরিচালনা করতে চায়। এই পৃথিবীর অধিকাংশ প্রাকৃতিক সম্পদের উপর যেমন তারা অধিকার বজায় রাখতে চায়, তেমনি তারা অন্যান্য দেশের মানুষ ও সরকারগুলোকে হুমকি-ধমকি, বলপ্রয়োগ, কূটকৌশল, উেকাচ, ঋণ, অনুদান ইত্যাদি প্রদানের মাধ্যমে নিজেদের আয়ত্তে বা স্বদলে রাখতে চায়। তাই, দরিদ্র কিংবা উন্নয়নকামী দেশগুলোকে ধনী অথবা দাতা দেশের রচিত মানদণ্ড অনুযায়ী নিজেদের ভাবমূর্তি ঠিক রাখতে হয়। কিছু কিছু ক্ষেত্রে দরিদ্র দেশের বিবদমান ক্ষমতালিপ্সু রাজনৈতিক দলগুলো নিজের নাক কেটে অন্যের যাত্রা ভঙ্গ করার খেলায় লিপ্ত হয়। বিশ্ব সমাজে দেশের ভাবমূর্তি ভূলুণ্ঠিত হয়ে গেল বলে বিরোধীরা সোচ্চার হয়ে ওঠে অথচ আবার তারাও ক্ষমতায় গিয়ে একই সংকটে পতিত হয়।
ভাবমূর্তি নির্মাণে বা ধ্বংসকরণে কোন দেশের সরকার, বিরোধী দল ও জনগণ সবারই প্রত্যক্ষ অথবা পরোক্ষ ভূমিকা থাকে। বাস্তবে ভাবমূর্তির বিষয়টি একটি আপেক্ষিক ব্যাপার। দেখা যায়, যেসকল সূচকের ভিত্তিতে কোন একটি দেশকে নিচের দিকে স্থান দেয়া হচ্ছে সেই একই জিনিসগুলো অন্যান্য দেশেও রয়েছে। এমনকি তালিকা প্রস্তুতকারী দেশের ভেতরেও রয়েছে। আসলে কারো ভাবমূর্তি নিয়ে অন্যের কোন ক্ষতিবৃদ্ধি হওয়ার কথা নয়। এক্ষেত্রে মাথা ব্যথা হলো বিশ্বমোড়ল ও দাতাদেশসমূহের। এটা অনেকটা গ্রাম্য রাজনীতির মতো। মোড়লবাড়ির সদস্যদের সকল অপকর্ম গঠনমূলকভাবে বিবেচনা করা হয় এবং গ্রামের সাধারণ পরিবারের সদস্যদের বেলায় পান থেকে চুন খসবার উপায় নেই। যুগে যুগে বিশ্বসমাজে হয়তো দাতাগোষ্ঠীর দাপট থেকেই যাবে। কারণ, দাতা বলে কথা। দানের বদৌলতে যদি প্রয়োজনে টুইস্টিং করা না যায়, পরামর্শ প্রদান কিংবা ধমক দেয়া না যায়, চাপ সৃষ্টি করা না যায়, স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্বে হস্তক্ষেপ করা না যায়, সহযোগিতার চুক্তি সই করিয়ে না নেয়া যায়, যদি মোড়লিপনা করা না যায় - তাহলে দাতা হয়ে লাভ কি? উত্তমর্ণ ও অধমর্ণের মধ্যে চিরদিন একটি পার্থক্য থাকবেই। তাই পরনির্ভরশীল ও অভ্যন্তরীণ কোন্দলে জর্জরিত রাষ্ট্রসমূহকে এই বাস্তবতা মেনে নিতেই হবে।
শক্তিশালীদের কিছু চিরকালীন দোসর থাকে। যেমন বাঘ বা সিংহ যখন কোন হরিণ, ষাঁড়, জেব্রা বা অন্যকোন প্রাণী শিকারে যায় তখন তাদের পেছন পেছন একদল অন্য প্রাণী উচ্ছিষ্ট ভোগের জন্য সুযোগ খুঁজতে থাকে। প্রধান শিকারি গপাগপ প্রথম রাউন্ড খাবার শেষে সাময়িক বিশ্রামে গেলে ওরা এগিয়ে এসে প্রয়োজন মতো যার যেমন খেয়ে যায়। এক্ষেত্রে প্রধান শিকারির লাথি-গুতা বা ঝাপটা খেয়েও তারা আজীবন শক্তিমানের পেছনে থাকতেই পছন্দ করে। কারণ, তাদের নিজেদের পক্ষে এ ধরনের শিকার পরিচালনা করা সম্ভব নয়। শক্তিমানের অন্যায় আচরণকেও তারা সমর্থন দিয়ে যায় বিনা দ্বিধায়। কোনদিন তারা সাহস করে কোন নিরীহ প্রাণীর পক্ষে দাঁড়াবে না। দেশীয় রাজনীতি কিংবা বিশ্বসমাজেও তাই। সেখানে বাম, ডান, উগ্রপন্থি, সমাজতন্ত্রী সব একাকার হয়ে যায় স্বার্েথর সরোবরে। এককভাবে অথবা জাতিসংঘের অনুমোদন নিয়ে বিভিন্ন অজুহাত সৃষ্টি করে যখন কোন শক্তিশালী রাষ্ট্র অপেক্ষাকৃত দুর্বল কোন রাষ্ট্রের পেছনে লেগে যায় তখন অধিকাংশ রাষ্ট্র সেই শক্তিমানের সাথেই যোগ দেয়। শক্তিমানকে তার লক্ষ্য অর্জনে তারা নিজের ক্ষুদ্র স্বার্থে সমর্থন জোগায়।
তাই কোন দেশের ভাবমূর্তির বিষয়টি বর্তমানে অধিকাংশ ক্ষেত্রেই একটি নিছক রাজনৈতিক ইস্যু। দুষ্ট বা বেপরোয়া কোন কোন রাষ্ট্র বা সরকার তাদের ভাবমূর্তি নিয়ে একেবারেই তোয়াক্কা করে না। তারা নানাবিধ কৌশলে শক্তিশালী অন্য কোন রাষ্ট্রের সাথে পর্দার অন্তরালে অবিচ্ছেদ্য সম্পর্ক গড়ে তোলে এবং সেই পরিচয়ে ন্যায়-অন্যায়, আইন, আদালত, নীতি, আদশর্, মানবাধিকার কিংবা ভাবমূর্তির বিষয়টিকে বৃদ্ধাঙ্গুলি প্রদর্শন করে সন্ত্রাস কিংবা অন্যের ভূমিতে জবরদখল অব্যাহত রাখলেও বিশ্বমোড়লেরা নিজের স্বার্থে এদের আশ্রয়-প্রশ্রয় দিয়ে থাকে। বিশ্বরাজনীতিতে এ ধরনের দ্বৈত-নীতির প্রচুর উদাহরণ খুঁজে পাওয়া যায়। তাই, অসম বন্ধুত্ব, শর্তসাপেক্ষ ঋণ কিংবা সাহায্যের কাঁটাতারে নিজেদের না জড়িয়ে, অন্যের ব্যবস্থাপত্র, পরামর্শ বা চাপ নয়, বরং নিজের দেশের মানুষের সার্বিক কল্যাণের বিষয়টি সর্বাগ্রে স্থান দিয়ে সুনীতি ও সুশাসন প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে দেশের ভাবমূর্তি উজ্জ্বল করার চেষ্টায় নিবেদিত হওয়া আমাদের মতো সাধারণ রাষ্ট্রসমূহের জন্য শ্রেয়তর।
লেখক :অবসরপ্রাপ্ত ব্রিগেডিয়ার জেনারেল
