যেতে যেতে পথে পথে

হয় যেন গো মোহনমধুর অদ্যদিনের জীবনসুর

আপডেট : ২০ মার্চ ২০১৩, ২২:০১
নীতি-নৈতিকতা ইত্যাদির প্রশ্নে আমাকে কখনও কখনও কথা বলতে হয়। আমি ডাক পাই ক্লাসরুমে কথা বলার জন্য। বইপড়া বিদ্যায় কথা আমি বলতে পারি না। কারণ, বই যদি পড়ার বস্তু হয়, সংসারে তার চেয়ে আমি আর কিছু পড়িনি। এর পেছনে অনেক কারণ আছে। তবে, সত্য এই আমার পাঠ-পঠন খুব কম। যেমন করে আমি বলি আমার কথা, তাতে ধর্মের কথা, বিশ্বাসের কথা প্রথাসিদ্ধভাবে আমি বলি না। বলতে পারিও না, জানিও না। আমি আমার সহকর্মীদের ও শিক্ষার্থীদের বলি—ঘড়িধরা প্রার্থনার বিষয়টি তো বিশ্বাস ও পরিচয়ের মানুষের বেলায় আছেই, আছে আরও এক ধরনের প্রার্থনা। বিশেষ প্রার্থনা ও মজবুত প্রার্থনা। নিজের কাজটিকে এবাদত ও উপাসনার পবিত্রতায় গ্রহণ করা। নিয়ম মানা ও সময় মানা প্রার্থনার সময় সব বিশ্বাস ও পরিচয়ের মানুষ দেহ ও মনকে পবিত্র রাখে, শুচি-শুদ্ধ রাখে। এবাদত ও উপাসনার পবিত্রতায় নিজের কাজটি করার সময়ও নিজেকে পবিত্র রাখতে হয়। সবচেয়ে বেশি রাখতে হয় অন্তরের পবিত্রতা, চিন্তার পবিত্রতা ও উদ্দেশ্যের পবিত্রতা। আমি তাদের বলি—দিনে দু’বার নিজের সঙ্গে কথা বলবেন, নিজের বুকে ভেতরের ন্যায়ালয়ের বিচারকের মুখোমুখি দাঁড়াবেন। দাঁড়িয়ে নিজের সঙ্গে নিজে কথা বলবেন। নিজের কাছে জানতে চাইবেন—গত বারো ঘণ্টায় কী কী ভুল করেছেন, কোন কাজটি আরও ভালো ও আরও সুন্দর হতে পারতো; ভাববেন, কাকে আঘাত করেছেন, যা না করলেও পারতেন, কোথায় কোন অর্থ ব্যবহার করেছেন, যা আপনার স্বেদার্জিত ও স্বোপার্জিত নয়। আপনার স্ত্রী দেখেনি, পুত্র দেখেনি, কন্যা দেখেনি, বন্ধু দেখেনি; কিন্তু আপনার বুকে ভেতরের যে ন্যায়ালয়— তার বিচারক দেখেছেন। এমন কাজ ঘুমুতে যাওয়ার আগে করবেন, ভাববেন—আমার আগামীকালের দিনটি যেন আজকের চেয়ে সুন্দর হয়। আপনার ঘুম ভালো হবে; অনৈতিক কাজ বা অন্যকোন নীতিচ্যুতির জন্য আপনাকে বিছানায় শুয়ে এপাশ-ওপাশ করতে হবে না—বিনিদ্র অবস্থায়, অস্বস্তিকর অবস্থায়। ভোরে বিছানায় বসে ও বিছানা থেকে পা ঝুলিয়ে দিনটা ভালোভাবে শুরু করার ও শেষ করার একটা মজবুত চিন্তা মাথার ভেতর ঢুকিয়ে তো নেবেনই, চর্চা শুরু করবেন এক কৃতজ্ঞতা বোধেরও-আমি আরও একদিন বেশি বেঁচে গেলাম। গতরাতের ঘুমটিই হয়ে যেতে পারতো আমার জীবনের শেষ ঘুম। সে যে হয়নি তার জন্য আমি কৃতজ্ঞ। এই দিনটিকে আমি কাজে লাগাবো, হেলায়-ফেলায় নষ্ট করবো না। আমার পরে জীবন শুরু করে যারা আগে শেষ করেছে—তাদের মধ্যে আমার ছাত্র আছে, পুত্র আছে, কন্যা আছে, বন্ধু আছে, আত্মীয়-পরমাত্মীয় আছে। পৃথিবীতে তাদেরও অনেকদিন থাকার ইচ্ছে ছিল; কিন্তু তারা নেই আমি আছি। আমার এই বাড়তি থাকাটা যেন অপচয়ে শেষ না হয়। জানি, কথাগুলো কেউ তেমন শোনে না। অথবা কানে নেয়, মনে নেয় না; কিংবা মনে নেয়, মেনে নেয় না; কেউ কেউ মেনেও হয়তো নেয়, কাজে ঢালে না। কথা হলো, তাতেও ক্ষতি নেই, সারাদিনের এক-দু’ পারসেন্টও যদি এই ভাবনায় যায়, মন্দ হয় না; কিছু করা হোক বা না হোক—ঐ সময়টা অন্তত নষ্ট চিন্তা ও ভ্রষ্ট ভাবনা থেকে দূরে থাকা যায়। লেখক :শ্রমজীবী কথাসাহিত্যিক

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন