আমরা স্তম্ভিত ক্ষুব্ধ ও হতাশ

আপডেট : ২০ মার্চ ২০১৩, ২২:০০
সংখ্যালঘু হিন্দু সম্প্রদায়ের বাড়িঘর ও উপাসনালয়ে অগ্নিসংযোগ ও ভাঙচুরের ঘটনা অব্যাহত রহিয়াছে। গত তিন সপ্তাহ ধরিয়া প্রায় প্রতিদিনই দেশের কোনো না কোনো অঞ্চল হইতে এই ধরনের দুর্ভাগ্যজনক ঘটনার সংবাদ পাওয়া যাইতেছে। গত সোমবারও রংপুর, নেত্রকোনা ও কিশোরগঞ্জ জেলায় সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের বাড়িঘরে অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটিয়াছে। প্রতিমা ভাঙচুর করা হইয়াছে। ওইদিন দিবাগত গভীর রাতে রংপুরের পীরগাছায় সংখ্যালঘু একটি পরিবারের বাড়িতে দুষ্কৃতকারীরা আগুন লাগাইয়া দেয়। আগুনে পুড়িয়া ভস্ম হইয়া গিয়াছে ঐ পরিবারের সর্বস্ব। নেত্রকোনার দুর্বৃত্তরা ভাঙ্গিয়াছে হরিমন্দির, কালিমন্দির। এই ঘটনাটিও ঘটিয়াছে নিশুতি রাতে। এইদিকে রাতের অন্ধকারে শ্রীপুর উপজেলার একটি কালিমন্দিরে হামলা চালাইয়াছে দুর্বৃত্তরা। উহারা ভাঙ্গিয়া দিয়াছে ৫টি প্রতিমা। এই ধরনের ন্যক্কারজনক ঘটনার সংবাদে কোনো বিবেকবান মানুষ উদ্বিগ্ন ও বিচলিতবোধ না করিয়া পারেন না। গত ২৮ ফেব্রুয়ারি হইতে শুরু করিয়া অদ্যাবধি কমবেশি ২৬টি হিন্দু মন্দিরে হামলা চালান হইয়াছে। ভাঙচুর করা হইয়াছে মন্দিরে রক্ষিত দেব-দেবীর প্রতিমা। বাড়ি পোড়ান হইয়াছে কম করিয়া হইলেও ১৭৫টি পরিবারের। ইহাছাড়াও লুট করা হইয়াছে সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের মালিকানাধীন দোকানপাট। এইসব ঘটনার বেশিরভাগই সংঘটিত হইয়াছে রাতের অন্ধকারে। দুয়েকটি ঘটনা দিনের বেলায়ও সংঘটিত হইয়াছে। এই পরিস্থিতিতে দেশের সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের নাগরিকগণ আতঙ্কিত। তাহারা এক চরম নিরাপত্তাহীনতায় ভুগিতেছেন। যাহাদের বাড়িঘর পুড়াইয়া দেওয়া হইয়াছে, তাহারা আশ্রয়হারা। সর্বস্বান্ত হইয়া অনেকে খোলা আকাশের নিচে কোনোমতে কালাতিপাত করিতেছেন। যাহাদের উপাসনালয়ে হামলা করা হইয়াছে, প্রতিমা ভাঙচুর হইয়াছে- তাহাদের মর্মবেদনা ও উদ্বেগ কোন মাত্রা স্পর্শ করিয়াছে, তাহা সহজেই অনুমেয়। স্বাধীন ও গণতান্ত্রিক দেশের নাগরিক হওয়া সত্ত্বেও কেবল সংখ্যালঘু হওয়ায় হিন্দু সম্প্রদায়ের ওপর এই অনাহূত আঘাত মানবিকতার চরম লংঘন ছাড়া আর কী! গোপনে ও প্রকাশ্যে প্রতিকারহীনভাবে এই অশুভ তত্পরতা অব্যাহত রহিয়াছে। সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের নেতৃবৃন্দের অভিযোগ, এই ধরনের অমানুষিক ঘটনার পরও ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের পাশে স্থানীয় রাজনৈতিক সমাজের গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিগণ দাঁড়ান নাই। তাহারা যেন নির্বিকার। এমনকি প্রকৃত দোষী ব্যক্তিদের আজ পর্যন্ত শনাক্ত করা সম্ভবপর হয় নাই। অথচ গণমাধ্যমে এবং সভা-সমাবেশে কথার ফুলঝুরির প্রতিযোগিতা চলিতেছে। সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের ধর্মানুভূতি, আবেগ এবং তাহাদের জানমালের নিরাপত্তাহীনতাকে পুঁজি করিয়া রাজনৈতিক ফায়দা হাসিলের চেষ্টাও চলিতেছে। সেইসঙ্গে চলিতেছে পারস্পরিক দোষারোপ। এইখানে রাজনীতিটাই যেন প্রধান হইয়া গিয়াছে। সত্য বটে, রাজনীতি একটি সর্বব্যাপী বিষয়। সর্বক্ষেত্রে রাজনীতির প্রভাব আছে, থাকিতে পারে। তাই বলিয়া দেশের নাগরিকদের একটি অংশের চরম দুর্দশাকেও রাজনীতির পুঁজি করা হইবে-এমনটি কিছুতেই মানিয়া নেওয়া যায় না। সবকিছু নিয়া রাজনীতি চলে না। বাংলাদেশের মোট জনসংখ্যার কমপক্ষে ৮ শতাংশ মানুষ যখন অবর্ণনীয় নিরাপত্তাহীন অবস্থার মধ্যে দিনাতিপাত করিতেছেন, তাহাদের মৌলিক মানবিক অধিকার যখন ভূলুণ্ঠিত হইবার উপক্রম - তখন রাজনৈতিক কথামালাকে নির্দয় পরিহাস ছাড়া আর কী বলা যায়! তিন সপ্তাহ গত হইয়াছে, এই সময়ের মধ্যেও প্রশাসন দুর্বৃত্তদের কাহাকেও শনাক্ত করিতে পারে নাই। অন্যদিকে পুলিশ প্রশাসনের ভূমিকা লইয়াও অনেকে প্রশ্ন তুলিতেছেন। আমাদের পুলিশের শক্তি ও সামর্থ্য কতদূর -তাহা অবশ্য অজানা নয়। আইন-শৃংখলা রক্ষাকারী বাহিনীর যানবাহন এবং অন্যান্য সাজ-সরঞ্জামের অপর্যাপ্ততার বিষয়টি বহুল আলোচিত। এই বাস্তবতায় সংখ্যালঘুদের বসতবাড়ি এবং উপাসনালয়ের নিরাপত্তা নিশ্চিত করিবার দায় শুধু পুলিশের ওপর ছাড়িয়া দেওয়া যাইতে পারে না। এই ক্ষেত্রে নাগরিক সমাজের ভূমিকাটিও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। স্বাধীনতাপূর্বকালে, বিশেষ করে ’৪৭-এর দেশ বিভাগোত্তরকালে এই দেশেও বিচ্ছিন্নভাবে সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা পরিস্থিতি সৃষ্টি হইয়াছে। সেই সময় কিন্তু আমরা দেখিয়াছি, ইতিহাস সাক্ষী, দেশের নাগরিক সমাজ, সামাজিক, রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক পরিমন্ডলের নেতৃসমাজ সাম্প্রদায়িকতার বিপক্ষে বুক চিতাইয়া দাঁড়াইয়াছিলেন। তাহারা ঊর্ধ্বে তুলিয়া ধরিয়াছিলেন মানবতার পতাকা। ভীত-সন্ত্রস্ত মানুষের পাশে তাহারা দাঁড়াইয়া ছিলেন বরাভয় লইয়া। এই সমাজই ছিল সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের সবচাইতে বড় আশ্রয়স্থল। বলা নিষ্প্রয়োজন যে, বাংলাদেশের মানুষ ঐতিহ্যগতভাবেই শান্তিপ্রিয় ও অসাম্প্রদায়িক। হাজার বছর ধরিয়া এই দেশে হিন্দু-মুসলমান এবং অন্যান্য সম্প্রদায়ের মানুষ পাশাপাশি বসবাস করিয়া আসিতেছেন। সাধারণ মানুষ এইখানে কখনই সাম্প্রদায়িক নন। এইখানে সকলেই যেমন নিজ ধর্মের অনুরাগী, তেমনই প্রতিবেশীর ধর্মের প্রতিও শ্রদ্ধাশীল। তাহারা যুগ যুগ ধরিয়া সম্প্রীতি বজায় রাখিয়া পাশাপাশি বসবাস করিয়া আসিতেছেন। ধর্ম-দর্শন সাম্প্রদায়িকতা সমর্থন করে না। বাংলাদেশের সংবিধানে ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সকল নাগরিকের মৌলিক মানবাধিকারের সুরক্ষা নিশ্চিত করা হইয়াছে। কিন্তু আজ কী হইল! যে সমস্ত এলাকায় বাড়িঘরে অগ্নিসংযোগ, হামলা কিংবা মন্দিরে ভাঙচুরের ঘটনা ঘটিয়াছে সেইসব এলাকার রাজনৈতিক - সামাজিক নেতৃবৃন্দ, গণ্যমান্য ব্যক্তিগণ কোথায়! তাহারা কী ভূমিকা রাখিয়াছেন। দুষ্কৃতকারীদের প্রতিরোধ করিবার কী পদক্ষেপ তাহারা লইয়াছেন! প্রতিবেশী সংখ্যালঘুদের ওপর আঘাত আসিতে দেখিয়াও তাহারা যখন নির্বিকার, তখন এই দেশের হাজার বছরের সম্প্রীতির ঐতিহ্য ম্লান হইয়া যায় না কি! সমাজ ও রাজনীতির নেতৃসমাজের নিস্পৃহতা এবং শুধু বড় বড় কথা বলিয়া, ক্ষেত্রবিশেষ অতিমাত্রায় রাজনীতিকীকরণের মাধ্যমে দায়িত্ব শেষ করিবার প্রবণতা লক্ষ্য করিয়া আমরা স্তম্ভিত, ক্ষুব্ধ এবং হতাশ। এই অবস্থা চলিতে পারে না। সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের জানমাল ও উপাসনার অধিকার অবশ্যই নিশ্চিত করিতে হইবে। যাহারা দেশের এই নাগরিকদের ওপর আঘাত করিয়া চলিয়াছে, তাহাদের খুঁজিয়া বাহির করিতে হইবে। প্রতিবেশী সম্প্রদায়ের উপসনালয়ে ও বাসস্থানে যাহারা হামলা চালায়, তাহারা দেশের শত্রু, মানবতার দুশমন। দুর্বৃত্ত ছাড়া তাহাদের আর কোনো পরিচয় থাকিতে পারে না। উহাদের শনাক্ত করিয়া আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করা অত্যাবশ্যকীয়।

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন