ধর্মীয় সহিষ্ণুতার চারণভূমি বাংলাদেশের শান্তিময় ধর্মীয় সহাবস্থানের চিরায়ত সংস্কৃতিকে রক্তাক্ত ও কলুষিত করছে সাম্প্রতিককালের ধর্ম অবমাননার ঘটনাসমূহ। সুষ্ঠু তদন্তের মাধ্যমে ধর্ম অবমাননার অনুঘটকসমূহ চিহ্নিত করে প্রয়োজনীয় প্রশমন কৌশল গ্রহণে ব্যর্থ হলে সৃষ্ট সামাজিক অস্থিরতা ও রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা বাংলাদেশের উদীয়মান গণতন্ত্র ও প্রাগ্রসর অর্থনীতিকে বিপর্যস্ত করবে।
সাধারণভাবে ধর্ম অবমাননা বলতে ধর্ম, ধর্মীয় উপাসনা, ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান ও ধর্মীয় স্থাপনার সম্মান হরণ, ক্ষতিসাধন বা ধ্বংসকরণ প্রক্রিয়াকে বুঝায়। ইসলাম, হিন্দু, খ্রীস্টান, বৌদ্ধ এবং অন্যান্য পাহাড়ী ধর্মসমূহের অনুসারিগণ ঐতিহাসিকভাবে ধর্মীয় সম্প্রীতির নজিরবিহীন বন্ধনে আবদ্ধ হয়ে বাংলাদেশে অকৃত্রিম বন্ধুত্বপূর্ণ সমাজ ব্যবস্থা গড়ে তুলেছে। সিন্ধু উপত্যকাস্নাত সভ্যতা (Indus Valley Civilization) ভারতবর্ষে হিন্দু ধর্মভিত্তিক সুদৃঢ় সমাজ কাঠামো গড়ে তোলে। ভারতবর্ষের অমর সাধক গৌতম বুদ্ধের অনুসারীরা বৌদ্ধ ধর্মের অমীয় অধ্যায় রচনা করেন। পীর আউলিয়া, মরমী সুফী-সাধক ও দিগ্বিজয়ী বীরদের মানবিক অভিযানের (Humanitarian intervention) মাধ্যমে ভারতবর্ষে ইসলাম ধর্মের শান্তির বাণী প্রচার ও প্রসার লাভ করে। ব্রিটিশ শাসনামলে খ্রীস্টান ঔপনিবেশিক শাসকদের প্রভাব, খ্রীস্টান মিশনারীদের তত্পরতা ও এনজিওর মাধ্যমে অত্রাঞ্চলে খ্রীস্টধর্মের সম্প্রসারণ ঘটে।
ইতিহাসের বাঁকে বাঁকে এই ধর্মাবলম্বীদের মাঝে কেবল রাজনৈতিক কারণে অনেক রেষারেষি, দাঙ্গা ও সংঘর্ষ বাঁধলেও ছায়াঢাকা পাখিডাকা বাংলাদেশের ভূখন্ডে সবসময়ই সাম্প্রদায়িক সহাবস্থানের সংস্কৃতি প্রস্ফুটিত রয়েছে। ভারতে বাবরী মসজিদ ধ্বংসের প্রতিবাদে প্রতিশোধের বহ্নি জ্বালিয়ে কতিপয় উচ্ছৃংখল ব্যক্তি কর্তৃক বাংলাদেশের বিভিন্ন স্থানে হিন্দু-মন্দিরের ধ্বংসসাধন, বাংলাদেশের কতিপয় কবি-সাহিত্যিক, ঔপন্যাসিক কর্তৃক ইসলাম অবমাননাকর উক্তি, কক্সবাজার ও রামুর বৌদ্ধ মন্দিরে দুর্বৃত্তদের তাণ্ডবের সিঁড়ি বেয়ে বাংলাদেশে ইদানিং ধর্ম অবমাননাকর আক্রমণ ও প্রতি-আক্রমণের বিষাক্ত ছোবল আমাদের চিরায়ত সংস্কৃতিকে আঘাত করছে প্রচণ্ডভাবে। কিন্তু এ বছরের ফেব্রুয়ারি ও মার্চ জুড়ে কতিপয় ব্লগারের ইসলাম অবমাননা, দুর্ধর্ষ দুর্বৃৃত্ত কর্তৃক হিন্দু ও অন্যান্য সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের বাড়িঘর ও ধর্ম-উপাসনালয়ে নিষ্ঠুর তাণ্ডব, বাঁশখালীর দয়াল হরি সুশীলের নৃশংস হত্যা প্রভৃতি ন্যক্কারজনক ঘটনা বর্তমান সভ্য পৃথিবীতে বাংলাদেশের ইমেজকে মারাত্মকভাবে ধ্বংস করেছে। সবচেয়ে মারাত্মক ক্ষতি সাধিত হয়েছে বাংলাদেশের আভ্যন্তরীণ রাজনীতির।
যে উদ্দেশ্যে লেখাটা শুরু করেছিলাম তা হলো বাংলাদেশের রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতার নেপথ্যে ধর্মীয় অসহিষ্ণুতার তাত্পর্য বিশ্লেষণ করা। গত ফেব্রুয়ারি ও মার্চে বাংলাদেশের নজিরবিহীন রাজনৈতিক সহিংসতার কারণ খুঁজতে গিয়ে রাজনৈতিক বিশ্লেষক, সমাজ গবেষক, পর্যবেক্ষক ও সাধারণ নাগরিক সকলেই গোলক ধাঁধায় পড়বেন বলে আমাদের বিশ্বাস। কখনো মনে হতে পারে, আমাদের সহিংস রাজনীতির মৌলিক ও বৃহত্তম কারণ হলো বিএনপি এবং আওয়ামী লীগের ক্ষমতারোহণের মনস্তাত্ত্বিক লড়াই এবং রাজপথে হরতাল ও প্রতি-হরতালের রণদামামা। কখনো মনে হবে যুদ্ধাপরাধের বিচার ইস্যুতে দেশব্যাপী জামায়াতের তাণ্ডব এবং সরকার কর্তৃক তা প্রতিরোধে সর্বশক্তি নিয়োগই বর্তমান রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতার মৌলিক কারণ। আবার কখনো ধর্মীয় অসহিষ্ণুতাই আমাদের গণতন্ত্রায়নের পথে প্রধান অন্তরায় হিসাবে প্রতীয়মান হবে। কোন রকম গবেষণা ও অধ্যয়ন না করে কেবল একচোখা রাজনৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকে বিবেচনা করলে যেকেউ ভুল উপসংহারে উপনীত হবেন এবং বাস্তবে হচ্ছেও তাই।
বাংলাদেশে রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা সৃষ্টিকারী এ ঘটনাসমূহ এত দ্রুত ও একই সময়ে সংঘটিত হয়েছে যে, সেগুলো দূর করার ফলপ্রসূ ও কার্যকর কৌশল গ্রহণ করা খুবই দুরূহ হয়ে উঠেছে। উদাহরণস্বরূপ কতিপয় বিপথগামী তরুণের ব্লগে ইসলাম ধর্ম, হযরত মুহাম্মদ (স.) ও ইসলামের বিভিন্ন ধর্মীয় বিষয়ে অত্যন্ত আপত্তিকর, কুরুচিপূর্ণ মন্তব্য ও বক্তব্য ছাপা হওয়ায় ও এই বিষয়টি পত্রিকা মারফত ফাঁস হয়ে যাওয়ার পর হাক্কানী আলেম উলামাসহ মুসলিম জনগণ প্রচন্ড ক্ষুব্ধ হয়ে জুমার নামাজের পর ব্লগারদের শাস্তির দাবিতে শান্তিপূর্ণ বিক্ষোভের ডাক দেন। কেন্দ্রীয় নেতৃত্ববিহীন এ স্বতঃস্ফূর্ত আহ্বানে সাড়া দিয়ে মুসল্লীরা বায়তুল মুকাররমসহ সারাদেশের মসজিদ থেকে জুমার নামাজের পরপরই মুহুর্মুহু শ্লোগানে রাস্তায় নেমে পড়েন। সাথে সাথে পুলিশের উপর্যুপরি রাবার বুলেট, কাঁদানে গ্যাস, গুলি ও লাঠিচার্জে অগণিত সাধারণ মুসল্লী আহত-নিহত হন। ধর্ম অবমাননার প্রতিবাদে বিক্ষুব্ধ মুসলিমরা সংঘবদ্ধ হয়ে মূলত আলেম-উলামাদের নেতৃত্বে কয়েকটি ফ্রন্টে এখন বেশ একাট্টা হয়েছেন।
সম্ভবত: গোয়েন্দা তথ্যের ভ্রমের কারণে সরকার ধরে নিয়েছে, জামায়াত শিবিরের ফাঁদে আলেমরা পা দিয়েছেন এবং সেকারণে আলেম-উলামাদের ওপরও পুলিশের নির্যাতন থেমে থাকেনি।
আমরা অত্যন্ত আশ্বস্ত যে, দেরিতে হলেও স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিবকে প্রধান করে ৯ সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি গঠনে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা যুগান্তকারী পদক্ষেপ গ্রহণ করছেন। আমি নিশ্চিত সুষ্ঠু তদন্ত শেষে দোষী ব্যক্তিদের শাস্তির ব্যবস্থা করলে আলেম-উলামা ও সাধারণ মুসলিমরা আশ্বস্ত হবেন এবং রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা সৃষ্টিতে তাদের মিছিল-মিটিং-এর তীব্রতা হ্রাস করবেন।
আমার যতটুকু ধারণা, তাতে একথা বলতে পারি যে, আওয়ামী লীগের উলামা লীগ, শোলাকিয়ার ইমাম বিদগ্ধ আলেম মাওলানা ফরিদউদ্দীন মাসউদ, চরমোনাই-এর পীর হুজুরসহ সর্বদলের এবং সর্বস্তরের আলেম-উলামারা ইসলামী রাজনীতি চালু রাখতে চান। সেকারণে যে সব মহল থেকে ইসলামী রাজনীতি বন্ধের দাবি উঠছে তাদের বিরুদ্ধেও আলেমরা সোচ্চার থাকবেন। এ বিষয়ে সরকারের অবস্থান স্পষ্টকরণে রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ আরেকটি কারণ দূর করা সম্ভব হতে পারে।
সংখ্যাগরিষ্ঠ মুসলিমদের ইসলাম অবমাননা রোধ করলেই শুধু চলবে না, হিন্দু বৌদ্ধ খ্রীস্টানসহ সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের ধর্মীয় স্বাধীনতাও নিশ্চিত করতে হবে। এটা খুবই পরিতাপের বিষয় যে, বিএনপি ও আওয়ামী লীগ দুটি বড় দলই সংখ্যালঘুদেরকে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে ব্যবহার করে। তাদের ‘ভোট ব্যাংক’ই বড় এ দু’দলের লক্ষ্য, তাদের ধর্মীয় অবমাননা রোধে তাদের চিরায়ত অনীহা। কক্সবাজারের রামুসহ অন্যত্র যে ধর্মীয় আঘাত চাপিয়ে দেয়া হয়েছে সংখ্যালঘুদের হূদয়ের গভীর কন্দরে, তার ক্ষত শুকাতে না শুকাতেই ফেব্রুয়ারি ও মার্চ জুড়ে দেশব্যাপী সংখ্যালঘু নির্যাতনের খবর প্রায় প্রতিদিনই পত্রিকার শীর্ষে স্থান পাচ্ছে। ধর্ম অবমাননার এ ক্রান্তিলগ্নেও সংখ্যালঘুদেরকে রাজনীতির গুটিতে পরিণত করা হয়েছে। সরকার ও আওয়ামী লীগ সংখ্যালঘুদের নির্যাতনের জন্য জামায়াত শিবির ও বিএনপিকে দায়ী করে আসছেন। গত ৫ মার্চ বিএনপি চেয়ারপার্সন বেগম খালেদা জিয়া সংখ্যালঘুদের ওপর হামলার বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ার আহ্বান জানিয়ে বিবৃতি প্রকাশ করেন। বিএনপি এবং তার ১৮ দলীয় শরীক দলগুলো সংখ্যালঘু নির্যাতনের জন্য আওয়ামী লীগকে দায়ী করেন। পরস্পর-পরস্পরকে দায়ী করার দ্বারা কি সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের দ্রোহ নির্বাপিত হবে? সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের প্রতি রাজনীতিবিদদের দায়বদ্ধতা নিশ্চিত না করলে রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতার জন্য ধর্ম অবমাননার অনুঘটক চিরকালই সক্রিয় থাকবে এবং গণতন্ত্রের প্রতি বৃদ্ধাঙ্গুলি প্রদর্শন করবে।
সংখ্যালঘুদের ধর্ম, ধর্মালয়, ধর্মীয় স্থাপনাসহ তাদের জান-মাল-ইজ্জত রক্ষার বিষয়টি সাংবিধানিক অঙ্গীকারে আবদ্ধ, যা তুচ্ছ জ্ঞান করার কোন সুযোগ নেই। অবিলম্বে উচ্চ পর্যায়ের তদন্ত কমিটি করে দোষীদেরকে সমুচিত শাস্তি না দিলে ধর্ম-অবমাননা বোধ সংখ্যালঘুদেরকে ক্লান্ত, বিষণ্ন ও বীতশ্রদ্ধ করে তুলবে এবং রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতার নতুন নতুন নিয়ামক সৃষ্টি করবে।
বিশ্বায়নের যুগে বাংলাদেশ বিচ্ছিন্নভাবে জাতিরাষ্ট্র হিসেবে শক্তিশালী আন্তর্জাতিক ভূমিকা পালনে ব্যর্থ হবে যদি তার আভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা আনয়নে ব্যর্থ হয়। গত ১৫ মার্চ একটি পত্রিকায় কূটনৈতিক প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে: ‘বিশ্ব সম্প্রদায়ের নিবিড় পর্যবেক্ষণে বাংলাদেশ।’ ব্যবসায়ীসহ দেশহিতৈষী সকলে চাচ্ছেন বড় দু’দল বিএনপি ও আওয়ামী লীগ দ্রুত সংলাপে বসে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা আনয়ন করুক। এ মুহূর্তে উভয়ের মধ্যে ভুল বুঝাবুঝির অন্যতম কারণ ধর্ম-অবমাননা ইস্যুটি। এ বিষয়টির সমাধান হলে দু’দলের মধ্যে অন্য ইস্যুগুলোও একে একে সমাধান হবে বলে আমার বিশ্বাস। সংলাপই সব, সংলাপেই বিশ্বাস। সকল ধর্মের অবমাননা প্রতিরোধে উভয় দল ঐকমত্যে পৌঁছে যে সংলাপের সোপান রচনা করবেন, তার সিঁড়ি বেয়ে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতার পথে অন্যান্য বাধাও দূর করতে তারা সক্ষম হবেন।
লেখক :সহযোগী অধ্যাপক, আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়
[email protected]
