জোড় মানিকেরা ঘুমায়ে রয়েছে এইখানে তরু-ছায়,
গাছের শাখারা স্নেহের মায়ায় লুটায়ে পড়েছে গায়।
জোনাকি-মেয়েরা সারারাত জাগি জ্বালাইয়া দেয় আলো,
ঝিঁঝিরা বাজায় ঘুমের নূপুর কত যেন বেসে ভালো।
কবি জসীমউদ্দীনের কলমের আঁচরে পল্লির জীবন-সংস্কৃতি-ইতিহাস-ঐতিহ্য ও কিংবদন্তি লাভ করে নবতর মাত্রা। পল্লির প্রকৃতি তাঁর কাব্যে নান্দনিক ও ঐশ্বর্যময় হয়ে ওঠে আধুনিক সৌন্দর্যচেতনার সংমিশ্রণে। গ্রাম-বাংলার চিরচেনা প্রকৃতি হয়ে ওঠে তাঁর উপমা-রূপক-প্রতীক ও চিত্রকল্প সৃজনের হাতিয়ার। আর এসব বৈশিষ্ট্য সুস্পষ্টভাবে ধৃত হয় তাঁর কবিখ্যাতি আনয়নকারী ‘কবর’ কবিতাটিতেই। শুধু ‘কবর’নয়, এ ধারা অব্যাহত থাকে তাঁর পরবর্তী সকল সৃষ্টিকর্মের মধ্যে।
‘রাখালী’(১৯২৭) কাব্য নিয়ে বাংলা কাব্যাঙ্গনে প্রবেশ করার পর জসীমউদ্দীন একে একে রচনা করেন বালুচর,ধান খেত,রূপবতী,মাটির কান্না, হলুদ বরণী,জলের লিখন,ভয়াবহ সেই দিনগুলিতে,মাগো জ্বালায়ে রাখিস আলো নামক খণ্ড-কবিতাগুচ্ছ; নক্সী কাঁথার মাঠ, সোজন বাদিয়ার ঘাট,সকিনা, মা যে জননী কান্দে নামক কাহিনি-কাব্য বা কাব্যোপন্যাস;হাসু, এক পয়সার বাঁশী নামক শিশুতোষ কাব্য; রঙিলা নায়ের মাঝি,পদ্মাপার (উত্তরাংশ) নামক গানের সংকলন; বেদের মেয়ে,মধুমালা, পল্লীবধূ,পদ্মাপার(প্রথম অংশ),গ্রামের মায়া, ওগো পুষ্পধেনু নামক নাটক;ডালিম কুমার,বাঙালীর হাসির গল্প জাতীয় লোককথার সংকলন;যাঁদের দেখেছি,ঠাকুর বাড়ীর আঙিনায়,জীবনকথা, স্মৃতির পট,স্মরণের সরণী বাহি নামক স্মৃতিকথা ;চলে মুসাফির, হলদে পরীর দেশে, যে দেশে মানুষ বড়,জার্মানীর শহরে বন্দরে নামক ভ্রমণ-কাহিনি এবং একমাত্র উপন্যাস বোবা কাহিনী।
এবার দৃষ্টি ফেরাই জসীমউদ্দীনের ‘কবর’ কবিতার দিকে। ‘কবর’ কবিতায় বৃদ্ধের জীবন-বাস্তবের রূপকে আমরা দেখতে পাই সাংসারিক স্নেহ-প্রেমের নিয়তি-নিহত আরক্তিম মূর্তি। তার অপরাধ সংসারে সে স্নেহ-ভালোবাসার নীড় বেঁধে সুখী হতে চেয়েছিল। স্নেহনীড় সে বেঁধেছিল, সুখের স্পর্শও সে পেয়েছিল। কিন্তু সে সৌভাগ্যের বিদ্যুত্-চমকের পেছেনেই চরম দুঃখের বজ্রাঘাত নেমে এসেছিল তার জীবনে। তারই চোখের সামনে একের পর এক মৃত্যুর হাত ধরে বিদায় নিয়েছে তার প্রেমময়ী স্ত্রী, উপযুক্ত পুত্র, লক্ষ্মী পুত্রবধূ, আদরের নাতনি এবং স্নেহের পুত্তলী মেয়ে। শুধু তাকে স্নেহস্মৃতি স্মরণ করিয়ে দেওয়ার জন্যেই বোধহয় বেঁচে রইল বংশের একমাত্র প্রদীপ নাতিটি। তার স্নেহের নীড় ভেঙে গেল, জীবন হয়ে উঠলো দুঃস্বপ্নময়। চারদিকে দেখা দিল মরুর ঊষরতা। এক দুঃসহ বেদনায় তার অস্তিত্বকে বহন করে সে বেঁচে রইল। দিনরাত মৃত্যু কামনা তার সকল ভাবনার সার হরয় দাঁড়ালো। কবির ভাষায়-
ওই দূর বনে সন্ধ্যা নামিছে ঘন আবিরের রাগে
অমনি করিয়া লুটায়ে পড়িতে বড় সাধ আজ জাগে।
বাস্তব জীবন অভিজ্ঞতা, পারিপার্শ্বিকের অকুণ্ঠ স্বীকৃতি ও হূদয়ানুভূতির সার্থক সমাবেশে ‘কবর’ কবিতাটি দুর্লভ শিল্পসার্থকতার অধিকারী। পল্লি বৃদ্ধের দুঃসাহস বেদনার চিত্র যেন সকল পল্লিবাসীরই দুঃখ বেদনার আন্তরিক ও প্রতিনিধি স্থানীয় চিত্র। বৃদ্ধের মুখে সকল পল্লিবাসীর যুগ-যুগান্তের পুঞ্জিভূত শোক-বেদনায় যেন ভাষা পেয়েছে ‘কবর’ কবিতায়। ব্যক্তিগত সুখ এখানে সার্বিক শোক-চেতনায় রূপান্তরিত হযেছে। বাংলা কাব্যে সাধারণ মানুষের জীবনের দুঃখ-বেদনার এমন মহিমাময় শিল্পসম্মত প্রকাশ আর দেখা যায় না। অচিন্ত্য কুমার সেনগুপ্ত ‘কবর’ কবিতাকে বাংলা কবিতার নতুন দিগদর্শন বলে চিহ্নিত করে এর অনন্য সৃষ্টি-মহিমারই স্বীকৃতি জানিয়েছেন।
স্বকীয় ধারায় আপন গতিপথে কাব্যস্রোত প্রবাহিত করে স্মরণীয় ও বরণীয় হয়ে আছেন ১৯০৩ খ্রিস্টাব্দে ফরিদপুর জেলার তাম্বুলখানায় জন্মনেয়া,বাংলা সাহিত্যাকাশের উজ্জ্বল নক্ষত্র- কবি জসীমউদ্দীন। আমৃত্যু সাহিত্যসাধনায় নিবেদিতপ্রাণ পল্লিদরদী এ কবি হাজার নদীর স্রোতধারায় বিধৌত রূপসী বাংলার রূপস্পর্শে অভিভূত হয়ে পল্লিপ্রকৃতির রূপ-মার্ধুয আকণ্ঠ পান করে ঘুরে-ফিরে বিচরণ করেছেন পল্লির মাঠে,ঘাটে ও প্রান্তরে। তাই বাইরের চাকচিক্যপূর্ণ নানা অনুকৃতির প্রাণহীন খেলার মধ্যে দিবস-যামিনী বুঁদ হয়ে থাকা ইটের পাঁজরে লোহার খাঁচায় বন্দি শহুরে মানুষ আজও পল্লিকবির সুর ও ছন্দে ভেসে চলে কৃত্রিমতার জীবন ছেড়ে দূর-দূরান্তে,পল্লির পর্ণকুটিরে।
